Tuesday, October 4, 2016

৪. ঘর ছাড়ার পালা

আসল গল্পে যাবার আগে দুটো কথা বলে নেয়া ভালো। যখন আমি লেখা শুরু করি, মনে হয়েছিল একাত্তরের স্মৃতিগুলোই শুধু বলে যাবো।  লিখতে গিয়ে বুঝলাম ব্যাপারটা এতটা সহজ নয়। বয়স খুব কম থাকায় তখন আর যাই থাকে, কোনো কিছু বিশ্লেষণ করার বুদ্ধি ছিল না। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখি, নিজের অজান্তেই আমি সেই সব ঘটনাগুলোর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করতে চাইছি। আর সেটা হচ্ছে আমার বর্তমান বিশ্ব দর্শনের ভিত্তিতে। তাই এটাকে ঠিক ডাইরি বলা চলে  না, বরং ডাইরির ভিত্তিতে সেই সময়ের ঘটনার বর্ণনা ও বিশ্লেষণ। আর এটা করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে হয়তো একাত্তরের আগে বা পরের সময়েও ফিরে যাবো আমরা।

একটা কথা আছে "ভয়ের (ভীতির)  চোখ গুলো বড় বড় (fear has big eyes)" যতক্ষণ কিছু না ঘটে, আমরা এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকি আর এটা আমাদের ভীত করে তোলে, কিন্তু ঘটনা যখন ঘটেই যায়, আমরা সেটার মোকাবেলা করতে চেষ্টা করি, ভাবতে শুরু করি কিভাবে এটাকে এড়ানো যায়। ২৭ তারিখে যখন গ্রামের মানুষ পালাতে শুরু করে, সেটা ছিল ভয়ে আক্রান্ত হয়ে যেকোনো ভাবেই হোক এই বিপদ থেকে দূরে সরে যাওয়া।  কিন্তু গত কয়েকদিনে মানুষ প্রথম ভয়টা কাটিয়ে উঠেছিল আর ঠান্ডা মাথায় ভাবছিলো তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ। এই কিছুদিন আগেও, সেই ৬৯ এর অভ্যুত্থান থেকে দুদিন আগে পর্যন্ত যে মানুষগুলো একসাথে চলেছে, একই ভাবে শেখ মুজিবের পেছনে দাঁড়িয়েছে, নতুন বাস্তবতায় দেখা গেলো সেই ঐক্য আর রইলো না।  গ্রামের হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে আগের সেই বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব হঠাৎ করেই কর্পূরের মত  উবে গেলো। প্রায় প্রতিদিনই খবর আসতে  লাগলো, ওরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আশ্চর্য হলেও সত্য এই চলে যাওয়া এখনো শেষ হয়নি।  তবে তখন মানুষ যাচ্ছিলো পাশের কোনো গ্রামে, আজ যাচ্ছে পাশের দেশে। তখনকার যাওয়া ছিল সাময়িক, আজ চিরদিনের জন্য।

এতদিন যে ব্যাপারগুলো আমাদের একটা বিশেষ অবস্থানে রেখেছিলো, আজ তাই আমাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো।  গোলা ভরা ধান. গোয়াল ভরা গরু, রমরমা ব্যবসা - এসব ছেড়ে হুট্ করে চলে যাওয়া যায় না।  তাছাড়া বাবা আর জ্যাঠামশায় কিছুতেই বাড়ি ছাড়তে রাজি হচ্ছিলো না। বাবা কখনো গ্রামের কোনো ঝামেলায় যেত না, ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো আর যখনই  কেউ সাহায্য চাইতো, সেটা করার চেষ্টা করতো।  বাবার সম্পর্কে যেটা শুনেছি, কলকাতায় বঙ্গবাসী  কলেজ শেষ করে  নীলরতন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিল, পরে এক সাধুর পাল্লায় পড়ে  নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, পরে আসামে তাকে খুঁজে পায় দাদু, ওখান থেকে ফিরে  ব্যবসায় নিজেকে জড়িত করে। গ্রামের কোনো সালিশি বা পূজা-পার্বনে যেতে দেখিনি তাকে, দিন কাটতো খদ্দের বা অন্যদের সাথে গল্প করে আর বই বা খবরের কাগজ পড়ে। জ্যাঠামশায় কবিরাজি করতো, মানে কারো কোথাও  কেটে ছিঁড়ে গেলে মন্ত্র পরে ভালো করে দিতো। আর করতো সেটা বিনে পয়সায়।  তাই ওদিক থেকে দেখতে গেলে তাদের কোনো শত্রু ছিল না। কিন্তু অবস্থার  যখন অবনতি   হতে লাগলে আমরাও কান্নাকাটি শুরু করলাম, সামসু চাচা, নোয়াই চাচা - এরাও বোঝাতে লাগলো - ঠিক হলো, আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো।  কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু আমরা নিজেরাই ২০ জনের উপরে, কোথায় যাবো সবাইকে নিয়ে।

 বড়দা বৌদি, বড়মাকে নিয়ে গেলো কলতার দিকে।  বড় দার যাত্রার  দল ছিল, অনেক জায়গায় পরিচিত লোকজন ছিল, তাই  ওদিকে যাওয়া।  কলতায়  তখন যাবার একমাত্র উপায়  ছিল  পায়ে হেটে যাওয়া - বর্ষাকালে নৌকা। এখানে বলা ভালো আমাদের যাবার খুব যে বেশি জায়গা ছিল তা নয়।  আগেই বলেছি তরা  গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে বিখ্যাত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক।  সে সময় উত্তর বঙ্গ  আর খুলনা বিভাগের সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের একমাত্র  রাস্তা।  আশ্চর্য  হলেও সত্য, যে রাস্তা দেশের এক প্রান্তের সাথে আরেক প্রান্তের যোগাযোগসূত্র, সেটাই  তরা  গ্রামকে দুইভাগে ভাগ করেছিল।  রাস্তার পুবদিকের অংশের সাথে আমাদের যোগাযোগ খুব কম ছিল, যেমন কম ছিল পাশের গ্রাম গিলন্ডের  সাথে যোগাযোগ। এটা মনে হয় গিলন্ডের ছেলেমেয়েরা নবগ্রাম স্কুলে যেত বলে। একই ভাবে উত্তর তরার সাথেও আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না।  তাই যখন বাড়ী  ছাড়ার কথা এলো, স্বাবাভিক ভাবেই ভাবতে হলো পশ্চিমে কোথাও যাবার।  এর মধ্যে ছোট কাকা খুড়ীমা, চন্দনা, চন্ডী  মামা, লক্ষ্মী মাসিকে নিয়ে চলে গেলো দৌলতপুর দাদুর ওখানে।  আমরা যারা রইলাম (আমরা পাঁচ ভাই, দিদি, বৌদি, বাবা, মা, জ্যাঠামশায়, মেঝমা, শ্যামলদা,রঞ্জিতদা) আমরা রওনা হলাম মাইল্যাগীর  পথে।

মাইল্যাগী  - এটা ঘিওরের আগে ছোট একটা গ্রাম।   কালিগঙ্গার তীরে।  আমাদের এলাকায় কালিগঙ্গা বেশ বিশাল নদী  হলেও ঘিওর এলাকায় তা ছিল খালের মত  সরু।  আমাদের একটু উজানে, কাউটিয়া এলাকায়,  যেখানে কালিগঙ্গা আর ধলেশ্বরী মিশেছে, সেখান থেকেই কালিগঙ্গা ধারণ করেছে বিধ্বংসী রূপ।  চৈত্র মাসে এসব জায়গায় তেমন জল থাকে না।  তাই বাবাকে দেখতাম বর্ষায় ঘিওর হাটে  যেত  নৌকা করে, আর এই সময় সাইকেলে।  সকাল বেলায় ঘোড়া আসতো  সুতার বস্তা নিতে।  তবুও আমার যতদূর মনে পরে, আমরা নৌকা করেই গেছিলাম মাইল্যাগি। কেননা নদীর পার দিয়ে রাস্তা ছিল না বললেই চলে, প্রায়ই ভাঙতো নদীর তীর। এইতো মাত্র কিছুদিন আগের কথা।  বাবার অনেক আগেই ঘিওর হাট  থেকে ফেরার কথা ছিল, অথচ কোনোই খবর নেই। ছোট কাকা এসে জিগ্যেস  করলো, "নয়া বৌদি, নয়া দা আসেনি এখনো?" আরো কিছু ক্ষণ  পরে জ্যাঠামশায় খোঁজ নিলো বিন্দার (বাবার নাম বৃন্দাবন, জ্যাঠামশায়  বাবাকে বিন্দা নাম ডাকতো।) বাবা কখনো রাস্তায় দেরী  করতো না, তাই লোকজন বেরিয়ে পড়লো বাবার খোঁজে।  অনেক রাতে বাবাকে ধরাধরি করে নিয়ে এলো।  শুনতে পেলাম বাবা সাইকেল থেকে পরে গেছিলো, আর অনেক খুঁজে নদীতে যখন বাবাকে পাওয়া গেলো, তাকে ওঠানোর কিছুক্ষন পরেই বিরাট মাটির ধ্বস নামলো সেখানে। তাই সব দিক ভেবে দেখলে মনে হয় হেটে আমরা যায়নি সেখানে, যদিও দিদি বললো হেঁটেই গেছিলাম।  তবে কিভাবে গেলাম সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা বাড়ী  ছাড়তে হলো, বিশাল পরিবার টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো বিভিন্ন জায়গায়।

আমার খুব একটা বেশি কিছু মনে নেই  মাইল্যাগীর দিনগুলোর কথা।  আমরা ছিলাম মেঝমার দূর সম্পর্কের ভাই আমাদের বীরেশ্বর (যতদূর মনে পরে) মামার  বাড়িতে।  ওখানে থাকাকালীন একবার বা দুইবার বাবা বাড়ী  গেছে  খোঁজ খবর নিতে।  একবার গেলো রতনকে নিয়ে।  আমিও বায়না ধরলাম, নিলো না, তবে বললো বাড়ী  থেকে আমার জন্য ফেলে আসা মার্বেল, লাটিম, সিগারেটের খোলা এসব নিয়ে আসবে।  আমার খুব ইচ্ছে ছিল মাত্র কয়েকদিন আগে বাবা আমাকে যে সাদা রঙের চামড়ার জুতোজোড়া কিনে দিয়েছিলো তা যেন নিয়ে আসে।  তবে ওটা আর আনা  হয়নি।  তবে ওই জুতাজোড়ার কথা আমার খুব মনে আছে।

আমার ঠিক মনে নেই কতদিন আমরা ছিলাম ওই গ্রামে। তবে ওখানে থাকাকালীন খবর পেলাম আমাদের গ্রামে হিন্দুদের বাড়ী  ঘর লুট হয়ে গেছে, শামসু চাচা আর নোয়াই চাচা আমাদের বাড়ী  কিনে রেখেছে বলে লুটেরাদের  হাত  থেকে বাঁচাতে পেরেছে।  এর পর  এলো পরা কাকা (পরেশ সাহা), নিরা কাকা (নিরানন্দ সাহা), জগাই কাকা (জগদীশ সাহা), রমেশ বসাক, বলাই গোসাই আর তার বৌয়ের হত্যার খবর। এই হত্যাকান্ডগুলির সাথে জড়িত ছিল গ্রামেরই কিছু লোকজন। এর মধ্যে বলাই গোসাই আর তার বৌকে কুয়ায় ফেলে হত্যা করা হয়েছিল। এর মধ্যেই মাইল্যাগীর চেয়ারম্যান বলতে শুরু করলো আমরা যেন ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাই। কেননা তারা আমাদের ক্ষতি হোক সেটা চায়নি, তবে দেশের  ওই অবস্থায় আমাদের  রক্ষা করার মতো ক্ষমতা তাদের ছিল না।  তখন আমাদের খদ্দের বাংগালার কুদ্দুস ভাই বাবাকে বললো তাদের ওখানে যেতে।  মাইল্যাগী  থেকে আমরা পায়ে হেটে রওনা হলাম বাংগালার পথে।


দুবনা, ০৫ অক্টবর ২০১৬



No comments:

Post a Comment