Tuesday, November 1, 2016

১১. পারুল

বৈলতলা নামটা আমাকে প্রথম দিন থেকেই ধাঁধায় ফেলেছিলো। যদিও আমাদের গ্রামের নাম তরা  যার অর্থ আজও  জানা হয়নি, যেমনটি জানা হয়নি পাশের গ্রাম জাবরার  মানে।  তবে বৈলতলা নিয়ে আগ্রহটার কারণ মনে হয় এটা দুটো অর্থপূর্ণ শব্দের সমন্বয়ে গড়া। বৈল বা বইল বলতে আমাদের এলাকায় বোঝায় ফলের গুটি, মানে ফুল যখন ফলে পরিণত হচ্ছে কিন্তু এখনো ঠিক রূপটা পায়নি। যেমন আমের বৈল বা বড়ইয়ের (কুলের) বৈল।  আমরা বলতাম আম গাছে এবার অনেক বৈল  ধরেছে, মানে অনেক আম হবে।  কিন্তু প্রশ্নটা হলো, আমরাতো আর আম গাছের তলাকে বৈলতলা বলি না, বলি আমতলা।  তাই নামটা আমার মধ্যে একধরণের আগ্রহের জন্ম দিত, আজও  দেয়।

বৈলতলা আমাদের দিন কাটতো অনেকটা যুদ্ধের  আগের মতোই, মানে খেলাধুলা করে।  মনে হয় এর মধ্যেই যুদ্ধটাও গা সওয়া হয়ে গেছিলো, যেমনটা সয়ে যায় সবকিছুই। এছাড়া যেহেতু খেলার সাথীও  ছিল অনেক আর সবাই ছিল বেকার, স্কুল-কলেজ ছিল না।  সময় তো কোনো না কোনো ভাবে কাটাতে হবে? তাছাড়া এর মধ্যে ছোটকাকা সবাইকে নিয়ে চলে এসেছে বৈলতলা। ওদিকে মদন মামা তার সংসার নিয়ে। যদিও মদন মামারা থাকতো আমাদের থেকে একটু দূরে, অন্য পাড়ায়।  দুই পাড়ার মাঝখানে ছিল একটু নীচু  জমি।  ও পাড়ায়  এর মধ্যে শশী বসাক তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে চলে  এসেছিলো।  এখন এই বৈলতলা গ্রামে আমাদের তরার অনেকেই বাস করতে শুরু করেছে।

আমরা কখনো খেলতাম ছি  বুড়ি (সঠিক নামটা হয়তো হবে ছো বুড়ি), যখন ছেলে মেয়েরা দুই দলে ভাগ হয়ে খেলতো।  একদল থাকতো ছোট এক বৃত্তের মধ্যে।  একজন ছি বলে দৌড়ে যেত অন্যদের দিকে।  তার কাজ ছিল দম  না ছেড়ে ওদের কাউকে ছোঁয়া  আর দম  থাকতে থাকতেই বৃত্তে ফিরে  আসা, যেখানে বসে থাকতো বুড়ি। যদি সে কাউকে ছুঁতে  পারতো ওই লোক মারা যেত, আর সে দম  ছাড়লে বৃত্তে ঢোকার আগে বিপক্ষের কেউ তাকে ছুঁলে  সে মরে যেত। ছি  শব্দটা ছিল দম ছাড়লো কি  ছাড়লো না তার প্রমান। দিদি, কল্যাণ (তখন আমি ওকে কল্যান দা  বলে ডাকতাম না),  রতন, চন্দনা, ছানা, হারু, ওদের বোন, পারুল, আমি, দুলাল - আমরা সবাই মিলে  খেলতাম।  দুলাল ছিলো মদন মামার ছেলে  আর পারুল আমাদের পাশের ঘরে থাকতো।  ওরাও আমাদের মতোই শরণার্থী। ওরা  ছাড়া ছিল আরো দু ঘর জেলে বা রাজবংশী।

ছি  বুড়ি আমরা খেলতাম কখনো মাখন কাকার বাড়ীর  দুয়ারে, কখনো পাশের নিচু ভূমিতে যেখানে ছিল হিজল গাছ।  ওখানে আমরা ছেলেরা  ডাংগুলিও খেলতাম।  ওই নীচু  ভূমির ওপারেই ছিল উঁচু একটা জায়গা, বিভিন্ন গাছপালায়  ভর্তি।  ওটা ছিল আমাদের চারা  খেলার জায়গা।  চারা - এটা ভাঙা হাড়ি-পাতিলের অংশ বিশেষ।  আমরা ওটাকে ঘষে উপযুক্ত আকার দিতাম। এখানেও থাকতো ছোট্ট একটা বৃত্ত, ওটাতে  এক পা রেখে নিজেদের  চারা  ছুড়ে মারতো আশেপাশে কোথাও। একজন থাকতো বৃত্তে, যার কাজ ছিল এক এক করে অন্য চারা  গুলো খাওয়া, মানে নিজের চারা  ছুঁড়ে অন্য কারো চারার  আধা হাত বা চার আঙুলের মধ্যে পড়া (আগে থেকেই ঠিক করা হতো কি খেলছি, আধ হাত না চার  আঙ্গুল), সাধারণত আগে থেকেই ডাক দিতে হতো, মানে খেতে পারলে সে কতগুলো সিগারেটের খোলা পাবে আর না পারলে কতটা দিতে হবে।  যদি সে কোনো চারা  খেতে না চাইতো, তবে চারার  মালিককে ঘরে ফিরতে বলতে পারতো, একই ভাবে ডাক তুলে, মানে কয়টা খোলা সে পাবে ঘরে ফিরতে পারলে। কখনো বা আবার ডাক থাকতো গোপন, মানে আমরা অজ্ঞাত পরিমান খোলা সরিয়ে রাখতাম পাশেই। এটা  খেলায় নতুন মাত্রা দিতো।

মানুষের যুদ্ধে দেবতারা সব সময়ই নিশ্চুপ, অন্ততঃ  এই কলি যুগে।  যদিও পাকবাহিনী আর ওদের দেশীয় দোসরদের অত্যাচার ছিল  দানবীয়, স্বর্গের দেবতা বা পাতালের দানব  কেউই এ নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিল না, যেমনটা ছিলোনা প্রকৃতি।  তাই যুদ্ধের সব দুঃখ কষ্টের মাঝেও এলো বর্ষা, মাঝে মাঝে আকাশ ভেঙে নামতো  বৃষ্টি।  বাড়ীর সামনের খালটা ভরে গেলো বর্ষার জলে।  জেলেরা ফিরে  পেলো নতুন জীবন।  বাড়ীর  সামনেই তৈরী হলো কয়েকটা ভ্যাসাল - বাঁশ  আর জালের যন্তর-মন্তর, মাছের যম। জীবনে এই প্রথম ভ্যাসাল  দেখলাম।  তাছাড়াও সারাদিন ওরা  জাল  বুনতো বা ছেড়া  জাল সেলাই করতো। সুতা পাকানো সহ  জাল বোনা - নানা কাজে সরগম থাকলো জেলে বাড়ীগুলো  সেই কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত  পর্যন্ত।  তাই বর্ষার আগমনে খেলাধুলার সুযোগ কমে গেলেও এই সব নতুন কর্মকান্ড আমাকে ব্যস্ত রাখলো।

এরই মধ্যে দেশে এলো মহামারী।  কলেরা ছিল তাদের একটা।  একদিন শুনলাম পারুলের কলেরা হয়েছে।  প্রায়ই ওদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম ওর খবর জানার জন্য।  এক সকালে শুনলাম পারুল মারা গেছে।  আমার দেখা একাত্তরের প্রথম বলি।  এর আগে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, নিজেদের পরিচিত অনেকেই মারা গেছে, তবে এই প্রথম আমার সামনে কেউ মারা গেলো।  যুদ্ধতো  শুধু বন্দুকের গুলিতেই  মানুষ মারে না, মারে ক্ষুধায়, বিনা চিকিৎসায়, মানসিক যন্ত্রনায় - আরো কতভাবে।

পারুলের মুখটা আমার মনে নেই, কিন্তু নামটা রয়ে গেছে।  জানি না ওর আত্মীয়-স্বজন  পঁয়তাল্লিশ বছর পরে আজও  ওকে   মনে রেখেছে কি না? তবে ওর নামটা আমার মনে ঠিক গেথে গেছে। মনে হয়, অনেক দিন পরে ধর্ম বইয়ে যখন পারুলের গল্প পড়েছিলাম সে কারণে।  ওখানেও পারুল নাম এক মেয়ে অল্প বয়সে মারা যায় কলকাতায়। আর মৃত্যুর পর অনেকদিন পর্যন্ত ও নাকি আসতো  দুপুরে, ওঁদের  বাসায় আর বসে বসে খেলতো।  ওই গল্প, ওই অকাল মৃত্যু, ওই নামই  হয়তো অবয়বহীন  পারুলের নামটা আমার মনের মধ্যে গেথে রেখে গেছে।

দুবনা, ০১ নভেম্বর ২০১৬



4 comments:

  1. khub ridoygrahi likha Bijon. amar mejho boner nam paru, amar nam shafali, apnake onek dhonnobar edhoroner likha porte deyar jonno.

    ReplyDelete
    Replies
    1. apnar nam shefali seta jana chilo na. likhte bose koto khutinati ghotonaje mone porche ..

      Delete
  2. তোমার লেখায় গতি আছে, আছে আবেগ মাখা ভালবাসা মানুষের প্রতি। এ কারনেই পড়তে আমার ভাল লাগে। নিজের ছোটবেলার সময় ও ঘটনার বিবরণে যে পর্যবেক্ষণের প্রমাণ তুমি দিতে পারো তা অসাধারণ!
    তুমি পারোও বটে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thank you Hamid Bhai. Ami khub selfish, nijeke khub valobasi ar sob ichu ja jibone ghoteche, je lokgulor sathe amar bondhutw hoyeche. kenona bondhuder valobasha, eta nijekei valobasa, tai mone hoy emon hoy. Tachara ami likhi na, poka sam ne perezhivau. Inspiration er jonyo onek onek ....

      Delete