আজ একাত্তর থেকে অনেক দূরে দুবনা নাম রাশিয়ার এক ছোট্ট শহরে বসে সেসব দিনের কথা খুব সহজেই লিখে যাচ্ছি। কিন্তু ওই দিনগুলোতে, যখন চারিদিকে হায়েনার ডাক, মৃত্যুর পদধ্বনি যখন মাটিতে কান পাতলেই শোনা যায় - এই রাশিয়া, এই দুবনা সবই ছিল অলীক কল্পনা। এসব দিনগুলোতে আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনোই উপায় ছিল না। কিন্তু কিসের অপেক্ষা? স্বাধীন দেশ নাকি আবার সেই পাকিস্তান? যুদ্ধের আগেই পাকিস্তান রাষ্ট্র এ দেশে হিন্দুদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল। যদিও দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্মের পরেই জিন্নাহ বলেছিলো পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে, বাস্তবে সেটা কখনোই কার্যকরী হয়নি। দাঙ্গা কবলিত ভারত ভাগ হলে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটো রাষ্ট্র এই সব তিক্ততা পেছনে ফেলে রেখে সব চেয়ে বন্ধুবৎসল দুটো রাষ্ট্রে পরিণত হবে, জিন্নাহর এই আশাটাও দূরাশাই থেকে গেছে। তাই আমাদের, মানে হিন্দুদের জন্য শুধু একটাই পথ খোলা ছিল - এ যুদ্ধে জিততে হবে। এই আশা নিয়েই আমরা বেঁচে থাকতাম, রেডিওতে কান পেতে শুনতাম আকাশবাণীর খবর, শুনতাম চরমপত্র আর আশায় বুক বাধতাম।
আকাশবাণী থেকেই জানতে পেতাম ইন্দিরা গান্ধীর তৎপরতা। আর অপেক্ষায় থাকতাম, কবে ভারতীয় সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে। ওই সময়ে আমেরিকার বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর খবরও আমাদের কানে আসে আর কানে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভারত আর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর। যুদ্ধের ঠিক আগে আগেই আমেরিকার ভ্যানেল কোম্পানি কালিগঙ্গার উপর সড়ক সেতু নির্মাণ শুরু করে, ফলে আমেরিকান সাহেবদের আমাদের গ্রামে যাতায়াত অনেকটা ডালভাত মতো হয়ে যায়, তারপরেও এই খবর আমেরিকার প্রতি আমার মধ্যে ঠিক ঘৃণা না হলেও এক ধরণের বীতশ্রদ্ধার জন্ম দেয়, যেটা মনে হয় এতো বছর পরেও রয়ে গেছে। যদি ভুল না করি যুদ্ধের আগে আগেই বাবা কল্যাণদাকে একটা গ্লোব কিনে দেয়। সেখানে ভারত আর চীনের উপরে বিস্তীর্ন অঞ্চল জুড়ে ছিল সবুজ রঙের সোভিয়েত দেশ। তখন থেকেই আমার ওই দেশের প্রেমে পরে যাওয়া। আর যখন শুনলাম এই সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাহায্য করছে, তখন তো আর কথাই নেই। আমার পরবর্তীতে এ দেশে আসার পেছনে এই ঘটনা ডিসিসিভ রোল প্লে করে।
যদিও দেশ ভাগ হয় আমার জন্মের ১৭ বছর আগে, তবে আমাদের জন্য এটা ছিল বিশাল বিপর্যয়ের মতো। বাবা-মা তো বটেই কয়েকজন দাদা-দিদিরাও এই ঘটনার সাক্ষী। এতো দিন হয়ে গেলেও দেশভাগের ক্ষত তখনও দগদগ করছিলো এদের বুকে। যেহেতু কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার রাজধানী, অনেকেই কলকাতায় পড়াশুনা করতো, ওখানেই থাকতো। তাই দেশভাগের পর কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকেই রয়ে যায় কলকাতায়। দেশের সাথে সাথে ভাগ হয়ে যায় পরিবার। তখন অনেক দাদু-দিদিমা, মামা-মাসী, দাদা-দিদি অনেকেই শুধু কাগুজে হয়ে যায়, গল্পের হয়ে যায় - যাদের কথা বাড়িতে অনবরতই হচ্ছে, কিছুদিন আগেও যারা পূজার ছুটিতে বা বিয়ে-অন্নপ্রাশনে দল বেঁধে বেড়াতে আসতো বাড়ীতে, আজ তারা কলমের এক খোঁচায় ভিন দেশী হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান রাষ্ট্র শত্রু-সম্পত্তি আইন করে যারা গেছে তো গেছেই, কিন্তু যারা রয়ে গেছে তাদের এ দেশে থাকাটাকেও ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছে। তাই আমাদের মতো পরিবার মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্যের অপেক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক।
জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়ই ......
অথবা
শোনো একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ্ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে উঠে রনি .....
যুদ্ধকালীন সময়ের আরো কত গান যে মনে গেথে আছে। এই সময়ে বাঙালী শুধু যুদ্ধই করেনি, দেশাত্মবোধক বাংলা গানেও এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। যদি ভুল না করি, এই সময়েই আমরা শ্লোগান দিতে শুরু করি
জয় বাংলা জয় হিন্দ
ইন্দিরা মুজিব কোসিগিন
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে, যখন ঢাকা থেকে হাজার হাজার লোক পালাচ্ছিল আর এর পরে যখন আমরা নিজেরাও বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল অস্ত্রহীন, প্রশিক্ষণহীন বাঙ্গালী এই যুদ্ধে বেশী দিন টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু প্রতিটি ছোট ছোট বিজয়, প্রতিটি পেরিয়ে আসা দিন সবার মনে বিশ্বাস জাগাচ্ছিল যে বাঙালী সব বিপদকে উপেক্ষা করে টিকে থাকতে পারে, যুদ্ধে জিততে পারে।
মাগো ভাবনা কেন
আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি .........
হ্যা, মনে ভয় ছিল, শংকা ছিল, কিন্তু এতো ভয় আর এতো আশংকার মধ্যেও ছিল আশা, নতুন দিনের আশা, নতুন জীবনের আশা, নতুন দেশের আশা - যে দেশে শুধুমাত্র হিন্দু হবার জন্য কাউকে দেশত্যাগ করতে হবে না, নিজদেশে পরবাসী হয়ে মাথা নীচু করে বাঁচতে হবে না। একটা সময় ছিল, যখন এই সোনার হরিণটা আমাদের কাছে ধরাও দিয়েছিলো। কিন্তু নোংরা রাজনীতির দূষিত বায়ুতে টিকে থাকতে না পেরে সেই স্বপ্নের হরিণটা দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে অজানার দেশে।
দুবনা, ২৪ নভেম্বর ২০১৬

No comments:
Post a Comment