Thursday, November 17, 2016

২১. কচুরি পানা



দিন আসে দিন যায়, একে  একে চলে যায় বসন্ত, গ্রীষ্ম।  বর্ষাও  যাই যাই করে, কিন্তু যুদ্ধ আর যায় না।  জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকে বুকের উপর।  এ যেন এক বিশাল অজগর, জাপটে  ধরে বসে আছে সারা দেশটা আর সময়ের সাথে সাথে পেষণটা হচ্ছে আরো আরো বেশী  শ্বাসরুদ্ধকর।  মা প্রায়ই বলে
- ঝড় আসে, ঝড় যায়।  এই যুদ্ধের দেখছি আর কুল-কিনারা নাই।  চলছে তো চলছেই, দিন নেই, রাত্রি নেই, অবিরাম এই চলে যাওয়া।  আর কত?
বাবা শান্তনা দেয়
- এতো উতলা হলে চলবে? যা হয় মঙ্গলের জন্যেই হয়।
- ধুত্তরি, ছাড়ো  দেখি তোমার মঙ্গল। তোমার মঙ্গলে জীবন ত্রাহি ত্রাহি।
বাবা আর কথা বলে না।  কিই বা বলার আছে।
সত্যি, এক ধরণের একঘেঁয়েমিতে  ভরে  যায় সবকিছু।  যুদ্ধের ডামাডোল আর কাউকে চাঙ্গা করে না, সব কেমন যেন পানসে লাগে।
এখনও  সবাই অপেক্ষা করে আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের ভরাট গলা শোনার জন্য, অথবা নীলিমা স্যান্নালের দেয়া যুদ্ধের খবর।  এম আর মুকুলের চরমপত্র এখন আর আগের মতো হাসায় না।  সবই কেমন যেন মনে হয়, দূরে, বহু  দূরে।  
আসলে রণাঙ্গন থেকে যে একটু আধটু খবর আসে, তা সীমান্ত এলাকার।  আমাদের এলাকায়, মানে মানিকগঞ্জে  যুদ্ধের দামামা তেমন বাজে না।  এখানে যুদ্ধুটা যেন লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।  মাঝে মধ্যে এখানে সেখানে কাউকে মারার খবর আসে, আবার সব চুপচাপ।  থমথমে এক পরিবেশ। ঝড়ের আগে যেমনটা হয়।  অবস্থা এমন, আজকাল ভয় পেতেও যেন আলসেমি লাগে, একঘেঁয়েমী  লাগে।  এমনি এক দিনে হঠাৎ দেখি মাখন কাকা বাড়ীর  পেছনে কচুরি পানা  জড়ো  করছে।
- কি হবে কাকা এই পানা দিয়ে?
- পরে গরুকে খাওয়াবো।  তাছাড়া শুকিয়ে জ্বাল দেয়া যাবে।  বলাতো   যায়না, কখন কি দরকার।

এখন বুঝি, এসবই  ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার  বহিঃপ্রকাশ।  মানুষ যখন আগামী দিনের ছবিটা ঠিক দেখতে পায়না, তখন খড়কুটো যা পায়, সবই রেখে দেয়  যদি কাজে লাগে এই ভেবে।

জীবনে এত্তো  কচুরি পানা দেখিনি এক সাথে।  বইরাগীর  চক  দিয়ে ভেসে আসা পানা  নৌকা করে ধরে ধরে নিয়ে আসছে মাখন কাকা আর রাখছে বাড়ীর  পেছনের মাইট্যালে। পরে আমরাও নেমে গেলাম এই কাজে।  যাই হোক, কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে তো।

পানা  ছিল আমাদের কাছে অনেকটা রূপকথার মতো। ছোটবেলায় জেঠিমা গল্প করতো যে  ওই পানার উপর নাকি শ্রীকৃষ্ণ নেচেছিল, যেমনটা গোখরো সাপের ফণায়।  তাই গোখরো সাপের ফণায় যেমন শ্রীকৃষ্ণের পায়ের ছাপ, ঠিক তেমনি কচুরি পানাতেও আছে তার পদচিন্হ।  এদিক দিয়ে দেখতেগেলে শ্রীকৃষ্ণ   খুব স্মার্ট ছিলেন, যাতে ভক্তদের কষ্ট করে দূরদূরান্ত থেকে তার পদযুগলের খোঁজে যেতে না হয়, উনি নিজেই গোখরো সাপের ফণায় আর কচুরি পানায়  নিজ পদচিন্হ পাঠিয়ে দিয়েছেন ভক্তদের বাড়ী  বাড়ী।

আমাদের ওদিকটায়  কখনো পানা ধরে রাখতে দেখিনি।  আর এতো পানাও ছিল না আমাদের দিকে।  আমরা মূলতঃ  পছন্দ করতাম গাস্যির পানা। এই পানাগুলো ছোট ছোট, পাতাগুলো কোঁকড়ানো।  এখনকার ভাষার ন্যানো সাইজের  পানা  আর কি।  এই পানা আমরা ব্যবহার করতাম গাস্যিতে, তাই এই নাম।

কথায় বলে বারো মাসে তেরো পার্বন।   হিসেবে করলে ওদের সংখ্যা আরো অনেক বেশী। শুধু কার্তিক  মাসেই তিন তিনটে।  মাসের প্রথম দিন শুরু হতো আকাশবাতি দেয়া।  বাঁশ  দিয়ে একটা খোল (ঢোল) সাইজের কাঠামো করা হতো, আর ওটাকে লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা হতো। ওর মাঝখানে রাখা হতো প্রদীপ, মাটির বা পেতলের।  তেল, সলতাসহ।  তারপর প্রদীপ্ত জ্বালিয়ে পতাকা যেমন ওঠায় এই বাতিটাকেও ওঠানো  হতো লম্বা একটা বাঁশের  মাথায়, আকাশে।  আর বাঁশটা  পোতা থাকতো তুলসীর  ভিটার কাছে।  আকাশে  থাকতো, তাই নাম আকাশবাতি। পুরো একমাস ধরে এই বাতিটি প্রতিদিন   সন্ধ্যায় তোলা হতো আর সকালে নামানো হতো।  

কার্তিকের দ্বিতীয় পার্বন  ছিল এই  গাস্যি। সন্ধ্যায় দুপধুনা জ্বালানো হতো।  এর প্রধান উপকরণ ছিল গাস্যির পানা, নারকেলের ফোঁপা আর তালের আটি। পাকা (বাত্তি) নারকেল অনেক দিন থাকলে ওর ভেতর গজাতো এই ফোঁপা, বেশী বড়  হয়ে গেলে ন্যাকেলের চারা  বা গ্যাজ বেরিয়ে আসতো  নারকেল চিরে।  তালের ব্যাপারটা ছিল খুব মজার।  তাল কচি পারলে আমরা খেলাম তালের শাস বা তালের আটি।  ভেতরে একটু জল, জেলীর  মতো ব্যাপারটা।  আর তাল পাকলে বাইরের ছোবা  ঘষে হলুদ রঙের রস  বের করা হতো যা মুড়ি দিয়ে খেতাম।  কখনো ওটা জ্বাল দেয়া হতো।  করা হতো তালের বড়া, তালের পিঠা, তালের মালপোয়া।  আরো কত কি। আর ঐ পাকা তালের আটি  কল তলায় বা কোনো স্যাতস্যাতে জায়গায় পোতা হতো।  কিছুদিন পর ওখান থেকে তালগাছ উঁকি মারতো, আর আটির  ভেতরে হতো ফোঁপা। এই ফোঁপাটাই লাগতো গাস্যির কাজে।

কার্তিকের শেষ পার্বন  ছিল ভেলা-ভুইল্যা। সকাল থেকেই সাজ সাজ রব।  দুটো  বাঁশ পেরেক দিয়ে গেঁথে  ক্রসের মতো বানাতাম,  আর নীচে  একটু জায়গা বাদে সবটা জড়িয়ে দিতাম ধানের  (আউশ ধানের) খর দিয়ে। সাথে ন্যাকরাও  জড়াতাম।  অনেকটা কাকতাড়ুয়া মতো, তবে মাথায় হাঁড়ি  ছাড়া। সন্ধ্যে হলেই ওতে কেরোসিন ঢেলে চলে যেতাম খোলা মাঠে। জ্বলে উঠতো আগুন। ওই জ্বলন্ত বাঁশের  ক্রস নিয়ে দৌড়াতাম আর গাইতাম

ভেলা আইলো ভুইল্যা যায়
ইচার  মুইড়া কুমিরে খায়

শুরু হতো লড়াই। ক্রস দিয়ে একে অন্যকে আঘাত করতাম যেন লাঠি খেলা বা তলোয়ারের লড়াই। শেষ ক্রসটা না পুড়া  পর্যন্ত চলতো এই লড়াই।  এভাবেই আমরা কার্তিককে বিদায় দিতাম, গ্রহণ করতাম অগ্রহায়ণকে।  এখন এই রাশিয়ায় যখন মাসলেননিৎসায় শীতের পুত্তলিকা দাহন করতে দেখি আমার মনে হয় সেই দিন গুলির কথা।  কত দূরের এই দুই দেশ, কত ভিন্ন এদের চলন-বলন,  অথচ কত  সামঞ্জস্য এদের কিছু কিছু অনুষ্ঠানে।  এদেশে মাসলেননিৎসা প্রাক-ক্রিষ্টান  যুগের, পৌত্তলিক।  যতদূর মনে পরে দেশে ভেলা-ভুইল্যার শেষে খাবার হিসেবে থাকবো মাছ আর বিভিন্ন পিঠা, এখানেও ওরা  অনেকটা পাটিসাপটা  জাতীয়  একটা পিঠা করে যার নাম blini.

মনে হয় কার্তিকের ওই পার্বন গুলো ছিল যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে বেশী  প্র্যাকটিকাল।  ওই সময়ে দেশে আউশ ধান উঠতো।  পোকা  যাতে ধান নষ্ট না করে  তাই এই সব আগুনের আর ধোয়ার ব্যবস্থা।  তখন আজকালকার মতো এতো সার ছিল নাতো।

দুবনা, ১৭ নভেম্বর ২০১৬  





4 comments:

  1. তোর কার্তিকের তিন পার্বনের বর্ণনা বেশ মজার

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমিতো এসব ভুলে যেতেই বসেছিলাম, এখন লিখতে বসে মনে পরে গেলো এসব কথা।

      Delete
  2. মাসলেনিৎসার সাথে তুলনাটা ও স্থান কালের উর্ধে অনেক folklore tradition এর একাত্মীতা প্রকাশ করে। একটা শীত বিদায়ের আনন্দ, আর অন্যটা ফসল তোলার আনন্দ !

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যা, ঠিক বলেছিস, এসবই দেখায় যে দেশে দেশে মানুষেরা অনেক আগে থেকেই একই ভাবে ভাবতো। আমরা ছোট বেলায় বলতাম যদি রোদের সময় বৃষ্টি হয় তবে শেয়ালের বিয়ে হয়। পরে কুরাসাবার এক সিনেমায় দেখেছি জাপানেও এমনটাই বিশ্বাস করে।

      Delete