Sunday, October 30, 2016

১০. স্বপ্নে দেখা বাড়ী

বৈলতলা আমরা উঠলাম মাখন কাকার বাড়ী।  মাখন চক্রবর্তী।  শশীজ্যাঠামশায়ের মত মাখন কাকাও আমাদের পূর্বপরিচিত ছিলেন না।  আমাদের পাইকার কালু ব্যাপারী আর হারান ব্যাপারী আমাদের নিয়ে আসে মাখন কাকার ওখানে।

মাখন কাকার বাড়ী  ছিল বেশ বড়, অনেকটা  আমাদের বাড়ীর  মতোই।  বাড়ীর  সামনে বেশ বড় একটা খাল, যদিও আমরা যখন এসে পৌঁছি ওটা শুকনা ছিল।  তবে কয়েক জায়গা  ছিল বেশ গভীর আর জলে ভর্তি।  ওগুলোকে বলতো কুম।  মাখন কাকা বলতো, ওই জায়গাগুলো অনেক গভীর, আর সেখানে বাস করে  চুল প্যাচানি। ওটা মনে হয় অক্টপাসের স্থানীয় নাম।  তবে আমার মনে হতো, চুল প্যাচানি নিশ্চয়ইঅনেকটা চাঁদের বুড়ির মতো,  যে নাকি চাঁদে  বসে চরকায়  সুতা কাটে আর চাঁদের আলো  ছড়িয়ে  দেয়  পৃথিবী জুড়ে।  চুল প্যাচানিও ঠিক তাই, শুধু তার লম্বা চুল দিয়ে পা জড়িয়ে ধরে মানুষের আর টানতে টানতে নিয়ে যায় গহীন জলের নীচে  তার আস্তানায়।  তাই আমি খুব ভয় পেতাম কুমের  জলে নামতে।

মাখন কাকা থাকতো বাড়ীর  ডান  দিকটায় একটা ঘরে।  তার ছিল তিন ছেলে আর দুই মেয়ে।  ছানা ছিল বড়, আমার থেকে বছর দুঁ তিনের  বড়  তো হবেই, আর হারু আমার সমবয়েসী। ছোট ছেলে ছিল প্রতিবন্ধী, নামটা মনে পড়ছে না।  বড় মেয়েটা আমার বড় আর ছোট মেয়ে  হারুর ছোট।  কাকীমার ছিলো খুব সরু গলা,  অনেক বিকেলেই মা আর কাকীমা গান গাইতো এক সাথে, ঠিক যুদ্ধের আগের দিনগুলোর মত।

বাড়ীর  বা দিকটায় থাকতো মাখন কাকার মা।  ওই দিকটাতেই একটা ছাপড়া  ঘরে থাকতো সুধীরদা আর বৌদি। আর আমরা সবাই মিলে  থাকতাম আরেকটা ঘরে।  ওই ঘরের  সামনে ছিল ছোট্ট একটা বারান্দা, যেখানে কাটতো আমার দিন।  আর এই দুই বাড়ীর  মধ্যে ছিল অনেকগুলো ঘর,  এরাও আমাদের মতোই শরণার্থী, কেউ এসেছে যুদ্ধবিদ্ধস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে, কেউ ধলেশ্বরী ভাঙ্গনে।  এ সবই ছিল মাখন কাকার জায়গা, মানুষের বিপদ দেখে উনি একটার পর একটা পরিবারকে স্থান দিয়ে গেছেন। অনেক দিন আগে, বছর দুএক তো  হবেই,  একবার স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি যেন কোনো এক বাড়ীর  দুয়ারে খেলছি, দৌড়ে বেড়াচ্ছি এ দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে, আর সুপুরি গাছগুলো আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি  হাসছে।  গত দুই বছরে মনেই করতে পারিনি, কোথায় দেখছি এই বাড়িটি।  গত কাল, যখন আজকের লেখাটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আর মনে মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম মাখন কাকার বাড়ির আনাচে কানাচে, হঠাৎ মনে পরে গেলো স্বপ্নের কথা, খুঁজে পেলাম স্বপ্নে দেখা বাড়ীর  ঠিকানা।

মাখন কাকার বাড়ীর  পেছন দিকে ছিল বইরাগীর চক, যে পথ ধরে একদিন আমরা এসেছিলাম বাঙ্গালা থেকে।  প্রায়ই আমরা ঘুরে বেড়াতাম সেই চকে আর ভাবতাম, যদি একটা গরু থাকতো, ঠিক চষে বেড়ানো যেত। আমাদের ঘরের পেছনে ছিল বিশাল এক দেবদারু গাছগাছ আর পাশেই আরেকটা খালের মতো জায়গা।  ওখানে ছিল অনেকগুলো হিজল গাছ। একাত্তরের ওই দিনগুলোতে ছানা  হারুদের সাথে ওই গাছগুলির নিচে খেলতাম  ডাঙ্গুলি, মার্বেল আর চারা।  ওই হিজল গাছগুলো আমার এতো প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে ১৯৮১ সালে যখন আমরা আমাদের গ্রামে প্রথম খেলাঘর আসর করি, ওটার নাম রাখি "হিজল খেলাঘর আসর।"  

মস্কো, ৩০ অক্টবর ২০১৬

No comments:

Post a Comment