Wednesday, November 23, 2016

২৪. আর পি সাহা

তালৈ মশাই  এলেন মনে হয় শীতের প্রারম্ভে।  আসলে যত কিছুই বলি, আমাদের দিনক্ষণ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত স্কুল-কলেজ বা পূজা-পার্বনের সাথে।  যুদ্ধের সময় যেহেতু দুটোই বন্ধ ছিল, তাই ঠিক কখন যে কোন ঘটনা ঘটেছিলো, হলপ করে বলতে পারবো না।  তবে এটুকু মনে আছে,  উনি এসেছিলেন পায়ে হেঁটে।  এমনিতে মির্জাপুর থেকে বৈলতলার দূরত্ব খুব  বেশি না, অন্ততঃ  এখন গুগল ম্যাপ খুললেই সেটা বুঝা যায়।  সেই সব দিনে  আমাদের বাড়ী  থেকে মির্জাপুর ছিল পুরো এক দিনের পথ, মানে অনেক দূর।  আমারা মামা  বাড়ী  যেতাম তিন তিনটে নদী  ফেরী  করে পার হয়ে, ঢাকা ঘুরে।  তাই তখন আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম এতো ঝঞ্ঝাট পেরিয়ে তালৈ মশাই  আসায়।  এখন, যখন রাস্তা-ঘাট  অনেক উন্নত হয়েছে, ভেতর দিয়ে অনেক রাস্তা হয়ে গেছে, আমার বাড়ী  থেকে মির্জাপুরের দূরত্ব বারো ঘন্টা থেকে নেমে মাত্র ঘন্টা  দুই-আড়াইতে  দাঁড়িয়েছে, এটাকে তেমন দূরত্বই মনে হয় না।  তালৈ মশাই যে সে পথেই এসেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যাই হোক, প্রথমে তাদের নিজেদের আর মামাদের খবরাখবর নেবার পর সবাই জানতে চাইলো আর পি সাহার কথা।  আমার মনে নেই ওনার মৃত্যু সংবাদ আমরা আগে জানতাম কি না? জানতাম যে উনি মির্জাপুরেই ছিলেন, আর পাক আর্মিরা তার ওখানে ক্যাম্প করেছিল।  এটাকে কেউ কেউ পাকিস্তানী শাসকদের সাথে আর পি সাহার উঠাবসার পুরস্কার  মনে করলেও আসলে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল।  

 রণদা সাহা আমাদের  পরিচিত ছিলেন, তাছাড়া বৌদিদের বাড়ী  ছিল তাদের বাড়ীর  পাশেই। ছোট বেলায় অনেক বার গেছি তার সেই বিখ্যাত কুঁড়েঘরে, মায়ের সাথে।    সব মিলিয়ে খুব আপন ছিলেন তিনি। অনেক গল্প শুনেছি তাকে নিয়ে।  লবণের ব্যবসা করে এক সাধারণ পরিবার থেকে এতো উপরে উঠে আসেন।  আর শুধু নিজেই ধন উপার্জন করেন নি, দুহাতে তা বিলিয়ে গেছেন মানুষের মাঝে।  বাংলাদেশে প্রচুর স্কুল-কলেজ আছে যা ব্রিটিশ আমলে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় করা।  কেউ জায়গা দিয়েছে, কেউবা স্কুলঘর বা কলেজ তৈরী করে দিয়েছে।  আর পি সাহা মনে হয় হাতে গোনা কিছু লোকের একজন যিনি জমিদার ছিলেন না।  তার তৈরী কুমুদিনী হাসপাতালের নাম জানতো না এমন লোক তখন পাওয়া কষ্ট। এটা শুধু হাসপাতালে নয়, স্কুল, কলেজ আরো কত কি? মির্জাপুরের বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল।  মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে আমি নিজেই পড়াশুনা করেছি।  যদিও স্কুলের পাঠ্য বইতে আমরা দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীনের  গল্প পড়েছি,  দান কর্মের দিক দিয়ে রণদা সাহাও কম করেন নি কোনো মতেই। এই প্রাচুর্যের জন্যই হোক বা দানকর্মের জন্যই হোক উনি মানুষের মাঝে রণদা সাহেব নামেই পরিচিত ছিলেন।     দেশভাগের পর যখন একের পর এক হিন্দু জমিদাররা দেশত্যাগ করেছে, তখন উনি দেশ ছাড়ার  চিন্তা করা তো দূরের কথা, দুহাতে নিজের ব্যবসাকে প্রসস্থ করেছেন, আর দেশ ও দেশের মানুষের জন্য একের পর এক হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব গড়ে গেছেন।   তাই পাক সেনারা যে তাকে হত্যা করবে, এটা ছিল অনেকটা ধারণার অতীত। তবে আমরা ধারণা করি মানুষদের ব্যবহার নিয়ে, অমানুষদের ব্যবহার  নিয়ে তো আর করতে পারি না।

আর পি সাহার হত্যার খবর তাই ছিল খুবই পীড়াদায়ক।  হত্যা করা হয়েছিল শুধু তাকেই নয়, তার একমাত্র ছেলে রবিদা কেউ।  আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে ছেলেকেই একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করা হয়, তাই দুই মেয়ে জীবিত  থাকার পরও  আর পি সাহার এই বিশাল সাম্রাজ্যের কি হবে তা নিয়েও কথা বলছিলো বাবা-কাকারা।  যুদ্ধ চলছে, অনবরত লোকজন মারা যাচ্ছে, তবে অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, সমাজের উঁচু পর্যায়ের ঠিক কেউ নন।  অন্ততঃ  আমরা তখন জানতাম না।  বুদ্ধজীবীরা তখন সবাই বেঁচে আছেন।  তাই এই খবর ছিল অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। যুদ্ধের প্রথম দিকে পাকবাহিনী এলোপাতাড়ি সবাইকে হত্যা করে সন্ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশে।  কিন্তু এর পরেও মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ করে, হাতে তুলে নেয় অস্ত্র, পাকিস্তান চায় এই মুক্তিযুদ্ধকে এক সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে।  গ্রাম এলাকায় বেছে বেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করা হয়।  শুনেছি , বয়স্ক পুরুষ মানুষ দেখলেই ওরা  প্রথমে পরীক্ষা করতো ওই লোকের মুসলমানী  করা হয়েছে কিনা? অনেক জায়গায় জীবনের ভয়ে অনেকে ধর্মান্তরিত হয়।  আমাদের গ্রামে ভাষান  ঠাকুর আর তার ছেলে  অধীর ঠাকুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।  যুদ্ধের পরে যদিও তারা আবার স্বধর্মে ফিরে আসে, অনেক পরে অধীরদা আবার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় আর গোলাম রসূল নাম নিয়ে পীরের মর্যাদায় দিন কাটায়। অধীরদা  বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রামেই ফিরে আসে।  সমাজের উচ্চ পর্যায়ের বহু লোক তার অনুসারী হয়।  আমাদের সাথে অবশ্য সব সময়ই তার ভাল সম্পর্ক ছিল, আমি দেশে গেলে দেখা হতো।  আমাদের কাছে সে  কখনো গোলাম রসূল ছিল না, আমাদের অধীরদাই ছিল।

তালৈ মশাই দিন দুয়েক থেকে চলে যান নিজের ছেলেমেয়েদের কাছে।  পেছনে রেখে যান এক রাশ বেদনা, প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা।

এখনো দেশে গেলে মির্জাপুর যাই মামা বাড়ী, ঘুরে আসি আর পি সাহার বাড়ী।  সেই কুঁড়েঘর এখনো আগের মতোই আছে।  বাড়ী  জুড়ে নাট মন্দির আর সেই বিখ্যাত পানসি নৌকা এখন তোলা আছে বাড়ির এক কোনে।


দুবনা, ২৩ নভেম্বর ২০১৬  



No comments:

Post a Comment