বইরাগীর চকের জল যতই কমছিল, বাড়ির সামনের খালে মাছ ততই বাড়ছিল। আমরা বলতাম, বর্ষায় মাছেরা ভয়ে ধান ক্ষেতে পালিয়েছিলো, এখন জল নামতে শুরু করায় ওরা নদীতে ফিরে যাচ্ছে। এটা আমাদের পাক বাহিনীর তাড়া খেয়ে বাড়ী ছেড়ে পালানোর মতো আর কি। ওগুলো অবশ্য একেবারেই বাজে কথা, তবে ওই বয়সে এসব শুধু বলতামই না, যাকে বলছি তাকে বিশ্বাস করানোর জন্য আরো অনেক কিছুই করতাম। মনে আছে, হারুকে একবার বলেছিলাম, ছোট বেলায় একদিন আমার পা কেটে যায়, কিন্তু বন্ধুরা খুব করে ফুটবল খেলতে ডাকছিলো, তাই কাটা পা টা বাড়িতে রেখেই ফুটবল খেলে আসি, এমন কি গোলও করি। ইস, সেই কল্পনাগুলো যদি এখন থাকতো, কত যে রোমহর্ষক গল্প লিখতে পারতাম!
ওই দিনগুলোতে খালে মনে হয় জাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। জেলেরা বেড়ি জাল ফেলতো পুরো খাল জুড়ে। উপরে ভাসতো শুধু কাঠিগুলো, কাঠের তৈরী এক ধরণের সিলিন্ডার, যা সাধারণতঃ ডুবে না। অনেকটা জলহস্তী যেমন নাকটা বের করে সারা শরীর জলের নীচে লুকিয়ে রাখে এই জালগুলোও তেমনি থাকতো সারা খাল জুড়ে, আর ভেসে থাকা সিলিন্ডারগুলো জানান দিতো ওদের অস্তিত্ব। পরের দিন সকালে জেলেরা কয়েকটি নৌকা করে গিয়ে প্রথমে ওই সিলিন্ডারগুলো এক জায়গায় জড়ো করতো অনেকটা বস্তার মুখ বাধার মতো, তারপর শুরু হতো জাল টেনে তোলা। আমরা তীরে দাঁড়িয়ে দেখতাম রুপালি মাছগুলো কিভাবে জালে পরে ছটফট করছে। ছোট বড় কত ধরণের মাছ। আর জালের ছিদ্রগুলো এতো ছোট ছিল, মনে হতো ওটা গলে মাছতো দূরের কথা জলও বেরুতে পারবে না। এখানে, রাশিয়ায়, জালের ছিদ্রের ন্যূনতম সাইজ আছে, যাতে ছোট মাছ বেরিয়ে যেতে পারে, আমাদের দেশে তখন সেটা ছিল না, এখনো আছে কিনা জানি না। যদি বেড়ি জাল তোলা হতো সকালে, ভেসাল কাজ করতো সারা দিন। ভেসালগুলো ছিল কুমের ওখানে। ভেসাল নামিয়ে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতো জেলে, তারপর ধীরে ধীরে তুলতো উপরে। অনেক সময় আমরাও যেতাম নৌকা নিয়ে। জেলেরা যেহেতু পাশের বাড়ীর, তাই খুব করে চাইলে ভেসাল তুলতে দিতো। এতো মাছ জীবনে আর কখনো দেখিনি। যীশু খ্রিস্ট পিটারের জালে যেমন মাছ তুলে দিয়েছিলেন, যুদ্ধও যেন তেমনি জেলেদের জালে মাছের পাহাড় তুলে দিয়েছিলো। আমরা বলতাম, নদীতে ভেসে যাওয়া লাশ খেয়ে খেয়ে মাছের পরিমান এমন বেড়ে গেছে।
কত যে রকমারী মাছ ছিল! রুই, কাতলা, বোয়াল তেমন ছিল না, প্রচুর পরিমান ছিল কালিবাউশ, সরপুঁটি, টাটকিনি এইজাতীয় মাছ। আমি যেহেতু মাছ তেমন খেতাম না, তাই মাছের লাফালাফি দেখেই খুশী থাকতাম। আমার মেন্যুতে ছিল হাতে গোনা কয়েকটা মাছ - চিতল, রুই, কৈ, কাজলী, বাতাসী আর মলা।পাবদা যদি বোয়ালের ছোট সংস্করণ হয়, কাজলী ছিল তার ঠিক পরেরটা। ওই সময়ে আর স্বাধীনতার পরে কাজলী মাছের সুক্ত ঝোল ছিল আমার খুব প্রিয়, বিশেষ করে মায়ের রান্না। তবে চিতল ছিল সবার উপরে। তাই যদি চিতল মাছ ধরা পড়তো, ওটা আমাদের বাড়িতে দিয়ে যেত। যুদ্ধের পরেও এলাকার জেলেদের বলা থাকতো, যেন চিতল মাছ ধরা পড়লে আমাদের বাড়ী দিয়ে যায়। এই রেয়াজ আমি এখানে আসার আগে পর্যন্ত চালু ছিল। কৈ মাছ পেলে অনেকগুলো কিনে রাখতো, কেননা জিওল আর মাগুর বাদে ওটাই একমাত্র মাছ যা অনেক দিন জিইয়ে রাখা যায়। একটা মাটির কলসে জল ভরে ওতে মাছ ছেড়ে দিতো, ওরা ওখানেই আনন্দে দিন কাটাতো। আমরা বলতাম, কৈ মাছ শুধু জেলেকেই নয়, এমনকি যে মাছ কুটছে (কাটছে) আর রান্না করছে তাদেরকেও দেখে, দেখেনা শুধু তাকে, যে ওকে খাচ্ছে। কেননা মাছ কাটার সময় ওর কি নাচন-কুন্দন, ছাই দিয়ে খুব ভালো করে মেখে ধরে রাখতে হতো, কৈ মাছ কাটতে গিয়ে মা-খুড়িমারা হাত পর্যন্ত কেটে ফেলতো। এমন কি কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলে ছাড়ার পরও ও লাফাতো। আমরা এক অন্যেকে বলতাম, পাপ করলে যমরাজ তোকেও এভাবে তেলে ভাজবে, আর তুইও এমনি করেই লাফাবি। হ্যা, ওই সময় কত কিছুই যে ভয় করতাম!
আরেকটা প্রিয় মাছ ছিল বাতাসী। ছোট ছোট এই মাছের চর্চরি ছিল খুব প্রিয়। বাবা আর জ্যাঠামশায় নিরামিষাশী। বাবা কিছু না বললেও জ্যাঠামশায় বাড়ীতে মাংস উঠতে দিতো না। বাড়িতে থাকাকালীন রাখালদের ওখানে বা কাচারী ঘরে মাংস রাঁধতে পারলেও এখানে সে ব্যবস্থা ছিল না, তাই খাবার-দাবারে আমার বাছবিচার খুব একটা কাজে আসেনি, অন্ততঃ যুদ্ধাবস্থায়। এখন আর সেই রামও নাই, সেই রাবণও নাই। সব খাই যা পাই। ২০১১ সালে প্রায় ১৪ বছর পরে যখন বাড়ী গেলাম, প্রায়ই দেখি বড় বড় মাছ খেতে দিচ্ছে। আমার ছোট বেলায় বড় মাছ খুব দামী ছিল, সবাই কিনতে পারতো না। ভাবলাম, আমি এলাম বলে ওরা এই সব বড় মাছ আনছে। তাই একদিন দিদিকে বললাম
- দিদি, আমি এখন সব খাই। অযথা তোদের কষ্ট করে বড় মাছ আনতে হবে না।
- নারে ভাই, এখন ছোট মাছ পাওয়াই যায় না। বড় মাছের চাষ হয়, দাম তাই কম। এখন আমরা এমনিতেই এসব মাছ খাই।
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, আর বেচারা মাছেরা স্বাধীনতা হারিয়েছে। এখন ওরা গরু-ভেড়া, হাঁস-মুরগীর মতোই অনেকটা গৃহপালিত জীব হয়ে গেছে। অবশ্য আমরা নিজেরাই বা কতটুকু স্বাধীন, এটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ।
স্বাধীনতা কি শুধুই একটা ডকট্রিন? মনে হয় যখন থেকে মানুষ বুঝতে শুরু করে তখন থেকেই শুরু হয় তার পরাধীনতা। এর আগে যে ছিল না তা নয়, তবে তখন সে সেটা বুঝতো না। অন্ততঃ আমি সেটাই মনে করি। পরাধীনতা না বলে বলা উচিত পরনির্ভরতা। কারণ অনেক কিছুই কেউ তাকে করতে বাধ্য করে না, তবে বাঁচার জন্য, সামনে এগুনোর জন্য এগুলো সে নিজেই গ্রহণ করে। আমরা যত বেশী জ্ঞান অর্জন করি, অজানার সীমাটা ততই বেড়ে যায়। নতুন কিছু জানা মানে, সামনে আরেকটা দ্বার খুলে যাওয়া। আর ওই জানালা দিয়ে আমরা দেখি বিস্তীর্ন প্রান্তর যেখানে মেঘের পরে যেমন মেঘ জমে থাকে তেমনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজানার ভান্ডার। ঠিক তেমনি করে আমরা যখন স্বধীনতার এক পর্যায়ে পৌঁছি, দেখি নতুন সম্ভাবনা, আর এই নতুনকে জানার, নতুনকে জয় করার স্বপ্ন আমাদের আবার পরাধীন করে। তবে সব সময়ই কি তা হয়? দস্যুরা মনে করে ওরা যা খুশী তাই করতে পারে, যাকে খুশী তাকেই খুন করতে পারে। ওরা কি স্বাধীন? না। ওরা পরাধীন ওদের অন্ধত্বের কাছে। এই স্বাধীনতা আর পরাধীনতার সীমানা এত সুক্ষ যে অনেক সময় টের পাওয়া কষ্ট সীমানার ঠিক কোন দিকটায় আমরা অবস্থান করছি।
এই রকম এক দিনে, যখন মাছে মাছে ভরে গেছে খাল, আমাদের ওখানে বেড়াতে এলেন বৌদির বাবা, আমাদের তালৈ মশায়। যুদ্ধের সময় এই প্রথম কোনো আত্মীয় এলো আমাদের এখানে। বৌদির খবর নিতে এসেছে। বড়রা অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিভিন্ন খবর নিলো। তারা কোথায় ছিল, কেমন ছিল এসব। মির্জাপুর তালৈ মশাইরা ছাড়াও আমাদের বড় মামা থাকতো। সবার খোঁজ খবর নেয়া হলো এক এক করে। অনেকক্ষণ ধরে জিজ্ঞেস করলো আর পি সাহার কথা।
দুবনা, ২৩ নভেম্বর ২০১৬

No comments:
Post a Comment