Tuesday, October 25, 2016
৮. রাম মামা
বাঙ্গালার দিনগুলো কাটছিলো এক এক করে। সময় পেলেই দৌড়ে যেতাম বাড়ীর সামনের মাঠে, কখনো বা পাশের বাড়ী। এ এক অবাক ব্যাপার। দেড় মাসও হয়নি যুদ্ধ শুরুর। যে সব লোকের সাথে পাশাপাশি বাস যুগ যুগ ধরে, সুযোগ পেয়ে তারাই বাড়ী ঘর সব লুট করেছে, মেরে ফেলেছে নিজেদের প্রতিবেশীদের। আর যাদের জীবনে কখনো দেখিনি, যাদের নামও শুনিনি কখনো তারাই নিজেদের ঘর ছেড়ে দিয়েছে আমাদের থাকার জন্য। শশী জ্যাঠামশায়কে চিনতাম না কোনো দিন, কিন্তু আমাদের বিপদ দেখে কুদ্দুস ভাই আর স্থানীয় চেয়ারম্যান গনি মিঞা আমাদের ডেকে এনেছেন নিজেদের গ্রামে, ওখানে যে পাঁচ-ছয় ঘর হিন্দু ছিল, তাদের সাথে কথা বলে শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ীতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেন ওখানে ঘর-দোর একটু ভালো ছিল বলে। আমাদের কখনোই মনে হয়নি আমরা পরের বাড়ী আছি। মনে হয়েছে যেন নিজেদের বাড়ীতেই আছি। প্রতাপদা, কালীদিও সর্বোত ভাবে চেষ্টা করেছে আমাদের উপস্থিতিটা আনন্দের না হোক, কষ্টের যেন না হয়।
এ ছাড়াও ছিল কামাক্ষা আর মানিকগঞ্জ থেকে আসা বেবুরা।ওরা ছিল চার ভাই, সন্তোষদা সবার বড়। এর পর নীলকমলদা, ধ্রুবদা আর বেবু। সন্তোষদা খুব আদর করতো আমাকে। যুদ্ধের পরে আমরা একসাথে গেছিলাম ইন্ডিয়া, খুব সম্ভব গোয়ালন্দ গিয়ে দেখা হয়। আমরা ওখান থেকে চলে গেলাম কলকাতা, সন্তোষদা তার বোনের বাড়ী। পরে শুনেছিলাম ওনাকে ওখানে মেরে ফেলা হয়েছিল। খুব কষ্ট লেগেছিলো খবর শুনে। যুদ্ধের ওই দিনগুলোতে যাদের সাথে সময় কেটেছে, তারা সবাই যেন আপন হয়ে গেছিলো।
রাম মামা যেন নিজের মামা ছিলেন। খুব আদর করতেন। যেহেতু সারাদিন করার কিছু ছিল না, সুযোগ পেলেই দৌড়ে যেতাম তাদের বাড়ী। যতদূর মনে পরে তাদের কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না তখন। বেশ ফর্সা আর লম্বা ছিলেন উনি। তবে উচ্চতাটা আপেক্ষিক, হতে পারে আমি তখন খুব ছোট ছিলাম বলে ওনাকে এতো বড় মনে হতো। মনে আছে, সেই ১৯৬৯ আর ১৯৭২ সালে আমার নিজের মামা, অশোক মামাকে দেখে মনে হতো এক পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে সামনে। যেমন উচা লম্বা, তেমনি ফর্সা। কিন্তু গত ২০১৪ তে যখন কলকাতায় গিয়ে তার সাথে দেখা হলো প্রায় ৪২ বছর পরে, দেখলাম উনি সেই অশোক মামা নন, যার মুখের দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকাতে হতো, উনি আমারই মতো একজন, যার সাথে সমানে সমানে কথা বলা যায়, চোখে চোখ রাখা যায়। কখন যে নিজেই বড় হয়ে গেছি, টেরই পাইনি। তাই এখন যদি রাম মামার সাথে দেখা হতো, দেখা যেত, উনি আমারই মতো একজন।
রাম মামার একটা সাইকেল ছিল আর সাইকেলে ছিল একটা ব্যাগ - নীল রঙের। মাঝে মধ্যে উনি সাইকেলে চড়ে বাইরে যেতেন, আমাদের জন্য নিয়ে আসতেন দুনিয়ার খবর। রাম মামা আমাকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই যেতেন স্থানীয় বাজারে। তরা বাজারের মতো এতো বড় নয়, তবে ওখানে যেতে ভালো লাগতো, যুদ্ধের সময়ও একটু স্বাভাবিক জীবনের আস্বাদ পাওয়া যেত।
যুদ্ধ কথাটা শুনলেই আমরা আঁতকে উঠি, অথচ যুদ্ধ জীবনেরই একটা অঙ্গ। জীবনযুদ্ধ কথাটিতো এমনি এমনিতেই আসেনি। মানব জাতি যত দিন আছে এই পৃথিবীতে, ততদিনই আছে এই যুদ্ধ, এই সংগ্রাম। আগে যুদ্ধ ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে, এখন শুধু প্রকৃতির বিরুদ্ধেই নয়, মানুষের বিরুদ্ধেও। অথবা মানুষরূপী দুপেয়ে জানোয়ারদের বিরুদ্ধে, যারা মনে করে ইচ্ছে করলেই তারা অন্যদের জীবন নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারবে। এখনো যখন টিভিতে কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে শুনি, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে, ভাবি কিভাবে মানুষ সেখানে বাস করছে? এইতো এখন দানিয়েৎস্ক এ গৃহযুদ্ধ চলছে, আবার এরই মাঝে দেখি ওখানকারই কেউ ফটো সাইটে ছবি দিচ্ছে। প্রথমে একটু অবাক হই ভেবে, আচ্ছা, ওখানেতো যুদ্ধ, ছবি তোলার সময় কোথায়? তখন মনে পরে আমার সেই একাত্তরের দিনগুলির কথা। চারিদিকে যুদ্ধ ছিল, সেই সাথে ছিল জীবন, ছিল ক্ষুধা, ছিল তৃষ্ণা, ছিল মান-অভিমান, ভালোলাগা-ভালোবাসা। আসলে যুদ্ধ এলে জীবন থেকে কিছুই হারিয়ে যায় না, থাকে সবই আর থাকে ভয়। শুধু মাত্র ছোট ছোট ভালোলাগা-ভালোবাসাগুলো পেতে হলে আরো অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়, আরো অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। শান্তি কোনো শান্ত মানুষের ভাগ্য নয়, শান্তির জন্য লড়াই করতে হয়। তাই যখনই বাজারে যেতাম, পেতাম জীবনের আস্বাদ। দেখতাম দেশে শুধু যুদ্ধই চলছে না, দেশের মানুষ শান্তির জন্য লড়ছে।
একবার রাম মামা আমাদের নিয়ে গেলো পাকিস্তানের হাটে, তখন অবশ্য লোকজন একে বাংলাদেশের হাট বলেই ডাকতো। ওটা ছিল বাঙ্গালা থেকে পুব দিকে, যত দূর মনে পরে, আরো কিছুটা এগিয়ে গেলে গড়পাড়া, মানিকগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া যায়। তবে ওই জায়গাটা আমাদের কাছে পরিচিত ছিল ঘাড়া স্যারের কারণে। ঘাড়া স্যার - মানে আমাদের প্রাইমারী স্কুলের সরফরাজ স্যার, উনি পড়া না পারলে বেত গিয়ে মারতেন না, স্কেলের ধারালো দিক দিয়ে মারতেন। ও থেকেই ছাত্রদের কাছে উনি ঘাড়া স্যার নামে পরিচিত। অনেকদিন পরে কোনো পরিচিত লোকের সাথে দেখা হবার সম্ভাবনায় বেশ উত্তেজিত বোধ করছিলাম, যদিও জানতাম না এমন দেখা ভালো হতো না মন্দ। রাম মামা অবশ্য বলেই দিয়েছিলেন কোনো মতেই যেন না বলি আমরা কোথায় থাকি। যদিও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম এই হাট ভ্রমণে, তার পরেও খুবই ভালো লেগেছিলো অনেক দিন পরে এলাকা থেকে বেরুতে পেরে, অনেকটা স্বাধীন স্বাধীন মনে হচ্ছিলো নিজেকে। এর পরে আমরা বাঙ্গালা আর বেশিদিন ছিলাম না। তবে রাম মামার সাথে যোগাযোগ ছিল স্বাধীনতার পরেও। রাম মামা মানিকগঞ্জ চাকরী করতেন, সময় পেলেই আসতেন আমাদের বাড়ীতে। মনে হতো খুব আপন কেউ বেড়াতে এসেছেন। মা খুব আদর করে খাওয়াতো তার ভাইকে। তবে স্বাধীনতার কয়েক বছর পরেই মানিকগঞ্জ যাবার পথে এক ট্রাক একসিডেন্টে মারা যান আমাদের রাম মামা।
দুবনা, ২৬ অক্টবর, ২০১৬
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment