ছোট বেলায় আমার খেলার অন্যতম উপাদান ছিল সুতা। বাড়িতে সুতার ব্যবসা থাকায় রং বেরঙের সুতা, দড়ির অভাব ছিল না। তবে একাত্তরে সেটা আর ছিল না। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো আলেক লতা বা আলোক লতা। ওই যে হিজল গাছগুলোর কথা বলেছিলাম, তার পাশেই ছিল একটা বরই গাছ। আমরা সাধারণতঃ স্বরস্বতী পূজার আগে বরই খেতাম না, বলতো তাতে নাকি মা স্বরস্বতী অখুশী হন, পরীক্ষার ফল খারাপ হয়। বাবা বলতো, আসলে পূজার আগে বরই পাকে না, আর কাঁচা বরই খেলে কাশি হয়। তাই ওই তকমা। যাই হোক, ওই বরই গাছটা ছিল আলোক লতা দিয়ে ঢাকা, যেন হলদে-সবুজ-সোনালী জাল দিয়ে কেউ ঢেকে রেখেছে গাছটাকে। পরে জেনেছি, ওটা পরগাছা। পাতাহীন ওই লতাগুলো ছিল তারের মতো সরু, আর ওটাকে দড়ির মতো ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা যেত। দুপুরে, সবাই যখন বই পড়তো বা ঘুমুতো, আমি ওই লতা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরী করতাম।
এর বাইরেও আরেকটা খেলা খেলতাম কড়ি বা পাটকেলের ঘুটি (গুটি) দিয়ে। ছয়টা ঘুটি দিয়ে শুরু করতে হতো, উপরের দিকে ছুড়ে দিতাম ঘুটি গুলো, সাথে পড়তে হতো ছড়া আর ধরতে হতো ওগুলো, প্রথমে একটা করে, তার পর এক সাথে দুইটা, তিনটা এইভাবে ছয়টা পর্যন্ত। ছড়াটা এখনো মনে আছে
একটি পয়সা তেলের দাম
মনোরঞ্জন ব্রাহ্মণ
সাত ব্রাহ্মণ পদ্মাবতী
ও পদ্মা তুমি সাক্ষী
ষাঁড়ের গলায় পাঁচ পট্টি
তেলে চাট্টি।
আর ছিল লুডু, সাপা, বিশ্ব ভ্রমণ, গোলকধাম আর ষোল ঘুটি বাঘ। গোলোকধাম তা ছিল বিশ্ব ভ্রমণের মতোই, তবে ঘুরতে হতো তীর্থে তীর্থে, পাহাড়ে পর্বতে আর শেষ হতো গিয়ে স্বর্গে, বিষ্ণুর গোলোকধামে। এই খেলাটা শুধু আমরা ছোটরাই না, মা, মেঝমা, খুড়ীমাও খেলতো সময় পেলে। ষোল ঘুটি বাঘ তো ছিল রীতিমত দাবা-পাশার সমতুল্য। তবে এখন আর ছেলেমেয়েরা সেসব খেলা খেলে না। ক্রিকেটের বাউন্ডারী আর ছক্কায় এসবতো বটেই, এমন কি ফুটবল পর্যন্ত গ্রাম আর শহরের বাউন্ডারীর বাইরে গিয়ে হারিয়ে গেছে।
এর মধ্যে বর্ষা এসে গেছে। পাশের খালে জল এসেছে, সেই সাথে মাছ। অল্প জলে সাঁতার কেটে আর ডুব দিয়ে দিয়ে কাটতো সময়। আর ডুব দিলেই ঘিরে ধরতো ট্যাংরা আর বেলে মাঝের ঝাঁক। কখনো পুটি, কখনো বা সরপুঁটি। এতো মাছ কেউ কোনো দিন দেখেনি।ওরা ছিল নির্ভিক, মাঝে মধ্যে কাটা ফুঁটাতেও কসুর করতো না। ভাগ্যিস পিরানিয়া নয়, নইলে এখন আর এখানে বসে একাত্তরের গল্প লিখতে হতো না। তখন ছানা, হারু, রতন শুরু করলো মাছ ধরতে। আমি মাছ ধরতে পারতাম শুধু গামছা দিয়ে, তাও যদি কেউ হেল্প করতো। বড়শি দিয়ে মাছ ধরা হয়নি কোনো দিন। ছোট থাকতে শুনেছিলাম পতু মাসি (প্রতিমা মাসি, বড়দির মেয়ে) বড়শি ফেলতে গেলে বড়শি পিঠে গেথে গেছিলো। সত্যি মিথ্যা জানিনা, তবে বিশ্বাস করেছিলাম। তাই আমার মনে হতো, যদি বড়শি ফেলতে যাই, বড়শি আমার পিঠে গেথে যেতে পারে, আর বড়শির সাথে সাথে আমিও বড়শির মাথায় গাঁথা অবস্থায় অনেক দূরে জলে গিয়ে পড়তে পারি মাছের জন্য টোপ হয়ে। ব্যারন মিনহাউজেনও হুট হস্ত আমার ভয়ের গল্প শুনে। জানি, ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, তবে আমরা কত কিছুই তো বিশ্বাস করি। এইতো, ছোট বেলায় যখন ঘুম থেকে উঠে ঘর থেকে বেরুতাম, সকালের সূর্য্য আমাকে স্বাগত জানাতো। এরপর কত বাসা বদল হলো, বদল হলো কত শহর আর দেশ, কিন্তু এখনো আমার মনে হয় সূর্যটা আমার ঘরের সামনেই উঠবে, পুব দিকটা আমার ঘরের দরজার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকবে।
তবে বৈলতলায় আমার সময় যে শুধু খেলেই কাটতো, তা নয়। আমাদের ঘরের পেছনেই থাকতো মদন মিস্ত্রী, আমাদের মতোই শরণার্থী। আমাদের গ্রামেও অনেক ঘর সূত্রধর ছিল, তবে অধিকাংশই তাঁত বুনতো বা ব্যবসা করতো। আমাদের পাশের বাড়ীর গুরুপদ আর গোবিন্দ অবশ্য মিস্ত্রীর কাজ করতো, মূলতঃ ঘর বাড়ী তৈরী করতো আর অন্য বাড়ী কাজ না থাকলে আসবাব-পত্র তৈরী করতো। আমরা যেতাম ওদের কাছে লাটিম তৈরির জন্য। সুতা টানতাম বসে বসে, তাতে গব্ গাছের ডালটা ঘুরতো আর ওরা বাটাল ধরে ওটাকে লাটিমের আকার দিতো।
মদন মিস্ত্রী অবশ্য এসব করতো না। তার মূল কাজ ছিল ডোঙ্গা তৈরী করা। ডোঙ্গা এক ধরণের ছোট নৌকা, তবে তার তলাটা ফ্ল্যাট, সাধারণ নৌকার মতো না। ডোঙ্গা তৈরী করতো কাঠের বোর্ড বা তক্তা ব্যবহার করে। একটার পর একটা তক্তা জোড়া দিয়ে। আর এগুলো জোড়া দিতো পাতাম দিয়ে। পাতাম - অনেকটা স্ট্যাপলের মতো, তবে চার-পাঁচ সেন্টিমিটার লম্বা, আর পাঁচ-ছয় মিলিলিটার চওড়া। মাথা দুটো কোনাকার, সরু, ধারালো আর সমকোণে বাঁকানো। ওই দুই মাথাকে দুটো তক্তায় গাঁথা হতো হাতুড়ী দিয়ে পিটিয়ে। আর এর জন্য অন্য দিক থেকে ধরতে হতো ষাট, মানে হাতুড়ী দিয়ে অন্য দিকে চেপে ধরতে হতো। এতে করে পাতামের মাথা বের হলেও বেকিয়ে যেত, আর তক্তা দুটো শক্ত ভাবে লেগে যেত একে অন্যের সাথে। দুই তিন সেন্টিমিটার অন্তর অন্তর পেতাম লাগাতে হতো। যার ফলে একটা ডোঙায় কয়েক শ পাতাম লাগানো হতো, যা ছিল কষ্টসাপেক্ষ আর সময় সাপেক্ষ।
মদন মিস্ত্রীকে করাত দিয়ে কাঠ কাটতে দেখে আর রান্দা দিয়ে তক্তা মসৃন করতে দেখে আমার খুব ইচ্ছে হতো হাতুড়ী-বাটাল-করাত -রান্দা-সড়কি দিয়ে কাজ করতে। তাই আমরা চুক্তি করলাম, আমি তাকে ষাট ধরতে সাহায্য করবো, বিনিময়ে ও আমাকে ওর যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করতে দেবে। এর আগে পর্যন্ত সবাই আমাকে বাবু-বাবু বলে ডাকতো, ওভাবেই আমার সাথে ব্যবহার করতো। এই প্রথম কেউ আমাকে সহকর্মী হিসেবে নিলো, প্রয়োজনে বকতে দ্বিধা করতো না, আর আমিও কাজের কাজ কিছু করছি বলে বেশ উৎসাহিত বোধ করলাম। এই কাজটা আমি করেছিলাম যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত। আর কাজটা আমার এতো পছন্দ হয় যে, বাড়ী ফেরার পরে বাবাকে বলে হাতুড়ী, বাটাল, করাতসহ অনেক কিছুই কিনি। যখন মস্কো আসি তখনও সেই শখটা থেকে যায়। ধীরে ধীরে ঘর ভরে যায় হাতুড়ী, বাটাল, করাত, রান্দা, সড়কি (ড্রেইল) আর অন্যান্য যন্ত্রে। হোস্টেল তো বটেই, ফ্ল্যাটের দেয়ালেও খুব কম জায়গা আছে, যেখানে আমি পেরেক লাগাই নি। ফলে মনে হয় যে ওটা ঘরের দেয়াল তো নয়, শরশয্যায় পিতামহ ভীষ্ম। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে বৌ একবার বলেই বসলো, আমরা নতুন যে ফ্ল্যাট কিনলাম, ওটাতে আমাকে ঢুকতে দেবে না। তবে ওরা মস্কো ফিরে আসার পর নিজে থেকেই সব কিছু কিনেছে, আর ঘরের কোনো কাজ করতে হলেই ওগুলো বের করে দেয় আমার হাতে। কখনো দেলয়ালে ছবি টাঙাতে হয়, কখনো বা চেয়ার বা টেবিলটা ঠিক করতে হয়। হাতুড়ী-বাটাল লোহার তৈরী কিনা, তাই মনে হয় সংক্রামক।

Bah! Chhelebelar khelar golpo khub valo laglo.
ReplyDeleteThank you! Keno, tomra khelo ni?
Deleteচমৎকার!
ReplyDelete- দীপেন ভট্টাচার্য
Thank you Dipen Da!
Deleteতোর ছেলেবেলার খেলার গল্প খুবই মজার। আসলে তোর স্মৃতিচারণায় ফুটে উঠেছে ঐ সময়কার গ্রাম বাংলার স্বচ্ছন্দ হিন্দু ব্যাবসায়ী পরিবারের জীবন যাত্রার ছবি। আর ছায়াপটে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। একাত্তরের প্রেক্ষাপট ছবিটাকে করে তুলেছে গতিশীল, তীব্র ও অনিশ্চিত। মালাজিয়েটস ! Masud
ReplyDeleteআসলে আমার জীবনটাই মনে হয় এরকম, একটার পর একটা ফটোগ্রাফি দিয়ে ভরা, পাতা উল্টালেই দেখা যায়, ফিরে যাওয়া যায়। আমার অনেক বন্ধুই বলতো, আমি নাকি বাচ্চাই রয়ে গেছি, হয়তো লেখাটাও তারই প্রতিফলন। Спасибо!
Deleteবাচ্চারা পলিট-correctness বুঝে না। আর তুই তোর লেখায় ও চলায় তা ধরে রাখিশ, এই হলো তফাৎ!
Deleteআবার আমাকে বুড়ো বানিয়ে ফেললি
Delete