Saturday, November 12, 2016

১৭. তীরন্দাজ

দিন আসে দিন যায়, দিন কাটে খেলায় খেলায় আর কখনো বা পূজায়। ওই সময় আমার আরো একটা আগ্রহের জন্ম নেয়, সেটা হলো তীর-ধনুকের খেলা, যেটা পরে, প্রাইমারী  স্কুলের শেষ দিকে প্রকট আকার ধারণ করে।  পাটশলা বা পাট খড়ি দিয়ে বর্শা নিক্ষেপ নতুন কিছু ছিল না, বর্ষার সময় যখন নৌকা নৌকা পাট  আসতো  বাড়ীতে আর পচানোর পর খড়ি থেকে পাটের আঁশ আলাদা করা হতো, ঐ  খড়ি দিয়ে আমরা খেলতাম বর্শা নিক্ষেপ। কে কতদূর ছুড়তে পারে সেটাই মূল লক্ষ্য, তবে কখনো কখনো খড়ির মাথা মাটিতে গাঁথলো কিনা সেটাও দেখা হতো।  কখনো বা আবার বাঁশ  দিয়ে ধনুক তৈরী করে পাটশলার তীর ছুড়তাম আগে থেকে কোনো লক্ষ্য ঠিক করে। তবে একাত্তরে এই তীর-ধনুকের খেলা ছিল মুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিযোদ্ধা খেলা। 

আমার ছোট বেলা কেটেছে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনে, যেখানে তীর-ধনুকের যুদ্ধ ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।  ছোট কাকা যখন রামের সেই তাড়কা  রাক্ষসী বধের গল্প শোনাতো আর বনভূমির উপর দিয়ে চিৎকার করে তাড়কা রাক্ষসীর আগমনী বার্তা শুনাতো এই বলে

হাউ মায়া কাউ
মানুষের গন্ধ পাও
ধরে ধরে খাও       

তখন সে কি ভয়, সে কি উত্তেজনা, যদি রাম  সময় মতো ধনুকে তীর জুড়তে না পারে। পরে আমিও ছেলেমেয়েদের এই গল্প বলতাম ওদের ছোট বেলায়।  আর সেই ছড়াটা পড়তাম এভাবে 

তি ফু উফ উখ  (Тьи фу уф ух)
চু-উঁ  চেলভেচিয়ে দুখ  (Чую человечье дух)
নিয়েত মিয়াছা ভকুসনেয়ে লুদেই (Нет мясо вкуснее людей)
লাভি ইখ ই ছিএস পস্কোরেই  (Лови их и съешь поскорей)

তখন মনিকা, ক্রিস্টিনা আর সেভার সে কি ভয় - ওরা  যে যার মতো দৌড়ে পালিয়ে যেত এদিক সেদিক।

হ্যা, আমি নিজেকে মনে মনে রাম  ভেবে এই খেলা খেলতাম, খেলতাম একা একাই।  প্রথমে পাটশলা  দিয়ে শুরু করলেও পরে বাঁশের  কঞ্চি ব্যবহার করতাম তীর হিসেবে।  পরে বড় হয়ে তীরের মাথায় মেটালিক কোণ  লাগিয়ে দিতাম। আমার যন্ত্রনায় কলা  আর পেঁপে গাছগুলোর প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি। 

এই তীর-ধনুকের শিক্ষা ছিল সজ্ঞাতভাবেই - শত্রু মোকাবিলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার অংশ। তখন মনে হয় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এভাবে ভাবতো, অন্ততঃ  যাদের বড়বাড়ী  ফেলে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।  যুদ্ধের পরেও আমরা অনেক দিন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছি পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে। জানি না এখন দেশে এমন করে খেলে কিনা স্কুলের ছেলেমেয়েরা।  তবে সোভিয়েত দেশে দেখেছি যুদ্ধের কয়েক যুগ পরেও বাচ্চাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে জার্মানদের বিরুদ্ধে, যদিও সরকারী ও জনমানসে এরা  অনেক আগেই জার্মানদের বন্ধু হিসেবেই মেনে  নিয়েছে।    

আজ অনেক সময়ই নিজের কাছে প্রশ্ন জাগে, এই যে ছোট বেলায় এতো ঠাকুর দেবতা খেলতাম, এখন এসব আমাকে টানে না কেন? মনে ময় আমি তাদের কখনোই অন্যেরা যেভাবে দেখে সে ভাবে দেখিনি।  ওই রাম, ওই কালী - এরা ছিল আমার খেলার সাথী। যখন জীবন চলতে গিয়ে নতুন সাথীর, নতুন  পথের সন্ধান পেয়েছি - আমরা যার যার মতো সেই সেই পথে চলে গেছি।  ব্যক্তিগত জীবনে আমি "না" বলতে কখনো দ্বিধা করি না, কোনো ব্যাপারে দ্বিমত থাকলে তা সোজা জানিয়ে দেই, আবার কারো দ্বিমত অনায়াসে গ্রহণ করতে পারি।  তবে যখন দেখি বিশ্বাসগুলো ডগমার আকার নিয়েছে, যেখানে এক দিনের সহযাত্রীর আমার মতামত শোনার মতো আগ্রহ নেই, তখন চুপ করে সরে পড়ি।  এখানেও হয়তো সেটাই ঘটেছিলো।  তাছাড়া মানুষ ভগবানকে স্মরণ করে কিছু পাওয়ার জন্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের বা নিজের আপনজনদের জন্য প্রার্থনা করে, যদিও কখনো সখনো ঢাক ঢোল পিটিয়ে সারা বিশ্বের মঙ্গোল কামনা করতেও দেখা যায়।  আমার চাওয়াটা বরাবরই কম, আর সেটা মূলতঃ  কিভাবে নিজের জ্ঞানের সীমানা বাড়ানো যায়, নিজেকে মানসিক ভাবে উৎকর্ষ করে তোলা যায়, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  আমার ধারণা এটা আমি ভগবানের সাহায্য ছাড়াই করতে পারি। আমার বদলে এই সময়টা উনি অন্য কাউকে দিলে অনেক বেশী  কাজে দেবে।    

দেশের শেষ দিনগুলো কাটে বাম রাজনীতির চর্চায়। তবে আমার নিজেকে কখনো ধর্ম বিরোধী মনে হয়নি।  আসলে ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ  দিয়েছি অনেক আগেই, কেননা ধর্ম বলতে মানুষ ফিলোসফি না বুঝিয়ে বিভিন্ন আচার আচরণ বুঝায়, আর ও নিয়ে ভেদাভেদ তৈরী করে। তার পরেও সোভিয়েত  ইউনিয়নে আসার পর মাঝে মধ্যেই চার্চে যেতাম আমার রুমমেট কুমারের সাথে। ভালো লাগতো।  পরে বিয়ে করার পর বাসায় আমিই ইস্টার আর ক্রিসমাস পালন করার উৎসাহ দেই - স্রেফ উৎসবের দৃষ্টি থেকে। 

দুবনায় কাজ করার সময় অনেকেই জিজ্ঞেস করতো আমি বিশ্বাসী কি না (বিশ্বাস করি কি না)? আমি বলতাম, তোমরা যে অর্থে কথাতা বলছ  সে অর্থে নয়।  আমি বিশ্বাস করি দুয়ে দুয়ে চার। বিশ্বাস করি আরো কিছু গাণিতিক এক্সিওম, আর তার উপর ভিত্তি করেই চলি জীবনের পথ। সব সময় প্রশ্ন করে, সব সময় অবিশ্বাস করে।  আমি বিশ্বাস করি বুদ্ধের সেই বাণী, সুখী হতে চাইলে চাহিদা (লোভ) সম্বরণ করো।  অথবা গীতার  সেই কথা, "কাজের আনন্দেই কাজ করে যাও।  ফলের চিন্তা করো না।  যদি কাজের মধ্যে আনন্দ পাও কাজটা  সঠিক ভাবে সম্পন্ন হবে, আর সেটা হলে আজ হোক, কাল হোক - ফল আসবেই আসবে।" জানি এটা আমার নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন - তবে তাতে কিই  বা আসে যায়।

আমরা সব কিছুই বুঝি নিজস্ব সীমাবদ্ধতা থেকে।  তার পরেও প্রত্যেকের নিজ নিজ ফিলোসফি থাকে, অন্ততঃ  প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের সেটা থাকে বলেই আমার বিশ্বাস। যাদের সেটা থাকে না, তারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, অন্যের দেখানো পথে চলে সারা জীবন। এতে ভালো বা মন্দের কিছু নেই।  তবে যে পথ দেখাচ্ছে আর যেই পথ দেখাচ্ছে সেটা বিচার করার ক্ষমতা না থাকলে ভুল গন্তব্যে পৌঁছানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে মার্ক্সবাদের কারণেই হোক বা রাশিয়ায় থাকার কারণেই হোক ধর্ম নিয়ে, ঈশ্বর নিয়ে ভাবার অবকাশ ছিল না।  পরে মনিকা যখন চার্চে যেতে শুরু করে, আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে আসলে বলতাম "ঈশ্বরকে শুভেচ্ছা দিস।" প্রথমে  একটু ইতস্ততঃ করলেও পরে সয়ে গেছিলো ওর। ২০০৫ সালে দেশ থেকে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন দুবনায়। দুপুরে খাচ্ছিলাম সবাই, আমাদের ডাইরেক্টর আরো অনেকে। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন ঈশ্বর নিয়ে আমার ভাবনা কি?

- ঈশ্বর আমার বন্ধু।  আমরা একে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাই না। 
- কিন্তু ঈশ্বর তো কারো বন্ধু হতে পারেন না।
- এটা  ঈশ্বরের সমস্যা, আমার নয়।

তার পর এই প্রশ্নে ফিরে আসি অনেক দিন পরে, যখন অনেকেই এসব নিয়ে লিখতে শুরু করে।  তবে আমি নিজেকে কখনোই না আস্তিকের না নাস্তিকের দলে মেলাতে পেরেছি।  আমি কাউকে ডাকি না, একলা চলি।  কেননা এর মধ্যে জেনে গেছি, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা  চলতে হয়।  তবে ইদানিং এ নিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলি,

এই দেখো, তোমার হাতে যে সেল ফোনটা আছে ওটা কে আবিষ্কার করল সেটা জানলে কোনো ক্ষতি নেই, তবে ফোনটা  কিভাবে কাজ করে সেটা না জানলে আবিষ্কারকের নাম তোমার কোনো কাজেই লাগবে না।  এখন কর্ম সূত্রে আমি এই মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরী হলো, কিভাবে চলছে আর কিভাবে বিবর্তিত হচ্ছে এ নিয়ে গবেষণা করছি।  এই রহস্য আমরা যদি জানতে পারি, সেটা মানব জাতির অনেক বেশী  কাজে লাগবে। আর এসব জানার পর যদি সময় থাকে তখন না হয় বিশ্বব্রম্মান্ড কে সৃষ্টি করলো সেটা নিয়ে গবেষণা করা যাবে। কথাটা হয়তো খুব সরলীকরণ, তার পরেও কোনো বাকবিতণ্ডায় না গিয়ে এভাবে বলতে বা ভাবতে ভালো লাগে।

কিন্তু প্রশ্ন তো থেকেই যায়। কেন কিছু মানুষ ধর্মের (ঈশ্বরের) শরণাপন্ন হচ্ছে আর কিছু মানুষ দিন দিন ধর্ম (ঈশ্বর) থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অন্যদের কথা জানি না, তবে আমার মনে হয় একাত্তর প্রথমে পাকিস্তানের শোষণ হতে বাংলাদেশকে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মুক্ত করার জন্য হলেও পাকিস্তানী শাসক আর তাদের দেশীয় দোসররা এটাকে অনেকাংশেই হিন্দুবিরোধী আর ভারত বিরোধী যুদ্ধ হিসেবে দাঁড় করতে সফল হয়েছিল। আমাদের এলাকায় তাই মূলতঃ  হিন্দুরাই আক্রান্ত হয়েছিল, হয়েছিল গৃহছাড়া। বন্ধুদের অনেকেই ওই সময় দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, যাদের দেখা আর কখনো মেলেনি। এটা হয়তো আমাকে ধর্মের প্রতি বিমুখ করে তুলেছিল।  স্বাধীনতার পর যদিও কয়েক বছর ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় থাকে, বাহ্যিক ভাবে হলেও সংখ্যালঘুরা মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ পায় দেশে, পঁচাত্তরে পট পরিবর্তনের ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আবার মাথা চারা  দিয়ে ওঠে।  হয়তো বা ধর্মকে এই ভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার কারণেই ধর্মের প্রতি জেগেছে অনীহা ঠিক যেমনটা পলপট, মাও  সে তুং  বা ষ্টালিনের নিপীড়নমূলক রাজনীতি সমাজতন্ত্রের প্রতি অনেককেই বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে।

এতো কিছুর পরেও একাত্তরে তীর-ধনুক নিয়ে খেলা, নিজেকে শত্রুর মোকাবিলায় তৈরী করা বৃথা যায় নি।  ওই খেলাটা শিখিয়েছে শত্রুদের মোকাবিলা করতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে।  একারণেই হয়তো আজও যখন প্যালেষ্টাইন, সিরিয়া, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান কিংবা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক কারণে কাউকে হত্যা করতে দেখি, প্রতিবাদে চিৎকার করে ওঠে হৃদয়, ওদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ছুটে  যায় মন। একেই হয়তো বলে একাত্তরের চেতনা।

মস্কো, ১২ নভেম্বর ২০১৬      
            


No comments:

Post a Comment