একাত্তরের কথা বলতে গেলে অনেক কথাই চলে আসে। আপাত
দৃষ্টিতে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হলেও আসলে তা নয়। মানুষের চলার
পথ খুব সরু, বক্র রেখার মত। কিন্তু সেই পথের
দু’দিকে ছড়িয়ে থাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে সে কি সব সময় তাকিয়ে দেখে, যদিও এই
প্রান্তরই ধারন করে তার চলার পথ, অনবরত যোগায় তাকে বেঁচে থাকার খোরাক? এ প্রসঙ্গে
আমার প্রথম ছবি প্রদর্শনীর কথা মনে পড়ে গেল। এটা ছিল ২০০৭
সাল। বিভিন্ন কারনে আমি তখন ছবি তুলতাম মুলত বাড়ির আশেপাশে। প্রদর্শনীতে
অনেক ছবিই ছিল অফিসে যাবার রাস্তার পাশে তোলা। কলিগরা যখন
জানল যে ছবিগুলো দুবনাতেই তোলা, শুধু তাই নয়, যে পথ দিয়ে ওরা প্রতিদিন যাতায়াত
করে, তার পাশেই তোলা, ওদের চক্ষু তো ছানাবড়া, বলে “আমিও তো সেদিন ওখান দিয়েই
গেলাম, কই দেখিনি তো।“ জীবনটাই আমাদের এমন, অনেকটা অন্ধভাবে
এগিয়ে চলি লক্ষ্যের দিকে। ফলে জীবনের বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই না। দেখতে পাইনা যে
এর বাইরেও অনেক পথ, অনেক মত আছে। ফলে হয়ে উঠি পরমতের প্রতি অসহিষ্ণু। আজ যে
পৃথিবীর দেশে দেশে মৌলবাদের উত্থান, সেটাও মনে হয় জীবনের বৈচিত্র্য মনে নেবার,
মেনে নেবার অপারগতা। আর এই অপারগতার প্রধান কারন সুস্থ্য শিক্ষা
ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
আজকের বাংলাদেশ আর একাত্তরের বাংলাদেশের দিকে তাকালে, এই
দুটো সময়ের সমাজকে তুলনামুলক বিচার করলে কিছু জিনিষ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আমার খুব
স্পষ্ট মনে আছে, ঐ সময় দেশের সিংহভাগ মানুষ চেয়েছিল যেভাবেই হোক পাকিস্তানের,
আইয়ুব খানের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে। চেয়েছিল স্বাধীন দেশ। কিন্তু
অধিকাংশ মানুষেরই এই মুক্তির ধারনা ছিল একেবারে ব্যাক্তিগত। অধিকাংশ
মানুষই ভাবতো দেশ স্বাধীন হলেই সোনার বাংলা গড়ে উঠবে আপনা থেকেই। তাছাড়া দেশটা
স্বাধীন হলেও তার চেহারাটা ঠিক কেমন হবে সে সম্পর্কে ধারনা ছিল খুব কম লোকেরই। ফলে ২৫ শে মার্চের
কাল রাতে পাকবাহিনীর অতর্কিত হামলা মানুষকে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে
মুক্তির সংগ্রামে নামতে বাধ্য করলেও তাকে অন্যের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়তে
শেখায় নি।
অনেক পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠন করতে গিয়ে এরকম অনেক
ঘটনারই মুখোমুখি হতে হয়েছে। সংগঠন, ক্লাব এসব করে সমমনা লোকগুলো যাদের কোন অভিন্ন
লক্ষ্য থাকে। তার পরেও দেখেছি একই লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তুললেও এসব জায়গায় কেউ আসছে কিছু শিখতে, কেউ আসছে
সমাজের জন্য কিছু করতে, আবার কেউ-বা আসছে স্রেফ সময় কাটাতে। এ প্রসঙ্গে আমার ছোট
বেলায় “আমার জীবনের লক্ষ্য” রচনার কথা মনে পড়ে। আমরা সবাই এসব রচনা লিখতাম রচনা বই
পড়ে। আর ওখানে তখন দুটো মাত্র লক্ষ্য থাকতো – ডাক্তার হওয়া বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া।
কারো ইচ্ছে বা যোগ্যতা আছে কিনা সেটা বড় কথা নয়, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে না
চাওয়াটাই যেন মস্ত এক অপরাধ। আর এসব রচনার এক বিরাট অংশ জুড়ে থাকতো এই সব পেশার
মাহাত্ম্য কীর্তন। কে জানে, ছোট বেলায় হয়তো অনেকে এসব পেশা এভাবেই দেখতো, তবে
সময়ের সাথে সাথে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের সামাজিক আর অর্থনৈতিক অবস্থানই বোধ হয়
সামনে চলে আসতো। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি কেউ শুধু ডাক্তারই থেকে
যাচ্ছে, কেউ বা হচ্ছে টাকা উপার্জনের মেশিন আবার কেউ-বা সমাজসেবী। কোন কাজে যোগ
দেবার আগে সবার এক অভিন্ন সাধারণ লক্ষ্য থাকলেও প্রতিটি মানুষেরই থাকে নিজ নিজ
লক্ষ্য। আর একটা পর্যায় পর্যন্ত কমন উদ্দেশ্যটা প্রধান থাকলেও পরবর্তীতে
ব্যাক্তিগত লক্ষ্যটাই সামনে চলে আসে, যা কিনা আসল লক্ষ্যে পৌঁছুতে বাঁধার সৃষ্টি করে। একই ভাবে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে দেশের
জনগনের প্রায় সত্তরভাগ মানুষ অংশ নিলেও অধিকাংশই ছিল সেই দলে, যারা নিজেদের সময়
ব্যয় করে সামাজিক কাজে যায় না। আর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে ব্যাপক পরিমান লোক নিজ থেকে
দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে না এলে কোন কিছু করাটাও কষ্টসাপেক্ষ হয়ে পড়ে। আমার যতদুর মনে
পড়ে, ঐ সময় বাড়িতে যুদ্ধ শেষ হলে কি করে আবার সব
কিছু নতুন করে শুরু করতে হবে, ব্যাবসা-বানিজ্য কি করে দাড়া করাতে হবে, এসব কথাই
হত। শুধু আমাদের বাবা-কাকারা নয়, অন্যান্য বয়স্ক লোকেরাও এ ভাবেই ভাবতো। হয়তো এটাই
নিয়ম। হতে পারে এর আগে সেই চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে তারা এই অভিজ্ঞতাই লাভ করেছিল। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি
পেলেও যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলার সাধারন খেটে খাওয়া মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে
দাঁড়িয়েছিল সে স্বপ্ন তাদের কোন দিনই পুরন হয় নি। আসলে পাকিস্তানের ধারনাটা যতটা
না ছিল ভারতের সাধারন মুসলিম প্রজাদের জন্য, তার চেয়ে বেশি ছিল উত্তর ভারতের
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোর জন্যে। তাই তো গোরার দিকে বাংলায়ও মুসলিম লিগ মূলত
উচ্চ শ্রেনীর মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও পরবর্তীতে এই সাধারন মানুষই ভোট
দিয়ে পাকিস্তানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে, একমাত্র
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার মাধ্যমে পশ্চিমা শাসকরা তাদের সে স্বপ্ন ভেঙ্গে
চুরমার করে দেয় পাকিস্তানের একেবারে জন্মলগ্ন থেকেই।
জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ মাক্স ওয়েবারের মতে “রাজনীতিকে
পেশা হিসেবে বেছে নেবার দুটো পথ আছে – হয় রাজনীতির স্বার্থে জীবন যাপন করতে হবে,
নয়তো রাজনীতি থেকে ফায়দা লুটতে হবে।“ স্বাধীনতাপূর্ব আমাদের দেশে অন্তত বিরোধী দল
গুলো পড়তো প্রথম পর্যায়ে। অন্তত এসব দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী একটা আদর্শের জন্য
রাজনীতি করত। স্বাধীনতার পরেও অনেক দিন পর্যন্ত সেটা ছিল, যদিও সরকারী দল সব সময়েই
কোন না কোন ভাবে রাজনীতি থেকে ফায়দা লুটেছে। তবে বর্তমান বাংলাদেশে, শুধু
বাংলাদেশে কেন, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই রাজনীতি এক লাভজনক পেশায় পরিনত হয়েছে।
সরকারী বা বিরোধী সব দলই এখন রাজনীতি থেকে ফায়দা লুটতে চায়, ফলে রাজনীতি আজ যতটা
না আদর্শ, তার চেয়ে বেশি পন্য। আর যেখানেই বেচাকেনার প্রশ্ন, সেখানেই দুর্নীতি। আর এই দুর্নীতি থেকেই বিভিন্ন সংকীর্ণতা,
দলাদলি, রেষারেষি। এর থেকেই বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভরাডুবি। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির
উত্থান। কিন্তু কে এমন হল? যে দ্বিজাতি তত্ত্বকে ত্যাগ করে, যার বিরুদ্ধে লড়াই করে
বাংলাদেশ জন্ম নিল, মাত্র চার বছরের মধ্যেই সেই তত্ত্ব ধীরে ধীরে কি করে ফিরে এলো
এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে?
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির দিকে একটু খেয়াল করলেই আমরা
দেখবো জনমত গঠনে প্রচারের গুরুত্ব। এমনকি সামান্য পাউডার পর্যন্ত মারণাস্ত্রে
পরিনত হতে পারে প্রচারের কল্যানে। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটা দেশ। অথবা একের পর এক
বিভিন্ন দেশে ঘটতে পারে সামাজিক বিপ্লব। শেখ মুজিবের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” থেকে আমরা
জানি কিভাবে তারা এ দেশের মানুষকে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রচার ততটা ছিল না। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের আগ পর্যন্ত
এ দেশের ভবিষ্যৎ দেখা হতো পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই। কিন্তু পশ্চিমা শাসকদের
হঠকারিতায় এ দেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, লাখো লাখো প্রানের বিনিময়ে ছিনিয়ে
আনে স্বাধীনতা। কিন্তু এ ছিল অদ্ভুত এক যুদ্ধ। একদিকে ছিল বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে
লড়াই, যারা কিনা এক অর্থে ছিল আমাদের স্বদেশী। আরেক দিকে ছিল পশ্চিমাদের সাহায্যকারী
দেশীয় দালাল। সেদিক দিয়ে এটা গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে পরে। অর্থাৎ এটা ছিল এক দিকে
গৃহযুদ্ধ, অন্য দিকে বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর ফলে যুদ্ধে পরাজিত
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিকই, দেশীয় দালালরা তা করেনি।
বিদেশী শত্রুরা এ দেশ ছেঁড়ে চলে গেলেও ওদের স্থানীয় দোসররা রয়ে গিয়েছিল। আর ছিল
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পক্ষে, নতুন গনতান্ত্রিক,
ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারের তাৎপর্য ছিল
আরও অনেক বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস পড়ে জেনেছি, সেখানে কিভাবে গ্রামে গ্রামে
মিটিং করে জনমত গড়ে তোলা হয়েছে, আবার প্রয়োজনে অস্ত্রহাতে সোভিয়েত ব্যাবস্থা রক্ষা
করা হয়েছে। আমার কেন যেন মনে হয় এই কাজটা তখনকার সরকার বা স্বাধীনতার পক্ষের
রাজনৈতিক শক্তি ঠিক ভাবে করতে পারে নি। যার ফলে মাত্র চার বছরের মাথায় রাজনীতির
চাকা উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিলেও তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠেনি শক্তিশালী প্রতিরোধ।
আসলে ঐ একাত্তরের দিনগুলোতে কি আমাদের এলাকায় তেমন
প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিলো? মনে হয় না। হাতে গনা দু’য়েকটা যুদ্ধ হয়েছিল এদিকটায়। একটা
বড় ধরনের যুদ্ধ হয়েছিল সিঙ্গাইরের গোলাইডাঙ্গিতে। এছাড়া হরিরামপুরের বাল্লায় যুদ্ধ
হয়েছিলো। তাই বলতে গেলে পাকবাহিনী আর তার দোসররা মানিকগঞ্জ এলাকায় বিনা প্রতিরোধেই
ঘোরাফেরা করেছে আর চালিয়ে গেছে তাদের
ধ্বংসযজ্ঞ। হিন্দুরা অধিকাংশই পালিয়ে গিয়েছিল বাড়িঘর ছেঁড়ে, বিশেষ করে যাদের
বাড়িঘর ছিল পাকবাহিনী যেখানে সহজে আসতে পারে সে সব এলাকায়। মুসলমানদের অধিকাংশই
ছিল নিজ নিজ এলাকায়। কিছু কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও তারা চলে গিয়েছিল সীমান্ত
এলাকায়। কিছু লোক নাম লেখায় রাজাকারদের খাতায়। আর বিরাট অংশ এক ধরনের ভয়ভীতি বুকে
নিয়ে দিন কাটায় নিজের এলাকায়। পাকবাহিনীর প্রতি তাদের সমর্থন না থাকলেও পাছে দেশীয়
দোসররা তাদের ধরিয়ে দেয় এই ভয়ে তারা নিরপেক্ষ থেকেছে। আমার মনে হয় এই চিত্র তখনকার
বাংলাদেশের অনেক এলাকায়ই ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশকে এরা যেমন অনায়াসে বরন করে
নিয়েছে, যুদ্ধে হারলে এরা ঠিক তেমনি ভাবেই পাকিস্তানের রাজনীতির মূলধারার সাথে,
মানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে মিলেমিশে যেতো।
ফিরে আসি আবার একাত্তরে। যতই বিজয় কাছে এগিয়ে আসছিলো
বাবা, কাকা, জ্যাঠামশাই, মাখন কাকা, কালু ভাই, আজিজ ভাই, কুদ্দুস ভাই – এদের
কথাবার্তায় ভবিষ্যৎ ভাবনাও ততই বেশি করে আসছিলো। এতদিন পরবাসে থাকলেও আমরা ছিলাম
বন্ধুদের মাঝে যারা যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই বিপদে আপদে আমাদের পাশে ছিল। যুদ্ধ
শেষে আমাদের ফিরে যেতে হবে নিজের বাড়িতে, নতুন করে শুরু করতে হবে শান্তির সময়ে
বেঁচে থাকা। আবার পাশাপাশি বাস করতে হবে তাদের সাথে যারা যুদ্ধের সুযোগে আমাদের
বাড়িঘর লুট করেছিলো, যাদের মৌন সম্মতিতে গ্রামের হিন্দুরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে
গিয়েছিল। আমরা যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করিনি, কিন্তু যুদ্ধ যখন এসেই পড়লো তখন বেশ
তাড়াতাড়িই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পেরেছিলাম। আমরা দীর্ঘ নয় মাস শান্তির জন্য অপেক্ষা
করেছি, কিন্তু শান্তি যখন দরজার কড়া নাড়ছিল, মনে হলো শান্তির জন্য আমাদের
প্রস্তুতি ছিলো আরও অনেক অনেক কম।
দুবনা, ০৮ ফেব্রুয়রী ২০১৭

No comments:
Post a Comment