Saturday, October 15, 2016

৬. মাইল্যাগী থেকে বাঙ্গালা

আগেই বলেছি মাইল্যাগী  আমরা ছিলাম এপ্রিলের ৮ তারিখ থেকে মাসের শেষ  বা মে'র প্রথম পর্যন্ত।  বাঙালী  হিন্দু পরিবার খ্যাত তার বারো মাসে তের পর্বনের জন্য।  এই সব পার্বনের কিছু কিছু একান্ত পারিবারিক, যেখানে পুরোহিতের দরকার হয় না। যেমন নাটাই পূজা, বসুমতী  পূজা, সুবচনী পূজা। আবার কিছু কিছু একান্তই সামাজিক, যখন ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পুরোহিত এনে তা করতে হয় - যেমন দূর্গা পূজা, কালী পূজা, স্বরস্বতী পূজা।  নানা বর্ণে বিভক্ত হিন্দু সমাজে কিছু পূজা যেমন অপেক্ষাকৃত উচ্চ বর্ণে ও আর্থিক ভাবে সচ্ছল পরিবারে সীমাবদ্ধ, ঠিক তেমনি কিছু অনুষ্ঠান নিম্ম বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে দেখা যায়। অন্তত আমাদের এলাকায় সেটাই দেখে এসেছি সেই ছোটবেলা থেকেই।  ইদানিং কালে অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে উপরের দিকে অনেক পূজা-পার্বন জেলে বা অন্যান্য নিম্ন বর্ণ হিন্দু সমাজে ঢুকে গেলেও চৈত্র পূজা এখনো উপরের দিকে উঠে আসেনি।

চৈত্র পূজা হতো চৈত্র মাসে - বেশ কয়েক দিন ধরে শিবের কাঠাম (কাঠের তৈরী মূর্তি) নিয়ে  ঘুরতো ভক্তরা বাড়ী  বাড়ী , গ্রামে গ্রামে।  সংগ্রহ করতো চাল, ডাল, শাক-সবজি, টাকা পয়সা আর রাতের বেলা হতো নাচ - ভুত-পেত্নীর নাচ।  এই পূজা চলতো বেশ কয়েক দিন আর শেষ হতো চৈত্র সংক্রান্তির দিন।  এর সাথে বান  দেয়া (এর ফলে যারা নাচতে নামতো ভুত বা পেত্নীর বেশে  তাদের মৃত্যুও হতো বলে কথিত আছে) সহ  আর কত যে ভৌতিক গল্প জড়িত ছিল, তার ইয়ত্তা নেই।  এটা অনেকটা শিয়াদের  মহরমের মতো - যখন ঢাল-তলোয়ার নিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটতো  মানুষ। তবে মহরম হতো দিনে, আর চৈত্র পূজা দিন-র্যাপ ব্যাপী।  পরিচিত এই মানুষগুলো রাতের বেলায় যখন খড়গ হাতে নাচতে নামতো, দেখে মনে হতো, ওদের যেন হুশ নেই।  আমরাও, পাড়ার ছেলেরা, বাঁশের  তলোয়ার তৈরী করে নাচতাম আর সেটা পূজার আগে আর পরে অনেক দিন পর্যন্ত ব্যাপৃত থাকতো।  এই প্রথম আমাদের জীবনে চৈত্র পূজা এলো না।  আর এই প্রথম সেই খেলার সাথীগুলোর  দেখাও মিললো না।

তবে চৈত্র পূজার দিনগুলোতে  আমাদের বাড়িতে সবাই ব্যস্ত থাকতো আসন্ন হালখাতার অনুষ্ঠানকে ঘিরে।  ওই সময় আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষ এতো জাকজমক করে পালন করা হতো না।  ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের কথা জানি  না,  তবে আমাদের গ্রামে এটা  সীমিত ছিল মূলতঃ  হ্নিদু পরিবারগুলোর মধ্যে।  দূর্গা পূজার পরে  বিজয়া দশমীর মতোই (আসলে ওটা ঘটতো  পরের দিন, প্রতিমা বিসর্জনের পরের সকালে)  নববর্ষের  দিন আমরা সারা গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম, প্রণাম করতাম বড়দের  (শুধু বয়সেই নয়, সম্পর্কে, গোত্রে), কোলাকুলি করতাম সমবয়সীদের সাথে (যেমনটা ঘটে ঈদের সময়) . বাতাসা  বা অন্যান্য মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতো অতিথিদের।  আর আমাদের বাড়ী  হতো হালখাতা।  সকালে উঠে গুদাম ঘরে  গণেশের মূর্তি আর হাঁড়ির উপর নারকেলের সামনে  যে তামার বিশাল থালা পাতা থাকতো, তাতে শব্দ না করে ফেলতাম পাকিস্তানী সেই এক টাকার মুদ্রা।  তারপর সারাদিন দিন  চলতো খরিদ্দারদের আসা যাওয়া।  সবাই পুরানো বছরের বকেয়া শোধ করতো, নতুন বছরে নতুন করে খোলা হতো খাতা।  এই উৎসবের মূল খাবার ছিল দই, মুড়কি (গুড়ের সিরাপে ভেজানো খৈ) আর নানান রকম মিষ্টি।  আমার ঠিক মনে পড়ছে না, এই দিন  ভাতের ব্যবস্থা ছিল কি না? মহানামব্রত বহ্মচারীর পাঠের পর যে মহোৎসব হতো তার মূল খাবার ছিল লাবড়া আর খিচুড়ি, বিভিন্ন রকমের ডাল  আর সবজি, আবার  কোনো কোনো উৎসবে খাওয়ানো হতো বিভিন্ন রকমের মাছ (মাংসের আগমন তখন হয়নি বাড়িতে, আমরা নিজেরাই খেতাম লুকিয়ে), ঠিক তেমনি হালখাতার ছিল নিজস্ব মেন্যু। আমাদের বিশাল বাড়ীর  দুয়ারে অনেকগুলো লাইন ধরে মানুষ বসে পড়তো খেতে, খেলো কলার পাতায়।  খেয়াল করতাম, হিন্দুরা খেত পাতার উপরের সবুজ দিকে, মুসলমানরা নিচ দিকে, মানে উল্টো দিকে। ওরা  বলতো, ওই দিকতা পাখিরা নোংরা করতে পারে না। এখনকার মতো চেয়ার, টেবিল, প্লেট-গ্লাস ভাড়া করার সুযোগ তখন ছিল না।  আসলে তখন খুব কম লোকই এসব অনুষ্ঠান করতে পারতো, তাই এসব ব্যবসা তখন লাভজনক ছিল না।  এই প্রথম বারের মতো হালখাতা আমাদের পাশ কাটিয়ে গেলো।  বাড়ি থেকে দূরে দৈনন্দিন জীবনে ছোটোখাটো পরিবর্তন হলেও দিন  চলছিল নিজস্ব গতিতে, তবে যেসব  অনুষ্ঠানগুলো জীবনের অংশ হয়ে গেছিলো, তা না হলে মনটা বিষন্ন হতো, তখন সবাই বিশেষ করে, বেশী  করে বুঝতে পারতাম সেই অস্বাভাবিক সময়ের উপস্থিতি।

মাইল্যাগীতে  আমার সমবয়সী কেউ ছিল কি? কেন যেন মনে হয় ছিল, যদিও কোনো চেহারা বা নাম  কখনোই আমার মনে উঁকি দেয়  নি।  আমি নিজে অবশ্য খুবই অন্তর্মুখী। সব সময় নিজের জগতে ব্যস্ত।  মনে আছে, অনেক পরে যখন মস্কোয় প্রায়ই আড্ডা দিতাম, ঠিক কখন যে আমি কোন একটা বই বা কিছু একটা নিয়ে হারিয়ে যেতাম নিজের মধ্যেই। এখনো হয় হামেশাই সেটা হয়।  কাজ আশপাশ দিয়ে পরিচিত লোক চলে যাচ্ছে, আমি খেয়ালই  করিনি।  আমার মনে হয় ওই যুদ্ধের সময় আমি মার্বেল নিয়ে কোথাও বসে বসে খেলতাম, আর স্বপ্নের ঘোরে কাটিয়ে দিতাম দিনের পর দিন।

তারপর একদিন ডাক এলো চলে যাবার। কুদ্দুস ভাই এলো আমাদের নিতে।  গন্তব্য বাঙ্গালা।  এটা  তেরশ্রীর  অদূরে ছোট এক গ্রাম, পয়লা আর সিংজুরী ইউনিয়নের প্রান্তে।  আমার এখনো মনে আছে ফসলে জমির মধ্য দিয়ে হেটে যাবার কথা।  কখন বা মা বা কারো কোলে, আবার কখনো কুদ্দুস ভাইয়ের সাইকেলে।  ঢাকায় পাক হানাদারদের আক্রমণের   পরের দিন যেমন মানুষ দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটছিল, এবার তেমনটি ছিল না।  আগে থেকে হিসেবে কষে ধীরে সুস্থে গন্তব্যের দিকে যাওয়া, যদিও চেষ্টা ছিল যতটা সম্ভব অন্যদের অগোচরে এলাকা ত্যাগ করা।  মাইল্যাগী  ছাড়ার মধ্য দিয়ে বাড়ির সবাই স্বীকার করে নিলো এই যুদ্ধটা যে  দীর্ঘস্থায়ী হবে, বাড়ী  ফেরা যে খুব সহজে হবে না সেই কঠিন আর মর্মান্তিক বাস্তবতা।

বাঙ্গালা  আমরা উঠলাম শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ীতে।  সেন বাড়ী  নামেও পরিচিত।  তার ছেলে ছিল প্রতাপ দা, আর মেয়ে কালী দি। কালী দি ছিল খুবই ফর্সা, তাই কেন যে তার নাম কালী রাখা হয়েছিল, সেটা গবেষণার ব্যাপার বটে।  পাশের বাড়ী  ছিল তারকেশ্বর বাবুর। তার ছেলে ছিল কামাক্ষা - খুব লাগতো আমার পেছনে। একবার পেট  খারাপ হলে আমাকে দেখলেই হেরে গলায় গাইতো

আমার হয়েছে  আমাশা
হাগতে গেলে সাউ পরে অষ্ট  নয় মালসা

তার পরেও ওর সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।  এছাড়া ছিল কুদ্দুস ভাইয়ের ছেলে খালেক আর রাম মামা।  তবে সে সব কথা পরে।

মস্কো, ১৫ অক্টবর ২০১৬



No comments:

Post a Comment