Sunday, November 13, 2016

১৮. ছানা রাজাকার

দিন যায়, জল বাড়ে, বাড়ে ভয়।  যখন বাড়ীর সামনে খাল শুকনো ছিলো  তখন আর যাই হোক, সবার অগোচরে শত্রু, মানে পাকবাহিনী বা তাদের দেশীয় সাগরেদদের আসাটা  ছিল বলতে গেলে অসম্ভব।  যেহেতু আমাদের পরিবার তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহুকুমায় বিভিন্ন ভাবেই সুপরিচিত ছিল, তাই যেখানেই থাকি না কেন, সবার অগোচরে থাকা ছিল সত্যিই অসম্ভব।তারপরেও যে এতদিন আমরা বলতে গেলে আপেক্ষিক ভাবে নিরাপদেই ছিলাম, এটা  সেসব জায়গায় ছিলাম, সেই এলাকার পাইকার, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মাতব্বরদের আর সর্বোপরি মানুষের ভালোবাসার কারণে।  এটা মনে হয় এ কারণে যে, কারো সাথেই জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলা আমাদের ছিল না, বাবা কখনও  খদ্দেরদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতো না, বরং যদি কেউ বিপদে পড়তো, চেষ্টা করতো তার পাশে দাঁড়াতে। তাই এতদিন পর্যন্ত এই বিশ্বাস ছিল, যে এলাকায় মিলিটারি আসার আগেই কেউ না কেউ  আমাদের খবর দেবে, সাহায্য করবে সময় মত  নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে।  কিন্তু জল বাড়ার সাথে সাথে পাশের খাল যখন হয়ে গেলো মহাসড়ক, যখন নদী পথে যে কেউই অনেকটা অগোচরেই চলে আসতে পারতো মাখন কাকার বাড়ীতে  আর বর্ষার কারণে পালানোও ছিলো  যথেষ্ট কষ্টসাধ্য, আগের সেই সাহসটা আর রইলো না।  তাই সারা দিনই, বিশেষ করে দিনের বেলায় কেউ না কেউ থাকতো ঘাটে, যাতে সন্দেহজনক কোনো নৌকা আসলে আগে থেকেই সাবধান করে দিতে পারে সবাইকে।  আর বাড়ীর  ঘাট থেকে যেহেতু অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত, তাই ওটাই ছিল একমাত্র ভরসা কোনো ধরণের অকস্মাৎ আক্রমণ এড়ানোর।

এভাবেই ভয়-ভীতি আর আশা-আকাঙ্খার মধ্যেই কাটছিলো দিনগুলো।  যেদিনটির কথা বলছি  সেটাও শুরু হয়েছিল অন্য দিনগুলোর মতোই। সবাই যে যার মতো করে সময় কাটাচ্ছিল।  ছোটকাকা রতনকে নিয়ে গেছিলো ঘিওর সুতা আনতে।  নারায়ণগঞ্জ থেকে সুতা পাঠাতো ঘিওরে, ওখান থেকে তা বৈলতলা এনে রং করে বিক্রী  করতো কেরানীনগরের হাটে। এটা আমার অবশ্য মনে ছিল না, মানে ছোটকাকা আর রতনের ঐ  দিন ঘিওর যাবার কথা।  তবে লেখাটা শুরু করার পর রতনের সাথে কথা বলে  জানলাম ওরা নাকি ঘিওর গেছিলো। মা-মেঝমারা ছিল বাড়ির পেছনের দিকটায় যেখানে রান্না হতো, কল্যানদা  চলে গেছিলো একা  একা  নৌকা বাইতে। বাবা, মাখন কাকা আর জ্যাঠামশায় বসে গল্প করছিলো বাড়ীর  বাইরের দিকটায় যেখান থেকে পুরো খালটা দেখা যায় অনেক দূর পর্যন্ত। আমি নিজে ঠিক কোথায় ছিলাম হলপ করে বলতে পারবো না। কখনো মনে হয় আমি বাবার পাশেই বসে ছিলাম আবার কখনো মনে হয় বাইরে গন্ডগোল শুনে মা আমাকে ওখানে পাঠিয়েছিল  কি হয়েছে সেটা জানতে।

যাই হোক, হঠাৎ একসময় শোরগোল উঠলো একটা নৌকা আসছে আমাদের দিকে, অনেকটা একমালিয়া নৌকার মতো, ছই ওয়ালা।  একমালিয়া নৌকা - এটা মাঝারি আকারের নৌকা, যেখানে একজন মাত্র চালক বা মাঝি  থাকে।   নৌকার  সামনের দিকটা, মানে যেদিক দিয়ে মানুষ নৌকার উঠে, নীচু , জলের খুব কাছাকাছি, আর পেছনের দিকটা বেশ উঁচু, দা যেমন বেঁকে উপরে উঠে যায়, ঠিক তেমনটাই।  যার ফলে  নৌকার পাটাতন বা ফ্লোরটা একটু ঢালু। যেহেতু এই নৌকা ব্যবহার করা হয় যাত্রীবাহী যান  হিসেবে, এর মাঝখানটা থাকে ছই বা ঢাকনি দেয়া। ছই তৈরী হয় বাঁশ  দিয়ে।  ঐসব দিনে এমনকি যুদ্ধের পরেও, দেশে যখন রাস্তা-ঘাট এতো উন্নত ছিল না, গ্রামে গঞ্জে যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল পায়ে হেটে বা বর্ষায় নৌকা করে, একমালিয়া নৌকা ছিল অনেকটা নদীর বেবী  ট্যাক্সির মতো, মানে রিকশার (অর্থাৎ ডুঙ্গা নৌকার) মতো খোলা না, আবার ট্যাক্সির (পানসি নৌকার) মতো মত  আরামদায়ক আর ব্যয়বহুল না। সাধারণতঃ  বৃষ্টির সময় ছই এর সামনে পর্দা টেনে দেয়া হতো, যদিও কখনো কখনো খানদানী  পরিবারের মহিলারা কোথাও গেলেও ছই এর সামনে পেছনে ঢাকনা বা পর্দা লাগানো হতো।  যাই হোক সময় যুদ্ধকালীন, তাই এই সময় ঢাকনা দেয়া ছই ওয়ালা নৌকা দেখে সবার মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো, শুরু হর শোরগোল আর সবাইকে বলা হলো বাড়ি থেকে সরে যেতে, বলতো যায় না?

আমার শুধু মনে আছে মাখন কাকা বেশ কয়েকবার চিৎকার করে কে আসছে কে আসছে বলে জিগ্যেস করার পরও  কোনো উত্তর না পেয়ে সবাইকে পালাতে বলে।  নৌকাটা যখন আমাদের ঘাটের কাছাকাছি এসে গেছে, তখন আমি দৌড়ে চলে যাই ভেতর বাড়ী  মা-মেঝমাদের পালাতে বলার জন্য।  সবাই জড়ো  হই  ঘরের পেছন দিকটার দেবদারু গাছের নীচে।  মা বার বার জিজ্ঞেস করে বাবা কোথায়? আমি অনেকটা বানিয়েই  বলি, পালিয়েছে মাখন কাকার সাথে, আমাদের পালাতে  বলেছে।  ঘাটে  তখন ছোট একটা ডুঙ্গা  ছিল।  ওখানে মেঝমা, বৌদি, দিদি, রঞ্জিতদা আর আমি উঠে বসি।  মা সাঁতার জানতো না, তবে জোর করে বললো আমরা যেন  দিদি-বৌদিকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যাই।  আসলে রঞ্জিতদা বা আমিও সাঁতার জানতাম না, আর সময় ছিল না।  মা ওখানেই জলে নেমে রয়ে গেলো, আমরা চলে গেলাম একটু দূরে অন্য এক বাড়ীতে।  জানি না কত সময় ওখানে আমরা ছিলাম, তবে এটা ছিল একাত্তরের সবচেয়ে অনিশ্চিত কয়েক ঘন্টার একটা।

আমার কেন যেন কয়েকটা ছবি মনে পড়ছিলো, এখনো পরে, যদিও পরবর্তী ঘটনা থেকে সঠিক কি ঘটেছিলো তা  বেছে নিতে সমস্যা হয় না।

ওই ছবিগুলোর একটা ছিল, বাবা, কাকা (যদিও এখন মনে হয় জ্যাঠামশায়, যেহেতু রতনের ভাষায় কাকা আর ও ঘিওর গেছিলো ওই দিন) আর মাখন কাকা বসে গল্প করছিলো আর আমি বসে বসে পাটখড়ি দিয়ে মাটিতে কিছু লিখছিলাম বা আঁকছিলাম (ওটা আমার প্রিয় কাজগুলোর একটা, এখনো দেশে গেলে মাটিতে লিখি, ছবি আঁকি।) ঠিক ওই সময় নৌকাটা চোখে পরে আর মাখন কাকা জোরে জোরে জিজ্ঞেস করতে থাকে কে আসছে। উত্তর না পেয়ে উনি বাবা আর জ্যাঠামশায়কে নিয়ে বাড়ীর  অন্যদিকে চলে যায় ওখান থেকে পালাবে বলে আর আমাকে বলে এদিক দিয়ে মা-মেঝমাদের নিয়ে পালিয়ে যেতে। বাবা চাইলো এদিকে এসে মা-মেঝমাদের খবর নিতে, জ্যাঠামশায় এক রকম ধমক দিয়ে বাবাকে নিয়ে যায়।

অন্য ছবিটা ছিল, নৌকা থেকে আর্মিরা নেমে আসে আর বাবার দিকে তাক করে বন্দুক ধরে।  আমি এরই মধ্যে দৌড়ে ভেতরে চলে যাই মাদের  সাবধান করতে।  যেহেতু গুলীর শব্দ পাইনি, তাই আর যাই হোক, বাবাকে গুলী  করেনি, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত ছিলাম, তবে এই রকম পরস্পর বিরোধী ছবি আমাকে কিছুতেই শান্তি দিচ্ছিলো না। এছাড়াও মা রয়ে গেছিলো, তাই কান্নাকাটি না করলেও প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় কাটছিলো সময়।  মাকে  আনতে  যাবার উপায় ছিল না, কেননা তাহলে নিজেদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল।

আজ আমি অবাক হই, যদিও আমার সামনে দুটো ছবি ভাসছিলো, কিভাবে আমি মাকে বললাম বাবা পালিয়ে গেছে, চল আমরা পালাই।  ওই সময় আমাকে নিয়ে বেশ কিছু গল্প আমি শুনেছি অনেক বার।  আমার বয়স  যখন ছয় মাস, আমাদের বাড়ীতে ডাকাত পরে। দরজা ভেঙে ডাকাতরা ঢুকে পরে আমাদের ঘরে। এক ডাকাত যখন বাবার বুকে চাকুর আঘাত করে মা এসে দাঁড়ায় বাবার সামনে, আঘাত লাগে মার থুতনিতে।   অজ্ঞান হয়ে পরে যায় মা, বাবাও অজ্ঞান হয়ে পরে যায় ডাকাতদের আঘাতে।  পরে ডাকাতরা  আমাকে ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়  পুড়িয়ে মারবে বলে, যখন স্বপনদা অনেক কাকুতি-মিনতি করে ডাকাতদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র স্বপনদা এই ঘটনায় এতো ভয় পায় যে, কয়েকদিন পরেই কলকাতা চলে যায়। এর পর আর কখনো দেশে ফেরেনি। এখন  ওখানেই ডাক্তারী  করে। আমার যতদূর মনে হয়, ওই গল্পই  আমাকে বলে দেয় যদি না বলি  বাবা মাখন কাকার সাথে পালিয়ে গেছে, মা বাড়ী  থেকে এক পাও নড়বে না।

বড় হয়ে কতবার যে এই রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়েছে! এখনো মনে পরে দুটো ঘটনা, এখনো শিউরে উঠি।

২০০৪ বা ২০০৫। শনিবার সন্ধ্যায় আমরা সাঁতার কাটতে যেতাম। আমি মনিকা, ক্রিস্টিনা আর মনিকার বান্ধবী লিজা।  ওদের বয়স  তখন ৬ আর ১০।  সেদিন ও যাচ্ছি।  পথে আমাদের রেললাইন ক্রস করতে হয়।  যখন রেললাইনে উঠে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ এক চোখ ধাঁধানো সার্চ লাইটে মনে হলো লাইনের ওদিকে গাড়ি যাচ্ছে। তাই ওদের বললাম লাইনের উপরেই অপেক্ষা করতে।  আর ঠিক সে মুহূর্তে বেজে উঠে  ট্রেনের  হৃদয় বিদারী হুইসেল। "লাফাও সবাই" বলে কোনো রকমে লাইন থেকে নেমে যাবার পর ট্রেনটা চলে গেলো আমাদের পাশ দিয়ে।  এখনো মাঝে মাঝে কানে বাজে ট্রেনের সেই হুইসেল।  

২০০৫।  সবাই মিলে যাচ্ছি বাচ্চাদের একটা অনুষ্ঠানে।  সেভার বয়স  তখন ৩ এর কাছাকাছি। ওকে আমি সাইকেলে বসিয়েছি, মানিক, ক্রিস্টিনা, লিজা, ইউৱা  আসছে হেটে। লিজা আর ইউরার বাবা আনাতোলি ভানিয়াকে নিয়ে আসছে পেছনে পেছনে। যেহেতু ওরা অনেকটা পেছনে, রেললাইন পার হবার আগে লাইন থেকে মিটার ১৫ দূরে আমি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি ওদের জন্য। সেভা  নেমে পড়েছে সাইকেল থেকে। আর আমি ডাকছি মনিকাদের তাড়াতাড়ি আসতে। হঠাৎ পেছন ফিরে দেখি সেভা  হাটতে হাটতে এগিয়ে যাচ্ছে রেললাইনের দিকে,  আর ওদিক থেকে আসছে ট্রেন।  আমি শুধু মনিকাদের ইশারায় বললাম কিছু না করতে,  কেননা সেভাকে ধরতে গেলে ও দৌড়ে সামনের দিকে যেতে পারে। ও একটা সময় চলন্ত ট্রেন থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো আর আমি রইলাম অপেক্ষায় কখন  ট্রেন চলে যাবে আর আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরবো।  এটা ছিল সেপ্টেম্বর, বেশ ঠান্ডা ছিল বাইরে, কিন্তু মনে হয় ওই দুই -তিন  মিনিটে আমি ঘামে নেয়ে উঠেছিলাম।

এগুলোকেই আমি  বলি রূপকথার সেই তিন রাস্তার মোড়।  যখন ডাইনে গেলে বাঘে খাবে, বাঁয়ে গেলে ভালুকে খাবে আর সোজা গেলে সোনা পাবে।  এই সব এক্সট্রিম মুহূর্তে নিজের আবেগকে ধরে রাখা, ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া।  কেননা একটু ভুল যেটা আর সংশোধনের উপায় থাকে না। এই ব্যাপারে রাশিয়ানরা বলে মাইন্ পরিষ্কারকারীরা শুধু এক বারই ভুল করতে পারে। ছেলেমেয়েরা যখন জিজ্ঞেস করে "তাহলে কি আমরা শুধু এক্সট্রিম মুহূর্তেই তিন রাস্তার মোড়ে  দাঁড়াই?'  আমি বলি, "না, আমরা প্রতি মুহূর্তেই তিন রাস্তার মোড়ে  দাঁড়াই। অন্ততঃ জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে।  তা সে পেশা বাছাই করে হোক, বিয়ে করা  হোক, চাকরী করা হোক  বা অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই  হোক।  তবে সেখানে ডাইনে  গেলে বাঘে খাবে, বাঁয়ে গেলে ভালুকে খাবে আর সোজা গেলে অজগর খাবে। তার মানে এসব পথই  হবে দীর্ঘ, কণ্টকময়, আর প্রতিটি মুহূর্তে কাটা সরিয়েই সামনে এগুতে হবে, পৌঁছুতে হবে লক্ষ্যে।"

যাই হোক, মনে হয় ঘন্টা দেড়-দুই এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটিয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত আশার  আলো  দেখলাম।  কে যেন আমাদের নিতে এলো।  বাড়ী  ফিরে শুনলাম সবাই বহাল তবিয়তে আছে।  বাবাকে আর জ্যাঠামশায়কে নিয়ে মাখন কাকা পাশের পাড়ায়  চলে যেতে পেরেছিলো।  মা বেত আর অন্যান্য গাছের ঝোঁপে  গলা জলে দাঁড়িয়ে সময় কাটিয়ে দেয়। তপনদাও ছিল জলে ঘাপটি মেরে। সাতরানোর উপায় ছিল না, পাচ্ছে কেউ দেখে ফেলে।  কল্যাণদা ধরা পরে।  ও গেছিলো নৌকা বাইতে। তবে দূর থেকে আর্মি দেখে ও হাতে ঘড়িটা জলে ফেলে দেয় আর জলে ডুব দেবার  জন্য প্রস্তুত হয়, যখন আর্মিরা ওকে বন্দুকের মুখে বাড়ীতে  আসতে  বলে।  ও এলে  ওকে দিয়ে নদী  থেকে ঘড়ি তোলায় আর সেটা নিয়ে যায়।  কয়েকদিন আগে যখন ফোন কথা হলো, বললো, ও যখন ঘড়ি তুলতে ডুব দিচ্ছিলো, এক রাজাকার ওকে লক্ষ্য করে গুলী ছোড়ার  চেষ্টা করে, তবে সাথে থাকা আর্মি ওকে বিরত করে।

কল্যাণদার কাছেই জানা গেলো যে রাজাকারটা আর্মি  নিয়ে এসেছিলো আমাদের বাড়ী সে ছিল শশী বসাকের শ্যালক ছানা।  শশী বসাক তরার লোক, আমাদের মতোই বৈলতলা আশ্রয় নিয়েছিল। মাত্র কয়েক দিন আগে ও বেড়াতে এসেছিলো শশী বসাকের ওখানে, তখনই সব খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। মনে হয়  ছানার আর্মি নিয়ে আসাটাই ছিল সবার কাছে সব চেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয়, এটা কেউই আশা করেনি।

পরে দেখা গেলো বাড়ী  থেকে সব উধাও, যা পেয়েছে সব লুট করে নিয়ে চলে গেছে।  তখন সন্ধ্যা নেমেছে  - সবাই ক্ষুধার্ত। কি করা? তখন আমার মনে হলো পূজার জন্য আমি প্রতি দিনই একমুঠ করে চাল নিতাম, আর তা রেখে দিতাম  একটা বয়মে যেটা থাকতে চকির (বিছানা) তলায়।  দৌড়ে গিয়ে দেখি, ওটা জায়গা মতোই আছে।  ওই চালই  রাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়ানো হলো।  সে অর্থে আমার পূজাটা একেবারে ব্যর্থ হয়নি।

দুবনা, ১৪ নভেম্বর ২০১৬  


6 comments:

  1. আজ শেষ পর্যন্ত তোর একাত্তরে আপ ডেটে আসলাম। যেহতু একাত্তরটা তোর, তোর ছন্দেই তার বিকাশ ঘটবে। তবে গতকাল একাত্তর পরবর্তীই বেশি স্থান পেয়েছে। তোর লেখার কল্যানে ছোটকালের হারানো জগতের অনেক কিছুর নাম মাথায় ফিরে আসছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. তাই বল। আমার তো মনে হতো ওই নামগুলো আমাদের একান্ত নিজেদের, কিছু কিছু একেবারে নিজের। তাই তো প্রায়ই নামের সাথে সাথে ব্যাখ্যা দেই যাতে অন্যরা বুঝতে পারে কিসের কথা বলছি। হ্যারে, সবার একাত্তরে একান্ত ব্যক্তিগত। হয়তোবা প্রেমের গল্প লিখলে, বা পরিচিত লোকজনদের প্রেমের গল্প লিখলে লোকজন অনেক বেশি আনন্দ পেতো আর বসে থাকতো পরবর্তী লেখার জন্য, কিন্তু আসল কথা তো নিজের কথা বলা, নিজের একাত্তরকে তুলে ধরা।

      Delete
    2. আমি ওই সেন্সে নয়। গল্প, ডাইরী বা essay স্টাইলে পাঠকের সাথে নিজের চিন্তা-ভাবনা শেয়ার করা - বিভিন্ন জিনিস। সবগুলোর সমন্বয়ে ও লেখা যায়। সবই লেখকের ইচ্ছে। আমি নিজে মজা পাচ্ছি। আমার জন্য প্রেম পড়ার চেয়ে করার মজা বেশি।

      Delete
    3. তা যা বলেছিস। আমিও তাই।

      Delete
  2. ছানা রাজাকাররা আমাদের আশ পাশ থেকেই গজিয়ে উঠে। নিজেদের বৈষয়িক পাওনার জন্য অন্যদের চরম সর্বনাশ করতে তারা কোনো কুন্ঠাবোধ করে না।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ওরা মনে হয় বাতাসের মতোই সর্বত্র বিদ্যমান, আমরা দেখতে পাই না, বুঝি, যখন ঝড় ওঠে, আর সে ঝরে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়।

      Delete