এখন আর চাইলেই দৌড়িয়ে অন্য পাড়ায় মদন মামাদের ওখানে যাওয়া যেত না। যেতে হতো কাপড় বাঁচিয়ে অথবা কলাগাছের ভেলায় চড়ে। চলাচলের জন্য সালাম ভাই বাড়ী থেকে দুটো নৌকা এনে দিলো। এদুটো ছিল আমাদের মেঝো নৌকা আর ছোট নৌকা। চারটে নৌকাকে এভাবেই বড়, মেঝো, নয়া, ছোট বলে ডাকা হতো তাদের আকার অনুযায়ী। বড় নৌকা মূলতঃ ব্যবহার করা হতো ফসল কাঁটা আর ফসল তোলার জন্য, মেঝোটা হাটে যাবার জন্য। অন্য দুটো বাড়ীর কাজে আর আমাদের ঘুরে বেড়ানো জন্য বর্ষা কালে। কখনো যেতাম শুধুই নৌকা বাইতে, কখনো শাপলা তুলতে আবার কখনোবা পিকনিকে। বন্ধুরা মিলে নৌকায় বসেই মুরগি কাটা আর রান্না হতো কেরোসিনের স্টোভে।
আঁদ্রে জিদ তার "লা সিম্ফনি"তে লিখেছিলেন, প্ৰকৃতির নিয়ম ঈশ্বরের নিয়মের চেয়ে অনেক উদার। এই যে দেশে কত মানুষ শুধু ধর্মের কারণে মরছে আর মরছে শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য, প্রকৃতি কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপও করছে না। নির্বিকারে চলছে তার নিজের গতিতে, সময়ের সাথে রূপ বদলে। হিন্দু-মুসলিম, বাঙালী-অবাঙ্গালী নির্বিচারে সবাইকে দিয়ে যাচ্ছে কখনো রোদ, কখনও বা বৃষ্টি। পৃথিবীতো আর গতকাল জন্মায়নি, এমন কি ৫৭০ সালেও না, শূন্য সালেও না, আড়াই হাজার বছর আগেও না বা সাড়ে তিন হাজার বছর আগেও না। ইসলাম, ক্রিষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদী - এসব ধর্ম আসার অনেক আগে থেকেই পৃথিবী ছিল, ছিল মানুষ আর ছিল তাদের নিজ নিজ ভগবান। কই, সেই ভববান তো তাদের উপর নাখোশ ছিল না, তাদের যান-মাল কাড়েনি বা তাদের দেশান্তরী করে নি। তাহলে আজকের এই ভগবান বা আল্লাহ বা গড কেন মানুষ দিয়ে মানুষ মারাচ্ছে, এই মারামারি আর হানাহানিতে সয়লাব করে দিচ্ছে পৃথিবী? নিজেকে একটু প্রশ্ন করুন, তাহলেই দেখবেন, এটা ভগবানের কাজ নয়, কিছু স্বার্থান্বেষী লোক ধর্মকে ব্যবহার করে আমার, আপনার হাত দিয়ে খুন করছে অন্য মানুষ, হত্যা করছে মানবতা।
মানুষ সব কিছু মনে না নিলেও সময়ের সাথে অনেক কিছুই মেনে নেয়। একই ভাবে যুদ্ধটাকেও মেনে নিচ্ছিলো মানুষ আর এরই মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলো নিজের নিজের মতো করে। বর্ষার ফলে যাতায়াতে সুবিধা বাড়লে বাবা-কাকারা সিদ্ধান্ত নিলো সুতার কাজটা চালু করতে। নারায়ণগঞ্জে যাদের আছে থেকে আমরা রং আর সুতা কিনতাম তাদের অনেকেই ছিল বাবা-কাকার গুরুভাই, মানে মহানামব্রত বহ্মচারীর শিষ্য। এছাড়া মুসলিম মহাজনরাও (মহাজন - যারা বিক্রি করে, আর পাইকার যারা কেনে) ছিল। তাদের সাথে যোগাযোগ হলো। তারা লঞ্চে করে ঘিওর পর্যন্ত রং আর সুতা পাঠাতে রাজি হলো। কখনো কাকা, কখনো বাবা গিয়ে ঘিওর থেকে ওসব নিয়ে আসতো।
প্রথম দিকে রঙের কাজ হতো বাঙ্গালা কুদ্দুস ভাইয়ের বাড়িতে। রং আর সুতা নিয়ে মদন মামা আর সালাম ভাই নৌকা করে চলে যেত বাঙ্গালা। বিকেলে আমরা যেতাম তাদের আনতে, সালাম ভাই ই কাজের ফাঁকে আমাদের নিয়ে যেত ওখানে, সাথে দুপুরের আর রাতের খাবার। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে নৌকা বেয়ে। কখনো কখনো চাঁদনী রাতে নৌকায় ফেরার সময় আমরা খেতাম। ওই সব দিনে আমি বায়না ধরতাম বাসি ডাল আর পান্তা ভাতের। মা তাই আলাদা করে আমার জন্য এসব দিয়ে দিতো। আগের দিনের ডাল জ্বাল দিলে নিচে পরে থাকতো শুধু ঝাল আর লবনাক্ত ডাল। আর আগের দিন ভাতে জল দিয়ে রাখলে সেটা হতো পান্তা ভাত। ভাত যাতে পচে না যায়, রাতের খাবার শেষ ভাত রয়ে গেলে ওটাকে পান্তা করে রাখা হতো। এর সাথে থাকতো মলা (সম্পূর্ণখা) বা বাতাসী বা ওই জাতীয় গুঁড়া মাছের চর্চরি, ঝাল, নুনুতে আর পুড়া (পুড়া চর্চরিকে বলতো কালাপুড়া)। .বেগুন, ডাটা (দারা) আর বিভিন্ন সবজি দিয়ে মাছের চর্চরি, বাসি ডাল, পান্তা ভাত আর কাসুন্দি - চাঁদনী রাত, লগ্গির (নৌকা বাওয়ার জন্য বাঁশের লাঠি) ধাক্কায় নৌকার সামনে চলা, বৈঠার শব্দ, কখনো কাঁচা মরিচ (মামা খেত, আমি খেতে পারতাম না, ঝাল প্রচন্ড), পেঁয়াজ আর বিস্তীর্ন বইরাগীর চকের মৃদুমন্দ বাতাস। স্বর্গসুখ, যদি না যুদ্ধের ডামাডোল আর মনের কোনায় বসে থাকা ভয়। এখন মনে হয় মামা খুব সকালে যেত আর আমরা অনেক রাতে ফিরতাম আসলে লোক চক্ষু এড়ানোর জন্যই। তখন অনেক কিছু বোঝার ক্ষমতা ছিল না, বয়েস ছিল না। হয়তো বা তাই আমি ওই নৌকা যাত্রা যতটা উপভোগ করেছি, অন্যেরা তা পারেনি। বাড়ীতে ফিরলে মা কোলে টেনে নিতো। একটা দুঃশ্চিন্তা নেমে যেতো বুক থেকে। সব বাবা-মারাই এটা করে। আর শুধু যুদ্ধের সময়ই নয়। এখন নিজের যখন ছেলে মেয়ে আছে, যদিও যুদ্ধ নেই, তবুও যতক্ষন না সবাই বাড়ী ফিরছে, এক ধরণের টেনশন থেকেই যায়।
এভাবেই আবার শুরু হলো সুতার কাজ। উপার্জনের বাইরেও এর একটা অসীম গুরুত্ব ছিল। আমরা যারা ছোট ছিলাম, খেলাধুলা করেই সময় কাটিয়ে দিতাম। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের জন্য মনখারাপ হতো বটে, তবে বয়সের কারণে সেটা খুব বেশী আমাদের বিষন্ন করতো না। কিন্তু বড়রা, যাদের সংসার চালাতে হতো, এতগুলো লোকের মুখে ভাত তুলে দিতে হত, তাদের তো সব ভুলে যাবার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া কাজ না থাকলে দুঃশ্চিন্তা বাড়ে, বাড়ে অনিশ্চয়তা। তাই সুতার কাজটা শুরু হওয়ায় বাবা-কাকারও সময় কাটানো অনেকটা সহজ হয়ে এলো। যুদ্ধ, মৃত্যু আর ধ্বংসের বাইরেও এখন কথায় বার্তায় এলো ব্যবসার কথা, রং, সুতার কথা, কিভাবে পাইকারদের সুতা পৌঁছে দেয়া যায় তার কথা।
স্থানীয় পাইকারদের মাধ্যমেই আশেপাশের খদ্দেররাও খবর পেয়ে গেলো। কেরানী নগর হাটে বাবা বা কাকা রঙিন সুতা নিয়ে যেত নৌকা করে, কখনো আমিও যেতাম তাদের সাথে। খদ্দেররা আগে থেকেই বলে দিতো কার কি দরকার, আর আমাদের যাতে খুব বেশী সময় ওখানে থাকতে না হয়, তাড়াতাড়ি এসেই সুতা নিয়ে যেত। সব চললো ঠিক যেন যুদ্ধের আগের দিনগুলোয়। ওই যুদ্ধের দিনগুলিতেও চারিদিকে কত ভালো মানুষ ছিল আমাদের সাহায্য করার জন্য, একাত্তরের সেই হিন্দু নিধন যজ্ঞের দুর্গম পথ পেরিয়ে আমাদের স্বাধীন সুর্য্যের মুখ দেখানোর জন্য। আজ এই ২০১৬ তে যখন দেশ থেকে খবর পাই কোনো এক রামুতে বা কোনো এক নাসিরাবাদ গ্রামে পুড়ছে শত শত সংখ্যালঘুর ঘর, ধর্ষিতা হচ্ছে এমন কি পাঁচ বছরের শিশু - ভাবি কোথায় গেলো সেই একাত্তর, কোথায় গেলো একাত্তরের সেই মানুষগুলি।
মস্কো, ০৬ নভেম্বর ২০১৬

Boro valo laglo pore.
ReplyDeleteThank you Rama!
Delete