জল আর জল, চারিদিকে শুধুই জল। এই সীমাহীন জলের মধ্যে মাঝে মধ্যে দ্বীপের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে বিচ্ছিন্ন কিছু বাড়ী। সেই দাড়িয়াবাঁধা খেলার মাঠ, বইরাগীর চক সব কিছুই হারিয়ে গেছে জলের নীচে। স্থলের গন্ডী যতই ছোট হয়ে আসছে, জীবনের চলার পথও ততই সীমিত হয়ে পড়ছে। শুধু মাত্র যারা স্বপ্ন দেখতে পারে, তারাই মনে মনে হাটতে পারছে দূরের কোনো নক্ষত্রে বা গ্যালাক্সিতে। আর তারার উপর পা ঝুঁলিয়ে বসে উঁকি দিয়ে দেখছে নীচের এই ডুবে যাওয়া পৃথিবীকে যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে খড়কুটা ধরে হলেও ভেসে থাকতে, বেঁচে থাকতে।
বাঁচার তাগিদে, যুদ্ধকে ক্ষনিকের জন্য হলেও ভুলে থাকার তাগিদে একটু একটু করে শুরু করা সুতার ব্যবসা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে। রঙের কাজ কুদ্দুস ভাইয়ের ওখান থেকে চলে এসেছি বৈলতলায়। বাড়ীতে আমাদের খেলার জায়গাগুলো দখল করেছে বাঁশের আর। আর - এটা অনেকটা জাংলার মতো, মাটি থেকে হাত দুই উপরে পরস্পর থেকে হাত দশেক দূরে সমান্তরাল ভাবে দুটো বাঁশ বাঁধা খোটার উপর - অনেকটা ঝুলন্ত রেল লাইনের মত। এই দুই বাঁশের উপর আড়াআড়ি পাতা অনেক গুলো বাঁশ যেখানে শুকানো হয় রঙিন সুতা।
কিছুটা সময় কাটে সুতা উল্টিয়ে, যাতে তা তাড়াতাড়ি শুকায়। কখনো বা মদন মিস্ত্রীর ওখানে গিয়ে ষাট ধরি আর হাতুরি -বাটাল নিয়ে খেলি। তবে এসবই হয়, যেদিন সূর্য্য আসে আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলতে। কিন্তু যেদিন আকাশ ভেঙে পরে অবিরাম কান্নায় সেদিন আমার সময় কাটে ঘরের সামনে যে ছোট বারান্দা আছে, ওখানে বসে। একা একা মার্বেল খেলে। মনে হয় একা থাকার অভ্যেসটা আমি ওখান থেকেই রপ্ত করেছি। আর এই রপ্তটা এতো ভালো করে করেছি যে এখনো খুব বেশি সময় মানুষের সাথে থাকতে পারি না। যদি শারীরিক ভাবে একা থাকার সুযোগ না হয়, হারিয়ে যাই বইয়ের মধ্যে বা লেখায়। কখনো বা ক্যামেরা হাতে ছবি তুলতে শুরু করি। সবাই ভাবে ছবি তুলছি, আর আমি যতটা না ছবি তুলি, তার চেয়েও বেশি করে হারিয়ে যাই নিজের মধ্যে।
যখন খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা বিরক্ত, শুরু হতো পূজা। এটাও এক প্রকার খেলা, পূজা পূজা খেলা। তখন ছোট ছিলাম, ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস ছিল। আমি কলার ডগা দিয়ে ঠাকুর বানিয়ে খেলতাম। কলার পাতা সরিয়ে ফেললে যে ডগা পাওয়া যায়, তার এক দিকটা কাটতাম সোজা, অন্যটা কোনাকুনি। ওই কোনাকুনি কাটা দিকটা হতো মুকুট পড়া মাথা। একটু নীচে ছোট্ট একটু ছিদ্র করে ঢুকিয়ে দিতাম ডগার উপরের ছোট এক টুকরা ছাল বা বাঁকল, ওটা হতো গিয়ে জিহ্বা। আরো একটু নীচে , যেখানে হাত থাকার কথা ওখানে আড়াআড়ি ছিদ্র করে ঢুকিয়ে দিতাম আরো দুটো ছাল, যা ছিল দেবীর চার হাত। এভাবেই তৈরী হতো কালীর মূর্তি। আরো তিন চার টুকরা কলার ডগা নারকেলের শলা দিয়ে গেথে তৈরী করতাম কাঠাম, আর আরো একটা শলা দিয়ে মূর্তিটা বসিয়ে দিতাম কাঠামের উপর। আমার যন্ত্রনায় বাড়িতে শলা বা বারুন আস্ত রাখা কঠিন ছিল। এ নিয়ে প্রায়ই মায়ের বকা শুনতে হতো।
পূজা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। বাড়ীতে তিন বেলা গৃহ দেবতার পূজা হতো। অনেক সময় মা-মেঝমারা ব্যস্ত থাকলে বা কাপড় বদলাতে আলসেমী হলে আমাকে বলতো পূজা করতে। আমি জামাকাপড় খুলে বসে পড়তাম পূজা করতে। আমি সব সময় দেবতাদের বেশী করে বাতাসা, কদমা আর সন্দেশ দিতাম। আমি অনেক আগেই বুঝে গেছিলাম, শেষমেষ আমি নিজেই এগুলো খাবো। এই যে তিন বেলায় দেবতাদের খাওয়ানো, রাতে ঘুম পাড়ানো আর সকালে ঘুম থেকে তোলা - সবই ছিল জীবনের অংশ, অনেকটা খেলার মতো। পরে যখন নিজের মেয়েরা একটু বড় হয়, ওদের হাতে বারবি বা ওই জাতীয় পুতুল পরে, আমার বৌ সব কাজ বাদ দিয়ে পুতুলদের জন্য জামা-কাপড় সেলাই করতো। ওর সেলাইয়ের উপর কলেজের ডিগ্রীটা ঐ একটা কাজেই লেগেছিলো। আমিও কখনো নিজে, কখনো কাজে যে সব মিস্ত্রীরা আছে ওদের বলে কাঠ দিয়ে চেয়ার, টেবিল, খাট - কত কিছুই না তৈরী করে দিতাম। এটাও মনে হয় সেই একাত্তরের উত্তরাধিকার।
যদিও অনেক আগেই ঠাকুর দেবতা আর আমার পথ দুটি দিকে বেঁকে গেছে, এখনো ঐসব দিনের কথা মনে পড়লে ভালোই লাগে। পূজা-পার্বন মানেই অনেক রকমের খাবার, বাড়ী ভরা আত্মীয়-স্বজন। ঢাক, ঢোল, শঙ্খধ্বনি, মায়েদের উলুধ্বনি - এক কথায় অনাবিল আনন্দ। তাছাড়া আমাদের যেটুকু ধর্ম শেখ বা করা, সেটা ওই রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনেই, যেখানে দেবতা-দানব আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। যেখানে এরা সবাই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বা শক্তির পূজারী। নিজেরাই যুদ্ধ করছে - কখনো ন্যায়, কখনো অন্যায় যুদ্ধ, আর এই যুদ্ধে সব সময়ই শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হচ্ছে। এখন যদিও রামকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় সীতাকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে বলায় বা বনবাস দেয়ায়, আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়, রাম আসলে কি - নারী বিরোধী না প্রজা বৎসল? তার চেয়েও বড় কথা সেখানে কোনো বিধর্মী ছিল না, তাই অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ গড়ে উঠতে পারে নি। কে জানে, রামায়ণ-মহাভারত যদি বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা ইসলাম ধর্ম আবির্ভাবের পরে লেখা হতো, তাহলে এই দুই মহাকাব্য তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারতো কিনা?
তখন কি ঈশ্বরে বিশেষ করতাম? হয়তো বা। আসলে মানুষ খুবই অসহায়। শুধু মাত্র পাশের বাড়ীর সংখ্যালঘু বা শিশু বা নারীদের সামনে সে দানবের মতো শক্তিশালী। কিন্তু একটা ঝড় উঠুক, অমনি লেজ গুটিয়ে ভগবানের পায়ে নিজেকে সপে দেয় সে। আমরা শক্তের ভক্ত আর নরমের যম। মানুষ যখন নিজে বিপদের মোকাবিলা করতে পারে না বা করতে চায়না, তখনই সাহায্য চায় তার চেয়েও বড় কারো। ছোট বেলায় বড় ভাই বা বাবা তার পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু সমস্যা বড় হলে? সে তখন আশ্রয় নেয় বড় শক্তির কাছে। যারা ভগবানে বিশ্বাস করে, তারা নিশ্চিন্ত মনে নিজের সমস্ত সমস্যা তার কাঁধে তুলে দিয়ে শান্তি পায়। আর আমি? এক সময় যখন দেখলাম বাবা আর সব সময় আমার পাশে দাঁড়াতে পারছে না, আমি হাটলাম উল্টো পথে। পরে বাবা মারা যাবার পর, এখন কোনো প্রশ্ন জাগলে বাবাকেই স্মরণ করি, মনে মনে কথা বলি, কারণ জানি বাবা কখনোই আমার খারাপ চায় না। এটা আসলে নিজের সাথেই সংলাপ।
মাঝে খানে দেবতাদের নিয়ে কোনো মাথা ঘামাতাম না। তবে ইদানিং কালে যখন দেবতাদের ঘর পুড়তে দেখি, দেখি দেবতাদের ঘর ছাড়া হয়ে যেতে, অথবা কোনো দেবতার ছিন্ন মস্তক ভুলুন্ঠিত হয়ে থাকতে, খুব মায়া হয় ওদের জন্য। ভালো কতটুকু করেছে জানি না, তবে কারো ক্ষতি তো ওরা করে নি। তার পরেও কতই না নাজেহাল হতে হয় ওদের, আর সেই সব মানুষদের যারা সব কিছুর পরেও এই দেবতাদের আঁকড়ে থাকে, দেবতার অসীম করুনায় আর শক্তিতে বিশ্বাস করে। একাত্তরেও এমন হতো, আজও হয়। ক্যালেন্ডারের পাতা ঝরে পরে, দেশের নাম বদলায়, বদলায় দেশের চেহারা, কিন্তু মানুষ বদলায় না।
দুবনা, ১১ নভেম্বর ২০১৬

বিশ্বাসীরা একবারও ভাবেনা জগৎসংসার আর এইসব মানুষ সব এক সৃষ্টিকর্তার নির্মাণ। এদিক থেকে আমরা ভাল আছি ভালবাসি মানুষ ও প্রকৃতি। ভাল লিখেছ।
ReplyDeleteওদের বিশ্বাসটা স্বর্গ লাভের জন্য, অন্যদের কথা ভাবার সময় কোথায় ওদের?
Delete