বৈলতলায় বলতে গেলে দিন চলছিল স্বাভাবিক ভাবে। আমাদের একান্নবর্তী বিশাল পরিবারের সবাই এখন এখানে। মদন মামাও সবাইকে নিয়ে চলে এসেছে। কথা চলছে ধীরে ধীরে সুতার কাজটা শুরু করার। সংসার তো চালাতে হবে। যুদ্ধে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় কিন্তু থেমে যায় না। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, জন্ম, মৃত্যু, ভালোলাগা, ভালোবাসা - সব কিছুই থেকে যায়, জীবনের প্রতি আকর্ষণ বরং অনেক বেড়ে যায়, প্রচন্ড হয় লড়াই করে বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কেন জানি না, বৈলতলা যেন বেশ আপন হয়ে গেছে।
তখনও বর্ষা ঠিক শুরু হয়নি। খালে একটু একটু করে জল আসতে শুরু করেছে। আমরা নদীর পাড় ধরে হেটে হেটে প্রায়ই যেতাম কেরানীনগর বাজারে। বাজার নয়, হাট বলাই ভালো, যদিও প্রতিদিন ওখানে বাজারও লাগতো। ওটা ছিল ধলেশ্বরীর তীরে। বলতো, ওখান থেকে নৌকায় তরা খুব বেশি দূরে নয়। আমরা খালের পাড় আর জঙ্গলের ধার দিয়ে হেটে হেটে আসতাম বাজারের অন্য পাড়ে। ওখানে নৌকা করে পেরুতে হতো খাল।
বাজার ছিল লোকেলোকারণ্য আর বিভিন্ন রকম মাছ আর সবজি দিয়ে ভরা। মানুষ আসতো যতটা না কেনা বেচা করতে, তার চেয়েও বেশী খবর নিতে, খবর দিতে। যুদ্ধের থমথমে পরিবেশ থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে একটু নিঃশাস নিতে, ক্ষনিকের জন্য হলেও যুদ্ধের দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে। এই বাজার ছিল ছোট বড় সবার জন্য আশার আলো যখন কোনো কিছু না ভেবে জেলের সাথে মাছ দামাদামী করা যেত, কেনা যেত দুধ, শাকসবজি। এসব কেনার সময় কেউ মৃত্যুর কথা ভাবতো না, ভাবতো জীবনের কথা, আগামী দিনের কথা। মানুষ কখনো মৃত্যু কেনে না, কেনে জীবন, কেনে আলোকিত ভবিষ্যৎ, কেনে স্বপ্ন - বেঁচে থাকার, বড় হওয়ার স্বপ্ন। বাজারে মানুষ দেখে সব ভয় কেটে যেত, বিশ্বাস হতো দেশে স্বাভাবিক মানুষ এখনো মরে শেষ হয়ে যায় নি, স্বপ্ন দেখার মানুষ এখনো আছে, বেঁচে থাকার, জীবনকে ভালোবাসার মানুষ বাংলা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি।
সময় পেলেই আমি দৌড়ে চলে যেতাম বৈরাগীর চকে। ওখানে তখন আউশ আর আমন ধানের পাতাগুলো হালকা বাতাসে দুলে দুলে আমাকে স্বাগত জানাতো। এতো বড় চক আমি আগে দেখিনি। এ যেন এক সবুজ সমুদ্দর। অন্তহীন সবুজ মাঠ যেখানে হালকা বাতাসে ঢেউ তুলে নাচছে সবুজ ধান। পথে পড়তো কমলি ফুল, সাদা আর বেগুনির অপূর্ব সমন্বয়। কখনও তুলতাম সেগুলো পরে খেলবো বলে। গাঁথতাম কমলি ফুলের মালা। আর যখন সালাম ভাই আমাদের জন্য বাড়ী থেকে ধান বা চাল নিয়ে আসতো বলতাম বাড়ী থেকে একটা গরু, নিদেন পক্ষে একটা বাছুর এনে দিতে। সালাম ভাই বলতো, "বাবু, বর্ষাটা যাক, আইন্যা দিমু (এনে দেব)।"
দিদিরা তখন মাটি দিয়ে বানাতো পুতুল। এঁটেল মাটি আনতাম কুম থেকে। আমিও চেষ্টা করতাম, তবে আমার পুতুলগুলো ততটা ভালো হতো না। তাই আমি কলা গাছের ডগা দিয়ে কালী ঠাকুর তৈরী করে পূজা পূজা খেলতাম।
মা, মেঝমা, খুড়ীমা আর মাখন কাকী (মাখন কাকার স্ত্রী) বসে বসে গল্প করতো, গান গাইতো। কখনো বা মা তাদের শাস্ত্র পাঠ করে শোনাতো।
বাবা, কাকা, জ্যাঠামশায়, মাখন কাকা খালের ওখানটায় বসে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতো। এছাড়া ছিল খবরের কাগজ পড়া আর রেডিওর খবর শোনা। সবচেয়ে প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এম আর মুকুলের চরমপত্র। দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের ভরাট গলায় আকাশবাণী শব্দ মনে আশা জাগাতো, যেমনটা দিল্লী থেকে নীলিমা স্যান্নালের কণ্ঠ। ছোটকাকা প্রায়ই বলতো, রাখে হরি মারে কে? আর বাবাকে বলতে শুনতাম, যা হয় মঙ্গলের জন্যই হয়। বাবার এই আশাবাদ মনে হয় আমার মধ্যে গেথে গেছে। আমি এখনো শত বিপদেও ভেঙে পড়ি না, সব কিছুর মধ্যেই পজিটিভ খোঁজার চেষ্টা করি।
খবর কাগজ আমরা পেতাম সুধীরদার মাধ্যমে। সুধীরদা যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিন আগে বানিয়াজুরী হাই স্কুলে চাকরী পেয়েছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, সুধীরদা থাকতো ঢাকায়, জগন্নাথ হলে। ১৯৭০ এ গণিতে এম এস সি পরীক্ষা দিয়েই চাকরিতে ঢুকে, বিয়েও করে তখনই। যদিও স্কুলে যুদ্ধের সময় ক্লাস হতো না, শিক্ষকদের ঠিকই যেতে হতো। যতক্ষণ না ও বাড়ীতে ফিরত, মা, বৌদি খুব চিন্তায় থাকতো। একবার তো কি কারণে রাতে বাড়ী ফিরলো না। বাড়ীতে সে কি দুঃশ্চিন্তা। সুধীরদা অনেকদিন পর্যন্ত বানিয়াজুরী স্কুলে ছিল, আমিও ওর ছাত্র ছিলাম। পরে মানিকগঞ্জ মহিলা কলেজে পড়াতো। তার পরে শুধুই টিউশনি করতো। প্রচন্ড পছন্দ করতো ছাত্র পড়াতে। প্রায়ই গরিব ছাত্রদের নিজে বই কিনে দিতো। বই পড়া, ছাত্র পড়ানো আর চা - এগুলো ছিল ওর নেশার মতো। আমরা অন্য ভাইয়েরা ক্লাব করতাম, রাজনীতি করতাম, হাজারো সামাজিক কাজে জড়িত ছিলাম। সুধীরদা শেষ দিকে একটু আধটু রাজনীতি করলেও মূলতঃ ছাত্র পড়িয়েই জীবন কাটিয়ে দিলো। হাই স্কুল থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত - কত ছাত্র যে আসতো ওর কাছে অংক পড়তে? আর ও পড়িয়েই যেত, পড়িয়েই যেত। যেন এটাই জীবনের সব, সব আনন্দের উৎস। পরে ২০১১ সনে ও মারা যাবার পর দেশে গেলে ওর অনেক ছাত্রের সাথেই দেখা হয়েছে। এখনো সবাই খুব শ্রদ্ধার সাথে ওকে স্মরণ করে। ওই প্রথম বুঝলাম, ভালো কাজ করার জন্য দল করার দরকার নেই, দরকার নেই রাজনীতি করার, যেটা দরকার তা হলো ভালো কাজ করার ইচ্ছে, মানুষকে সাহায্য করার ইচ্ছে। নিজের কাজটা ঠিকমতো করাটাই সবচেয়ে বড় সমাজসেবা, সবচেয়ে ভালো ধর্ম পালন।
আমাদের বাড়ী বই পড়ার অভ্যেস ছিল সবারই আর একেবারে ছোট বেলা থেকেই। দুপুরের খাওয়া শেষে সবাই বই হাতে শুয়ে পড়তো। বৈলতলায়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সালাম ভাই বাড়ি থেকে বই এনে দিতো। আমি দিনে ঘুমোতাম না, রাতেই ঘুম হয় না, আবার দিনে। ওই সময়টা আমি একা একা খেলে কাটাতাম। আমার বই পড়া শুরু হয় মুলতঃ ১৯৭২ এ কলকাতা গিয়ে ছোটদের রামায়ণ কেনার পর থেকে। এর পর রুশ দেশে উপকথা। আর ক্লাস সেভেন এ পড়ার সময় পন্ডিত স্যার যখন চেখভের গল্প সমগ্র ধরিয়ে দেন, তার পর থেকেই আমি রুশ সাহিত্যের ভক্ত। সুধীরদা বই বই কিনতেও খুব পছন্দ করতো, আর সব সময় আমার জন্য নতুন নতুন বই কিনে আনতো। আমি যেহেতু ডিটেকটিভ পছন্দ করতাম না, আমার জন্য কিনে আনতো বিশ্ব সাহিত্যের সেরা সেরা লেখকদের বই।
আমার মনে হয় বৈলতলার ওই দিনগুলোতেই আমার মধ্যে এক ধরণের অন্তর্মুখীতা গড়ে ওঠে। তখন থেকেই আমি পছন্দ করতে শুরু করি একা থাকতে, একা খেলতে। মনে আছে পরে আমি একা একা মার্বেল খেলতাম বিছানায় বসে। এখনো দিনের বেশ কিছু সময় একা থাকতে না পারলে প্রচন্ড অস্বস্তি অনুভব করি। ক্লাবে যখন যাই, হঠাৎ শুনি, কেউ জিজ্ঞেস করছে "বিজন, তুমি এখানে?" তার মানে আমি বসে আছি ঠিকই কিন্তু মনে মনে অন্য কোথাও ঘুরছি। অনেক সময় সেভা বা মনিকা যখন দুবনা আসে আর গুলিয়া পরে জিজ্ঞেস করে এই কয়দিন আমরা কি নিয়ে কথা বললাম, দেখা যায়, আমি ওদের সাথে কথাই বলি নি। সব যুদ্ধেরই কিছু কিছু সাইড এফেক্ট থাকে। আমার জন্য এটা মনে হয় নিজে নিজে থাকা, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, অনেক কিছুর মধ্যে থেকেও কোথাও না থাকা। হয়তো বা একাত্তর আমাকে শিখিয়েছে জগৎ - এটা শুধুই মায়া।
দুবনা, ০২ নভেম্বর ২০১৬

likhagulo amake khub tanche bijon, ekdomi thamben na.
ReplyDeleteThamte to hobei. juddh thamlo, ami thambo na, se ki kore hoy? icche hoy kakuke ekhate, jani na kivabe. kono idea?
Delete