Wednesday, November 16, 2016

২০. লাশ

দিদিরা চলে যাবার পর বাড়ী  একেবারে খালি হয়ে গেলো। এখন রইলাম আমরা কজন।  জ্যাঠামশায় আর মেঝমা, কাকা-খুড়ীমা, বাবা-মা, সুধীরদা-বৌদি, তপনদা, রতন আর আমি।  বড়রা ব্যস্ত থাকতো নিজেদের কাজে আর  দিদিরা ঠিক মতো পৌছুলো কিনা সেই ভাবনায়।  ভাবনার তো শেষ নেই? এতো দিন ছিল এতগুলো লোকজনকে কিভাবে নিরাপদে রাখা যায় সেই চিন্তা, তাদের কিভাবে খাওয়ানো পড়ানো যায় সেই চিন্তা, এখন সেই লোকগুলো নিরাপদ জায়গায় পৌছুলো কিনা সেই চিন্তা।  এটাই জীবন।  এক সিঁড়ি পেরিয়ে পরবর্তীতে ওঠা, এক পা এগিয়ে পরের পাটা  কোথায় ফেলবো সেই জায়গা খোঁজা। এ এক অন্তহীন পথ, মাঝে মেঝে পরিচিত, তবে বেশীর  ভাগ সময়ই অপরিচিত পথে পা ফেলা, অজানার দিকে যাওয়া।  অন্তহীন পথে অবিরাম সংগ্রাম - এর নামই  জীবন।

সুধীরদা আগের মতোই স্কুলে যেত, আর যতক্ষণ না ফিরত সবাই টেনশনে থাকতো।  তপনদা বেশির ভাগ সময় কাটাতো পাশের পাড়ায়  শশীবাবুদের ওখানে।  তার ছেলে ভম্বল  ছিল ওর সমবয়সী।  তপনদা তখন সবে স্কুল শেষ করেছে, বয়স  ১৬ বা ১৭।  বাইরে যাবার জায়গা তেমন নেই আবার আমার মতো মার্ আঁচল  ধরে বসে থাকার বয়সটাও পার করে এসেছে অনেক দিন।

আমি আগের মতোই খেলি, এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করি।  বাড়ীটা  খুব ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়। আর বাবা-মাকে  প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, দিদিদের খবর এলো কিনা? এদিকে জলও  কমতে শুরু করেছে। মদন মিস্ত্রী  আর নতুন করে ডুঙ্গা বানায়  না। তাই আমারও  হাতে সময় যেন আটকে গেছে, কিছুতেই যেতে চাইছে না।  দিদির হাতের তৈরী পুতুলগুলো নিয়ে খেলি, কখনো একা  একা, কখনো বৌদির সাথে। আমি ছোটবেলায় সব কিছু মনে রাখতে পারতাম,  কিন্তু এখন এই পুতুল খেলে বা মার্বেল খেলে প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে যাই।  বসে  থাকি খেলনা নিয়ে, একা একাই কথা বলি।  ওই খেলনাগুলো যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে আমার কথায়। ওই অন্যমনস্কতা, ওই নিজে নিজে কথা বলা - এসব আমার একাত্তর থেকেই পাওয়া।

এখন, সেদিন  থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আমি হরহামেশা হারিয়ে  যাই নিজের মাঝে।  বৌ যখন কিছু একটা করতে বলে, আমি শুনলাম কিনা জানার জন্য কথাগুলো আমাকে রিপিট করতে বলে।  এমনও  হয় আমি রিপিট করি ঠিকই, কিন্তু একটু পরেই ভুলে যাই, সব ভুলে আওড়ে যাই

দাদখানি ডাল
মসুরের তাল
চিনি পাতা কই
ডিম্ ভরা বই
পথে পথে বলি
মনে মনে চলি
যদি হয় চুল
তবে মা নিশ্চয়ই ছিড়ে  দেবে ভুল।

অথবা রান্না করতে গিয়ে কিছু পুড়ে গেলে ঠিকই হাড়িপাতিলদের বকতে পারি।  যেমনটা পারি কম্পিউটার ঠিক মতো কাজ না করলে।  রাস্তায় সামনে মানুষজন না থাকলে দিব্যি চোখ বন্ধ করে হাটতে শুরু করি, বা উড়তে পারি, মানে ডানার মতো হাত নাড়িয়ে চলতে পারি।  আমার মনে হয়, যদি কেউ আমার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে আর আমার কথা বার্তা শুনে, ভাববে এখানে নিশ্চয়ই বেশ কয়েকজন লোক বাস করে।  একা  থাকার এ এক বিশাল সুবিধা।  অবশ্য ফিজিক্সে বা ম্যাথেমেটিক্সে যারা রিসার্চ করে, তারা মনে হয় এমনটাই হয়। অন্ততঃ  আমাদের কলিগদের দিকে তাকালে এটাই মনে হয়।

এভাবেই একা  একা  কাটতো সময়। বাড়ী  ভরা  মানুষ থাকতে যেসব করতে ভালো লাগতো, এখন আর তা লাগতো না।  এটা মনে হয় আজকাল ফেসবুকে লাইক পাবার মতো। যখন অনেক লোক ছিল, আমি ছোট বিধায় সবাই বাহবা দিতো, উৎসাহ দিতো, এখন লোকজন কমে যাওয়ায় লাইকগুলো কমে গেছিলো হয়তো। এরকম এক দিন হঠাৎ হৈচৈ শুরু হলো ঘাটে। দৌড়ে গিয়ে দেখি লাশ ভেসে যাচ্ছে খাল দিয়ে।  ফুলে ফেঁপে  হাতির মতো হয়ে গেছে, আর ওটার চারি দিকে জমেছে মাছের ঝাঁক।  বীভৎস এক দৃশ্য। জীবনে এই প্রথম লাশ দেখলাম, জলজ্যান্ত একটা মানুষের লাশ।  এতো দিন যুদ্ধের মৃত্যুগুলো ছিল শুধু কথা, শুধু শব্দ, আজ তার চাক্ষুস রূপ দেখলাম, নির্মম, নিদারুন রূপ।

ঠিক মনে নেই, ওই দিন বা তার কয়েকদিন পরে, শুনলাম পাশের জেলেরা যে ইলিশ মাছ ধরেছে তার পেটে আস্ত একটা হাত পাওয়া গেছে। নিজে দেখিনি, তবে বিশ্বাস করেছিলাম।  তখন নিজে ছোট ছিলাম, হাতও ছোট ছিল, তাই ইলিশের পেটে  হাত থাকতে পারে, এটা বিশ্বাস না করার কারণ ছিল না। গত সামারে মুকুল ভাই দুবনা  এলে এই গল্প শুনে  ও বললো, "আচ্ছা, তোমার কি মাথা খারাপ যে ইলিশের পেটে মানুষের হাত থাকবে?" হয়তো বা তাই। তবে ঐযে আমি ইলিশ মাছ খাওয়া ছাড়লাম, ওটা বজায় ছিল ২০১১ পর্যন্ত।  হিসেবে করে দেখলাম, এই ৪০ বছরে ওদের অনেক জেনারেশন চেঞ্জ হয়েছে, তাই এখন খাওয়া যায়।

আজ একটা জিনিস আমাকে খুব অবাক করে যে একাত্তরে আমি কখনো ভুতের ভয় পেতাম না।  বৈলতলার শেওড়া গাছ, মাদার গাছ বা দেবদারু গাছ দেখে মনেই হয় নি ওখানে ভুত থাকে।  অথচ নিজের গ্রামে আনাচে কানাচে ভুত থাকতো।  ঐতো, স্কুলে যাবার পথে পড়তো তাজুর বাগ।  বাঁশঝাড় আর গাব  গাছে ভরা।  ওখানে  ছিল     লাখো  ভুতের বাসা।  গলাকাটা ভুত ডুগডুগি বাজাতো, আর কেউ একা  গেলে তার সামনে ফেলে দিলো বাঁশ।  বাঁশটা হয় পাশ কাটিয়ে যেতে হতো, নয়তো ওটাতে পারা দিয়ে সামনে যেতে হতো। ডিঙিয়ে যেতে গেলে বাঁশটা  উপরে উঠে যেত, আর মানুষটা গিয়ে পড়তো ভুতের আস্তানায়।  তাই কোনো দিন একা  যেতে হলে বাগের  এক প্রান্ত থেকে চোখ বন্ধ করে সেকি দৌড়।  তবে স্কুলে যাওয়া যেত অন্য রাস্তা দিয়ে, মানে বড় খাল দিয়ে।  সেক্ষত্রে আমরা তাজু মাতব্বরের বাড়ীর  পশ্চিম দিক দিয়ে যেতাম।  আর সেখানে ছিল বিশাল এক তেতুল গাছ।  ওই গাছের ডালে ডালে নাকি ভুতের বাসা ছিল, সুযোগ পেলেই টুপ্ করে ধরে নিয়ে যেত মানুষজন।  

ওই লাশটা দেখার পর প্রথম দু একদিন একটু ইতস্তত করলেও পরে আবার জলে নেমেছি, সাঁতার কেটেছি, মাছ ধরেছি।  কখনোই ওই লাশটা ভুত হয়ে এসে ধরতে পারে বলে মনে হয় নি। মুক্তি যোদ্ধারা তো ভুত হয়না, শহীদ হয়।


দুবনা, ১৬ নভেম্বর ২০১৬  



No comments:

Post a Comment