Tuesday, November 15, 2016

১৯. বিদায়ের পালা

মাইল্যাগী আর বাঙ্গালায় স্বল্পকালীন কিন্তু অনিশ্চিত অবস্থানের পর আমরা আসি বৈলতলায়। অনেকাংশেই বৈলতলা হয়ে উঠে আমাদের আপন। প্রথমতঃ  বাড়ীর  মতোই এখানে ছিল অনেক প্রস্তর।  মাইল্যাগী  আর বাঙ্গালায়  ছোট্ট বাড়িতে আমরা অস্বস্তি অনুভব করছিলাম, এখানে অনেক বড় বাড়িতে আমরা যেন আবার নিজেদের ফিরে পাই, কাউকে বিরক্ত না করেই নিজেদের মতো নিজেরা চলার আর থাকার সুযোগ পাই।  দ্বিতীয়তঃ  এখানেই  আমরা প্রথম আবার সবাই, মানে বাবা-কাকা-জ্যাঠামশাই, এক সাথে থাকার সুযোগ পাই।  ব্যাপারগুলো আপাতঃ  দৃষ্টিতে খুব ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, তবে আজন্ম গড়ে উঠা  পরিবেশ বিপদের সময় মানুষকে মানসিক শক্তি দেয়। মানুষকে পথ দেখায়, বিপদের মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। কথায়  বলে নিজের বাড়ীর  দেয়াল পর্যন্ত গৃহস্থের  হয়ে লড়াই করে। ঘর তো  শুধু  ইট-পাথর নয়, ঘর - সবার আগে ঘরের বা পরিবারের মানুষগুলো।  তাইতো যুদ্ধের সময়ই  হোক আর শান্তির সময়ই হোক, পরিবারের  সবাই ঘরে ফিরে আসলে আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি।

বৈলতলায় আমরা সবাই শুধু একসাথে থাকতামই  নয়, এখানেই  ধীরে ধীরে শুরু হয় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশের কথা ভাবা।  আকাশবাণী আর স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারকেন্দ্র থেকে ভেসে আসা আশার  বাণী আমাদের মনে সাহস জোগাতো।  ওই স্বপ্নের হাত ধরেই জীবন ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছিলো স্বাভাবিকতার দিকে, এমনকি  সুতার ব্যবসাটাও হাটিহাটি  পা পা করে এগুচ্ছিলো সামনের দিকে। এই ব্যবসা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যাই  মেটাতো না, যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলিয়ে রাখতো, এটা ছিল এই ভয়াবহ সময়ে  অনেকটা মরুদ্যানের মতো।

তাই একদিন যখন দিন দুপুরে রাজাকার এলো বাড়ীতে , সময় এলো নতুন করে সবকিছু ভেবে দেখার, জীবনটা নতুন করে ঢেলে সাজানোর। এই আক্রমণ আমাদের বুঝিয়ে দিলো কত ভঙ্গুর ছিল আমাদের নিরাপত্তা, কত সহজ ছিল মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু তছনছ করে দেয়া।  বাবা-কাকারা বাড়ীর  মেয়েদের বিশেষ করে দিদি আর চন্দনার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ হলো। এদিকে রাজাকারদের হাতে ধরা পরে কল্যাণদাও ভয় পেয়ে গেলো।  সব মিলিয়ে সময় এলো সিরিয়াসলি সব কিছু নতুন করে ভাবার।  আমার মনে হয় মাইল্যাগী  বা বাঙ্গালা  থেকে যত সহজে আমরা কোথাও  সরে পড়তে পেরেছি, এখন আর সেটা সম্ভব ছিল না।  প্রথমতঃ  তাতে করে আবার সবাইকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে হতো, দ্বিতীয়তঃ  ব্যবসাটা শুরু হওয়ায় বড়রা  আবার নতুন কর্মকান্ডে  জড়িয়ে পড়েছিল।  শুধু যেতে চাইলেই  তো হবে না, কোথায় যাওয়া যায় সেটাও ভাবতে হবে, সেখানে কতটুকু নিরাপদে থাকা যাবে, কিভাবে সংসার চলবে - এ প্রশ্নগুলোর উত্তরও  দিতে হবে।  তাছাড়া যতই দিন যাচ্ছিলো, কুদ্দুস ভাইদের মতো লোক, যারা এই বিপদের দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, তাদের সংখ্যাও কমছিল।  সব মিলিয়ে একেবারে নতুন ধরণের সমাধান খুঁজছিলো সবাই।

যুদ্ধ চলছিলো ঠিকই, তবে সেই সাথে বিভিন্ন ভাবে আত্মীয় স্বজনদের সাথে  যোগাযোগও  রক্ষা করে চলছিলাম আমরা।  তখন ইন্টারনেট ছিল না, ফেসবুক ছিল না, টেলিফোনও ছিল নামমাত্র, তাই যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল চিঠিপত্র।  এখন যেমন আমরা ঘুম  থেকে উঠেই প্রথমেই ই-মেইল চেক করি, যুদ্ধের আগে এবং পরেও আমরা তেমনি করে প্রতিদিন যেতাম ডাকঘরে চিঠি  এলো কিনা তা দেখতে।  এমন দিন খুব কমই  ছিল, যেদিন আমাদের বাড়ীতে  চিঠি আসতো  না।  মামারা লিখতো প্রতি সপ্তাহে, লিখতো দাদারা।  চার দাদা কলকাতায় পড়াশুনা করতো,  চার মামা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় থাকতো।  আমার নিজের চার মামা আর এক মাসী  - সবাই ওপারের বাসিন্দা, কেউ দেশ ভাগের আগে থেকেই, কেউ বা পরে যায়।  একমাত্র মা-ই  এদিকটায় রয়ে গেছিলো।  মাসীমা ছিল সবার বড়, দু বোনের পর চার মামা। তাই ওরা  পালা করে নিয়মিত মাকে লিখতো। এমন কি আমার মেঝো মামা, অমূল্য সিংহ, যে নিজের মতো করে নিজেকে গড়বে  বলে বাড়ী  থেকে পালিয়ে জয়ন্ত চৌধুরী হয়ে যায়, সেই মামাও তার ছোড়দিকে নিয়মিত লিখতো।  ওদের চিঠি আসতো  আমাদের বাড়ীর  ঠিকানায়, সালাম ভাই সেগুলো দিয়ে যেত।  আর আমরা উত্তর লিখতাম, তা পোষ্ট  করা হতো যেসব  জায়গায় থাকতাম  তার থেকে দূরে কোনো ডাকঘর থেকে, যাতে পোষ্ট অফিসের সূত্র ধরে কেউ আমাদের খোঁজ না পায়।

ওখানে থেকেই প্রস্তাব আসলো দিদিদের কলকাতা পাঠানোর।  তবে আগে রাস্তা ঘাট দেখার জন্য গেলো শ্যামলদা আর দিলীপ মামা। শ্যামলদা - আমাদের জ্যাঠতুতো ভাই, আর দিলীপ মামা বড়দির ছেলে। ওরা  তখন কলেজের ছাত্র। দিলীপ মামা খুব ভালো গান গাইতো। শ্যামলদা সারাজীবন গ্রামের বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজ করেই গেলো।  যাকগে, একদিন ওরা  চলে গেলো আমাদের পেছনে ফেলে। শুরু হলো অপেক্ষার পালা।  কখন খবর আসবে ওরা দুজন নিরাপদে পৌঁছেছে সীমান্তের ওপর। মনে হয় মাস খানেক  পর ওদের পৌঁছুনোর খবর এলো।  এখন দিদিদের ওদিকটায় পাঠানো যায়।

এর মধ্যে আমাদের গ্রামের চুনী  বাবু (চুনী বসাক) ভারত যাবে বলে ঠিক করলো।  ওদেরও  বিরাট সংসার - দুই ছেলে, চার মেয়ে - এক মেয়ে দিদির সমবয়সী, বান্ধবী। একদিন আমাদের ঘটে এক বিশাল নৌকা ভিড়লো, আমরা বলতাম গোপালগঞ্জের নৌকা বা বাদামী নৌকা।  এই নৌকাগুলো ধান-পাট  নিয়ে যেতো  এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। বর্ষার সময়ে কালিগঙ্গা দিয়ে কত গোপালগঞ্জী নৌকা যে যেত, তার হিসেবে রাখে কে? ওদের ছিল বিশাল পাল, তেমনি বড় হাল আর অনেকগুলো বৈঠাওয়ালা।  কখনো কখনো পালে  বাতাস না থাকলে উজান পথে এই বৈঠাওয়ালারা  গুন টানতো।  দিদি, চন্দনা, রঞ্জিতদা আর কল্যাণদাকে চুনী  বাবুর হাতে তুলে দিয়ে চোখের জল মুছলো মা-খুড়ীমা। হঠাৎ করেই বাড়ী  যেন খালি হয়ে গেলো, শুরু হলো নতুন করে অপেক্ষার পালা।  এক দিন এই পথ চেয়ে থাকায় শেষ হলো, প্রায় দুই  মাস পরে খবর এলো ওদের সীমান্ত পার হবার।  সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস  ফেলে বাঁচলো।

মানুষের দু ধরণের গল্প থাকে - সাফল্যের কথা আর ব্যর্থতার কথা।  ব্যর্থতার কথা কেউ বলতে চাইলেও খুব কম লোকই তা শুনতে চায়, আর যারা সফল তারা সাক্সেস  স্টোরিই বলে এই সাফল্যের পিছনে  হাজারো কষ্টের কথাটা সযত্নে গোপন রেখে।  অনেকটা এলাম, দেখলাম, জয় করলাম টাইপে। আশির দশকের শেষ দিকে রাশিয়া যখন বিদেশী ছাত্রদের অনুমতি দেয়  বাইরে (সিঙ্গাপুর, তুরস্ক বা ইউরোপ) গিয়ে কম্পিউটার আর গার্মেন্টস নিয়ে আসতে, আমাদের অনেক বন্ধুরাই সেই সুযোগ গ্রহণ করে।  এর আগে এ দেশে এসব কাজকে চোরাচালানী  বলে মনে করা হতো, আর ধরা পড়লে শাস্তিও হতো।  আমরা যারা সমাজতন্ত্রে আর সোভিয়েত  সিস্টেমে বিশ্বাস করতাম, এসব করতাম না।  তবে নতুন বাস্তবতায় অনেক বন্ধুরাই বাইরে যেতে শুরু করে, অনেকেই রাতারাতি বেশ সম্পদের মালিক হয়।  আমি তখন যেমন, এখনো তেমনি খুশী  হই, যখন দেখি আরো একজন বন্ধুর অবস্থা ঘুরলো।  লক্ষ্মীর সাথে আমার  সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না।  আসলে শুধু লক্ষ্মী কেন, কোনো  দেব দেবীর  সাথেই আমার সম্পর্ক ভালো  নয়।  ভগবানের সমালোচনা করবে, আর তার বৌ-বাচ্চা-বন্ধু-বান্ধবের সাথে খাতির থাকবে তা তো হয় না।  ওখানে মীরজাফররা এখনো জন্মেনি মনে হয়। বন্ধুদের সচ্ছলতায়  খুশী কারণ - পটেনসিয়ালি  ওরা  লোন  দিতে পারে, তাছাড়া এটা  হলে অন্ততঃ  ওদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না।  কেউ আর্থিক বিপদে পড়লে টাকার বস্তা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারি না ঠিকই, তবে ওদের জন্য মনটা খারাপ তো করতেই পারি।

যাকগে, একদল বন্ধুর অবস্থা ফিরলে সুবিধার সাথে সাথে কিছু অসুবিধাও দেখা দিলো।  সুবিধা গুলো হলো, ওদের ওখানে আড্ডা হতো, খাওয়া দাওয়া হতো, ট্যাক্সি করে ঘুরা  হতো - এক কোথায় লাইফে একটা এলিটি ভাব এলো।  কিন্তু বলে না, মানুষ অভ্যাসের দাস।  এক বার অভ্যেস হয়ে গেলে সে আর তার পকেটের কথা ভাবে না।  আমিও  তাই।  তাই এক সময় দেখা গেলো, একটু একটু করে শীতের তাপমাত্রার মতো আমার পকেটের তাপমাত্রাও মাইনাসের কোঠায়  চলে গেলো।  এক বন্ধু  বললো, তুরস্ক থেকে জ্যাকেট নিয়ে আয়, আমি টাকা দেব, বিক্রির ব্যবস্থা করবো।  আমার রুমমেট যাবে তোর সাথে, তোকে শুধু গেলেই হবে, কিছু করতে হবে না।  আরেকজন বললো,"বিজন দা, আমি কয়েকদিন আগে তুরস্ক থেকে ঘুরে এলাম।  গেলাম, এটা-ওটা কিনলাম, এখানে বিক্রি হলো, মাত্র দুই সপ্তাহে নীট  লাভ এতো।  আপনি যান, কোনো প্রব্লেম হবে না।" আমিও ভাবলাম, এই সুযোগে একটা দেশ দেখা হবে, কিছু ছবি তোলা হবে।  রাজি হয়ে গেলাম।  রুমমেট আর গেলো না।  ট্রেনে আলাপ হলো এক অস্ট্রেলিয়ান বাহাঈয়ের  সাথে।  আর ছিল ওডেসা থেকে কিছু নাইজেরিয়ান ছেলে।  ওরাই নিয়ে গেলো বিভিন্ন জায়গায়। ওরা  মার্কেটিং করে, আমি ছবি তুলে বেড়াই।  ওদের কাজ শেষের দিকে। বললো, "বিজন  তাড়াতাড়ি করো, একটু পরেই ট্রেন।" আমি তাড়াহুড়া করে কয়েকটা দামী  জ্যাকেট কিনলাম, নিজের জন্য সোয়েটার, আর কয়েকটা এমনি সোয়েটার বিক্রির জন্য।  দোকানদার কত কথা বললো, বাংলাদেশের গল্প শোনালো।  আমি তো আনন্দে গদগদ।  পরে মস্কো ফিরে দেখি সোয়েটারগুলো ছেড়া। জ্যাকেট অনেক দামী, তাই বিক্রি করে লাভ  গেলো না।  এদিকে যে ছেলে কয়েক দিন আগে ঘুরে এলো আর আমাকে যেতে উৎসাহিত করলো, ওর ঘরে জ্যাকেট কিনতে  এসে ফ্রাইপ্যান দিয়ে মাথা ফাঁটিয়ে  বিনে  পয়সায় সব নিয়ে গেছে, ও হাসপাতালে।  আমার ধার শোধ তো হলোই না, বরং ধারটা আরো বেড়ে গেলো।

রাশিয়ার গল্পটা করা এ জন্যেই যে, আমরা অনেক সময় রেজাল্ট জেনেই ওই ফলাফলে আসার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।  আমি যখন এই লেখাটা শুরু করি, মনেই হয়নি এতো কিছু মনে পরবে। অনেক সময় খারাপ লাগে ভেবে যে, যখন বাবা-কাকারা বেঁচে ছিল, তাদের কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। তাই এবার ঠিক করলালম দিদিকে ওদের ইন্ডিয়া যাবার কথা জিজ্ঞেস করবো।

- দিদি, তোর মনে আছে ইন্ডিয়া যাবার কথা?
- হ্যা, থাকবেনা কেন?
- বলবি একটু  বিস্তারিত?
- ঐ তো শ্যামলদা আর দিলীপ মামা চলে যাবার পর আমরা চুনী  জামাইবাবুর সাথে রওয়না হলাম। সারাদিন থাকতাম নৌকার খোলে, উপরে পাট  দিয়ে ভরা।  নৌকা চলতো কখনো দিনে, কখনো বা রাতে।  রাত পোহানোর আগে চরণদার (মানে নৌকার ক্যাপ্টেন) আমাদের নামিয়ে দিত নদীর পারে।  অন্ধকারে কোথাও বসে প্রাকৃতিক কাজ শেষ করে নদীতে স্নান করে আমার নৌকার খোলে ঢুকতাম।

আমি ভাবতেই পারিনি ওদের নৌকার খোলে অর্থাৎ নৌকার তলা আর পাটাতনের মাঝের জায়গাটায়  থাকতে হয়।

- তার পর?
- কথা ছিল এক মাস পরে পৌঁছে যাবো। সেখানে সময় লাগলো দুমাস।  সাথে যে খাবার দাবার এনেছিলাম, সব শেষ।  শেষের দিকে অনেক জলের মধ্যে একটু চাল  ছেড়ে দিয়ে ওটাই খেয়ে থাকতাম। কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ঘন্টার পর ঘন্টা।  পুড়িয়ে দিতো সামনের  নৌকা, বা ডুবিয়ে দিতো।  চরণদার ছিল মুসলমান, সে খুব কায়দা করে আমাদের লুকিয়ে রাখতো, আগে থেকে খোঁজ খবর নিয়ে সামনে এগুতো।
- তা তোরা শেষ পর্যন্ত পৌছুলো কোথায়?
- আমরা উঠলাম গিয়ে ধূপগুড়ি। কিন্তু সেখানে রিফিউজি দিয়ে ভর্তি, থাকার কোনো জায়গা নেই, বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না।  আমরা এতোগুলো লোক।  তারপর অনেক কষ্টে এক বাড়িতে একটা ফাঁকা গোয়াল ঘর ভাড়া পেলাম। গরুটা নাকি কয়েকদিন আগেই বিক্রি হয়ে গেছিলো।  বাড়ীর  সাথেই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প।  ওরা  সকাল বিকাল ট্রেনিং নিতো, আমরা ওখানে গিয়ে দেখতাম।  এভাবে কাটলো একমাস।  খুব কষ্টের একমাস। আমাদের হাতে তো তেমন টাকা পয়সা দিয়ে দেয়  নি।  কল্যাণ আর রঞ্জিতদার পেট ভরতো  না এতো অল্প খাবারে, ওদের জন্য খাবার কিনতে হতো।  এভাবে ওখানে একমাস কাটানোর  পর গেলাম চুনী  জামাইবাবুর বড় মেয়ের বাড়ী।  ওখানেও কাটলো একমাস।  ওখানে দুয়ার ঝাড়ু  দিতে হতো, বাসন মাজতে হতো।  বাড়ীতেতো  কোনো দিন এসব করিনি, কিন্তু কি আর করা। এভাবেই রইলাম।  এর মধ্যে ভাগু দাকে চিঠি দিলাম, তবে ওরা আসছিলো না।  চুনী  জামাইবাবু শুধু বলতো, ওরা  তোদের কথা ভুলে গেছে।  শেষ পর্যন্ত শ্যামলদা এলো ভাই ফোঁটার  আগের দিন।  ওদের ভাই ফোঁটা  দিলাম, আর ওই দিনই কলকাতা রওয়না হয়ে গেলাম। রাত  কাটলো স্টেশনে, ট্রেন আসলে তো যাবো? কলকাতায় উঠলাম গিয়ে বেহালায়  ভাগুদার বাসায়।  স্বপনদা একদিন এলো দেখা করতে।  পরে শুনলাম ওর কোনো খবর নেই।  ও নকশাল আন্দোলনে  যোগ দিয়েছে। ওখানে রইলাম আরো মাস দুয়েক।  তারপরতো  দেশ স্বাধীন হলো, চলে এলাম স্বাধীন দেশে।

দিদিরা কলকাতায় পৌঁছানোর পর আমাদের খবর দিয়েছিলো।  জানি না, পরে বাবা-মাকে  দিদি এসব গল্প বলেছিলো কিনা, তবে আমি শুনেছি বলে মনে পরে না।  ওরা  যে নিরাপদে পৌঁছেছে এই আনন্দেই পথের কষ্টের কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম। সব ভালো যার শেষ ভালো - কথাটা হয়তো এ কারণেই বলে।

দিদিরা চলে যাবার পর আমাদের শুরু হয় নতুন জীবন।  আবার নতুন করে ঢেলে সাজাতে হয় জীবনের  প্রতিটি মুহূর্ত।


দুবনা, ১৬ নভেম্বর ২০১৬





No comments:

Post a Comment