শশী জ্যাঠামশায়দের বাড়ীটা তেমন বড় না হলেও খুব যে ছোট তা নয়। তবে ঘরের সংখ্যা কম। আমাদের বাড়িতে বড় বড় ঘর ছিল গোটা বিশেক, তাই দু-তিনটে ঘর আমার কাছে খুব কম বলেই মনে হতো। বাড়ীটা ছিল একেবারে চকের সাথে ঘেঁষা, সামনের দিকটায় পালান, যেখানে বেগুন, মরিচ এসব লাগানো। পেছন দিকে ঘরগুলো, যার একটায় ঢালা বিছানায় ঘুমাতাম আমরা সবাই। বাড়ীর সামনে দিয়েই চলে গেছে গেঁয়ো পথ, মাঠের ভিতর দিয়ে একে বেঁকে। রাস্তাটা ঠিক আমাদের গ্রামের রাস্তার মতো নয়, যেখানে মাটি তুলে একটু উঁচু করে সেটা তৈরী। এটা ছিল জমিজমার মধ্য দিয়ে মানুষ আর গরু-ঘোড়ার চলাচলে তৈরী হওয়া প্রাকৃতিক রাস্তা। ওর একটা শাখা চলে গেছে পাশের গ্রামে সিংজুরী যার নাম, অন্যটা সামনের দিকে সোজা গিয়ে উঠেছে গ্রামের ছোট্ট বাজারে।
বাড়ীর সামনেই রাস্তার ঠিক ওপারে ছিল একটা ডোবা যাকে আমরা বলতাম মাইট্যাল। পুকুর যদি কাটা হয় পরিকল্পনা করে মাছ ছাড়ার জন্য বা জলাশয় হিসেবে, সেখানে মাইট্যাল খোঁড়া হয় আসলে অন্য কোনো কাজে মাটির জন্য, আর এর ফলে যে গর্ত তৈরী হয় সেটাই ধরে রাখে বর্ষার বা বৃষ্টির জল। অনেক ক্ষেত্রে এসব হয় মশা উৎপাদনের কারখানা। আমরা যখন বাঙ্গালা ছিলাম, এটা ছিল জ্যৈষ্ঠ মাস, তখন ওখানে জল ছিল। আমার এখনো মনে আছে ওখানে ডুব দিয়ে স্নান করার কথা। আর ওই ডোবাটার চারদিকে ছিল হাগড়া বন। হাগড়া এক ধরণের আগাছা যাতে ছোট ছোট কাঁটাওয়ালা ফল হয়। সেই ফলগুলো আমরা একে অন্যের মাথায় ছুড়ে মারতাম, আর ওগুলো আটকে পরতো চুলে।
শশীজ্যাঠামশাইদের বাড়ী ছিল আলাদা, অন্যদের বাড়ি যেতে হতো ছোট এক টুকরো নিচু জমি পেরিয়ে। ওদিকে থাকতো বেশ কয়েক ঘর লোক। রাম মামা ছিলেন তাদের একজন। খুব সহজেই মার সাথে তাদের ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো, তাই সময় পেলেই আমি দৌড়ে চলে যেতাম ওদের বাড়ী। বাঙ্গালায় থাকাকালীন ফিরে এলো দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই। আবার মা বিকেলে বই পড়ে শোনাতো বা প্রার্থনার গান করতো। বাড়ীতে থাকতেও অনেক কিছুই হতো মাকে ঘিরে। ওই সময় গ্রামের মহিলারা লেখাপড়া খুব একটা জানতো না। মা লেখা পড়া জানতো, তাই প্রতি বিকেলেই শাস্ত্র (আমরা বলতাম শাস্তর) পড়া ছিল মার কাজ। বড়মা, জেঠিমা, মেঝমা, খুড়ীমা সহ পাড়ার মহিলারা বিকেলে বসতো বড়দাদের বারান্দায়। গরমের দিনে পাখা হাতে আর শীতের সময় মালসায় (এক ধরণের মাটির পাতিল) করে কয়লার আগুন নিয়ে। কেউ বাড়তো চুল, কেউবা বাছতো উঁকুন। সাধারণতঃ পড়তো রামায়ণ বা মহাভারত আর গাইতো
ভব সাগর তারও কারণ হে, রবি নন্দন বন্দন .........
তা ছাড়াও অনেক মহিলারা নিয়ে আসতো চিঠি আর মা সেসব পড়ে শুনাতো। অনেকে চিঠি লিখে দেবার জন্য আসতো মার কাছে। মা শুধু নিজেই পড়াশুনা করেন নি, আমাদের বাড়িতে মেয়েদের পড়াশুনার আর গান বাজনার রেয়াজ চালু করে। মার কারণেই আমরা গান শিখতে শুরু করি। গান শিখতো দিদি, রতন। আমিও গাইতাম, তবে
ওগো নদী আপন বেগে পাগল পাড়া .....
এর বাইরে খুব একটা যাওয়া হয়নি। রঞ্জিতদা, কল্যাণদা তবলা বাজাতো, পরে আমিও তবলা বাজাতে শিখতাম। এখন শুধু মাত্র রতন গান করে, গান শেখায়। আমাদের বাড়ীতে দিদি বাদেও ছিল তিন কাকাতো বোন। দুজনের বিয়ে হয়েছিল আমার জন্মের আগেই, বয়েস খুব বেশী হবার আগেই। মা দিদিকে পড়িয়েছে, তবে বিয়ে আর দেয়া হয় নি। দিদি মাস্টার্স শেষ করে এখন স্কুলে পড়ায়। সুধীরদা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে বিয়ে করে বৌদি মাত্র মেট্রিক পাশ করেছে। আসলে মামা বাড়ী বেড়াতে যাবার সময় বৌদিকে পড়াতে গিয়েই প্রেম, পরে বিয়ে। এখনো মনে আছে ১৯৬৯ এ কলকাতা যাবার আগে মির্জাপুর মামা বাড়ী গিয়ে সুধীরদার জন্য পুতুল নামের এক মেয়ে দেখা হয়েছিল। ওর নিজেরই পছন্দ। আর পি সাহার ওখানে গিয়ে দেখা, হোমসের ছাত্রী। পরে যখন কলকাতা থেকে ফিরে আসি, শুনলাম সুধীরদা মত পরিবর্তন করেছে, বিয়ে করবে হোমসেরই আলতা নামে এক মেয়েকে। কাকাদের মত ছিল না, মূলতঃ ওই পরিবার নিম্নবিত্ত ছিল বলে। মা শুনে বললো, আমাদেরতো টাকার বা যৌতুকের দরকার নেই, আমার ছেলে এই মেয়েকেই বিয়ে করবে। বাড়ী থেকে বড়দের কেউ যায়নি ওই বিয়েতে। বাবা এমনিতে কোথাও যায় না, সাধারনতঃ ছোট কাকাই যায়। এবার বড় দা গেলো সবার দায়িত্ব নিয়ে। বিয়ে হলো নিজেদের খরচে, নিজেদের মতো করে। বৌদি ঘরে এলে মা বললো বৌমা পড়াশুনা করবে। কাকারা খুশী হয়নি শুনে, মার কথা, আমার বৌমা, আমি দেখবো সে কি করে। শেষ পর্যন্ত মাই জিতলো, বৌদি মাস্টার্স শেষ করে চাকরি করলো গার্লস স্কুলে। এই হলো মা। ঘুরতো প্রচুর, তীর্থ থেকে তীর্থে যেত, বই পড়া, সেলাই করা, রান্না বান্না - কি বা না করতো। আমরা এতো গুলো ভাইবোন - তার পরেও কেমনে যেন সব করে উঠতো। তাই মাইল্যাগী থাকাকালীন অনেকটা গৃহবন্দী থেকে এখানে এসে যেন প্রাণ ফিরে পেলো। আবারো বই নিয়ে বসলো বিকেলে। ঘুরতে গেলো রাম মামাদের বাসায়। শুরু হলো নতুন জীবন।
শুধু মার কেন, আমাদেরও। আবার শুরু হলো বাজারে যাওয়া, পাড়া বেড়ানো। রাম মামা ছাড়াও দৌড়ে চলে যেতাম কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে। তার ছেলে খালেক ছিল আমার সমবয়েসী। তবে সমস্যা হলো, আমি ছিলাম বাড়ী থেকে দূরে, কাজকর্ম হীন, সারা দিন ছিল শুধুই ঘুরে বেড়ানোর জন্য, আর খালেক ছিল বাড়ীতে, চাক আর নাই চাক, ওকে কাজ করতে হতো, বাড়িতে সাহায্য করতে হতো। তাই আমার মত অফুরন্ত সময় ওর ছিল না। তবে কিছু দিন পরেই চলে এলো বেবুরা। ওরা মানিকগঞ্জ থেকে এসেছে। আমার বয়সী, তবে একটু টিউব লাইট জাতীয়। এখনো তাই। যুদ্ধের পর আমাদের যখন মানিকগঞ্জে কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয়, পাশের দোকানটাই বেবুরা কেনে। মানিকগঞ্জ গেলে দেখা হতো, তবে তেমন কথা হতো না। তবে কলেজে পড়ার সময় যখন ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর, উদীচী - এসবের সাথে জড়িত হই, তখন ওর বড় ভাই দ্রুবদার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেটা আজও টিকে আছে। আর কামাক্ষা তো ছিলই। বাঙ্গালা বলতে গেলে ছিল যুদ্ধ থেকে অনেক দূরে। বাড়ী থেকে মাঝে মধ্যেই আসতো সালাম ভাই চাল-ডাল নিয়ে। সামসু চাচারা কায়দা করে জমির ফসল আর তা বিক্রি করা টাকা পাঠাতো সালাম ভাইকে দিয়ে। সালাম ভাই গ্রামের খবর নিয়ে আসতো। আশাবাদী তেমন কিছু নয়, তার পরেও সামসু চাচা, নোয়াই চাচা, সালাম ভাই এদের বন্ধুত্ব, এদের কৃতজ্ঞতা সবার মনে আশা জাগাতো। বাবা মাকে বলতে শুনতাম এরা যতদিন আছে, শত দুঃখের মাঝেও বেঁচে থাকবে আশা, বাড়ী ফিরে যাবার আশা।
দুবনা, ২০ অক্টবর ২০১৬

No comments:
Post a Comment