Monday, November 7, 2016

১৫. তিল্লী

অনেক আগে, যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না, রুগীদের প্রায়ই বেড়াতে যেতে বলতো ডাক্তাররা।  এর নাম ছিল হাওয়া পরিবর্তন।  জানিনা ডাক্তাররা কোন যুক্তি থেকে এটা করতেন, তবে আমার বিশ্বাস পরিস্থিতি বা পরিবেশ পরিবর্তন মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।  নিউটনের যুগে স্থান, কাল আর পাত্র ছিল একে অন্য থেকে বিচ্ছন্ন,  স্থান আর কাল  ছিল অ্যাবসলিউট বা পরম, আর পাত্ররা মানে আমি, আপনি, গ্রহ, নক্ষত্র সবাই খেলতাম এই আঙিনায়।  আইনস্টাইনের যুগে কেউ আর পরম রইলো না, সব হয়ে গেলো আপেক্ষিক, সবই পরস্পর নির্ভরশীল। তাইতো আমাদের লাগানো কয়েকটা গাছ ছায়া দেবার সাথে সাথে বিশুদ্ধ বাতাস দেয়  আবার এবার পিকনিকে গিয়ে ফেলে আসা গার্বেজ আগামী বছর আমাদের পিকনিকের আনন্দ মাটি করে।  কারণ আমরা পাত্ররা স্থান কাল থেকে ভিন্ন নই, বরং তারই অংশ।  আমাদের উপস্থিতি যেমন স্থান-কালকে প্রভাবিত করে, স্থান-কালও  প্রভাবিত করে আমাদের জীবন। তাইতো হাওয়া পরিবর্তন স্বাস্থ্যের জন্য এতো উপকারী। বিশেষ করে যুদ্ধের সময়, যখন প্রতিটি মানুষ প্রচন্ড মানসিক চাপে থাকে, অল্প ক্ষণের জন্য হলেও এমন পরিবর্তন খুবই উপকারী।  আজ টিভি আর ইন্টারনেটের কারণে যুদ্ধ যখন আমাদের বেড রুমে ঘুরে বেড়ায়, যখন টিভি বা কম্পিউটারের বাটনে চাপ দিয়ে দেখি কিভাবে হতভাগ্য মানুষ দিনের পর দিন কাটাচ্ছে বেসমেন্টে আর হঠাৎ ক্ষনিকের জন্য সূর্য্যের  আলোতে  বেরিয়ে আসতে  পেরে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে ওদের মুখ, তখন খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারি একাত্তরে এদিক সেদিক বেড়াতে যাবার পজিটিভ দিকটা।

বর্ষার শুরুতে জানতে পেলাম তাপসরা থাকে তিল্লী  গ্রামে।  তিল্লী  আমাদের পরিচিত নাম, আগে থেকেই শুনেছি অনেক।  বৈলতলা থেকে খুব যে দূরে, তাও নয়, বিশেষ করে যখন নৌকা করে যাওয়া যায়। তাপস আমার থেকে একটু বড়, যদিও খেলার সাথী।  ওদের বাড়ী  আমাদের রান্না ঘরের পেছনে, তবে মাঝে আমাদের আর বড়দার  মাইট্যাল থাকার ফলে মনা -পানাদের বাড়ী  আমার যেমন যাতায়াত ছিল ওদের বাড়ী  তেমনটা ছিল না।  তাছাড়া আমাদের দুই বাড়ির মাঝে ছিল ওদের বিশাল তেতুল গাছ, যেখানে বাস করতো গলাকাটা ভুত।  আর ছোট কাকা যখন  বারান্দায় বসে শোনাতো তারকা রাক্ষসীর গল্প, রাক্ষসীটা এসে ঠিক ওই তেতুল গাছের মাথায় বসে থাকতো।  আর মাইট্যালে থাকতো গুই সাপ, যেগুলো কারণে অকারণে থু থু ছিটাতো।  বলতো, ওই থু থু গায়ে লাগলে নাকি ঘাঁ  হয়। এ ছাড়াও ওরা  নিজেরাও খুব একটা আসতো  না পাড়ায়, তাই মনা- পানা -মন্টু-বাদলদের  সাথে   যতটা ঘনিষ্টতা ছিল, তাপসদের সাথে ততটা ছিল না, যদিও ওদের মামাতো ভাই, রতন মামা, তরা  এলেই সময় কাটাতো তপনদাদের সাথে, আমাদেরই বাড়ীতে।  তবে তাপসদের বাড়ীতে  একেবারে যে যাওয়া হতো না তা নয়।  মনাদের বরই, মন্টুদের জাম্বুরা, তাঁতী  মন্টুদের গোলাপজাম, সীতানাথদের কালো জামের মতোই বিখ্যাত ছিল তাপসদের কামরাঙ্গা আর জামরুল (আমাদের ভাষায় জাম্বুল।)    তাই যখনই  কামরাঙ্গা পাকতো  বা জাম্বুল, আমরা ঠিক গিয়ে হাজির হতাম ওদের ওখানে।  তাই ওদের তিল্লী  থাকার খবর পেয়ে বায়না ধরলাম তিল্লী  যাবো।

একদিন সবাই মিলে  নৌকা করে রওনা হলাম তিল্লীর  পথে।  মা, মেঝমা, খুড়ীমা, দিদি, রতন, মাখন কাকী, কাকা - আরো অনেকে।  যুদ্ধের আগে সবাই মিলে যেমন ঝিটকা যেতাম পিসি বাড়ী, অনেকটা তেমন করে।  গল্প করতে করতেই সময় পার হয়ে গেলো, এক সময় আমরা সবাই এসে পৌছুলাম তিল্লী  তাপসদের ওখানে।  এপ্রিলের প্রথমে গ্রাম ছাড়ার পর এই প্রথম দেখা।  সবাই সবার খোঁজ খবর নিতে শুরু করলো।  বড়রা জানতে চাইলো পরিবেশ, পরিস্থিতি।  আর কাদের কাদের সাথে যোগাযোগ আছে বা কাদের  খবর করা জানে এই সব।  আমাদের ছোটদের সময় কাটলো দৌড়াদৌড়ি করে, খেলে।  যেসব বন্ধুরা এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাদের নিয়ে কথা হলো।  ঠিক যেমনটা  হয় শান্তির সময়।  প্রথমে নিজেদের কথা বলে, পরে বলে পরিচিত লোকজনের কথা।  এভাবেই কেটে গেলো কয়েক ঘন্টা। হয়ে এলো ফেরার সময়। বিদায় নিলাম ওদের কাছ থেকে।

ফেরার পথে মূলতঃ  কথা হলো তিল্লী  ভ্রমণ নিয়ে।  ওখানে পাওয়া খবর গুলো নতুন করে একে অন্যকে বলতে লাগলো সবাই।  এক সময় সবার দৃষ্টি পড়লো এক বাড়ীতে। মাঝি বললো এখানে থাকে টেডি বৌ।  টেডি, মানে ফ্যাশনেবল। ওই বৌ নাকি প্যান্ট-শার্ট পড়তো যা তখনকার দিনে ছিল অবিশাস্য ব্যাপার।

তাপসদের সাথে দেখা মাত্র কয়েক ঘন্টার, কি বলেছিল, কি খেলেছিলাম মনে নেই আজ।  তবে ওই সাক্ষাতের ইম্প্রেশন ছিল অনেক। বৈলতলা আসার পর  এই প্রথম মা, মেঝমা, খুড়ীমা বাড়ীর  বাইরে বেরুলো।  আর যুদ্ধের সময় এ এক বিশাল  বিলাসিতা।  কিছু কিছু ঘটনা আছে যা সময় দিয়ে মাপা যায় না, কিন্তু তার ইম্প্রেশন বা ছাপ  হয় সুদূরপ্রসারী। যেমন কিছু কিছু কথা কানে বাজে সারা জীবন, বা প্রথম সাক্ষাতে  কোনো কোনো নিষ্পাপ হাসি মনে এতো গভীর দাগ  রেখে  যায়  যে যখন বছরের পর বছর দেখা হয় না, থাকে  না কোনো যোগাযোগ, হাসিটা ঠিক থেকেই যায়, মনের ভেতর, অথবা তারা ভরা রাতে আকাশের গায়।  একজুপেরি  যেমন রাতের আকাশে তাকিয়ে সুদূর  কোনো নক্ষত্রে দেখতে পায়  তার লিটল প্রিন্সকে, আমিও তেমনি রাতের আকাশে দেখি সেই দুটি চোখ, সেই হাসি।

দুবনা, ০৮ নভেম্বর ২০১৬  


No comments:

Post a Comment