আমাদের জীবনে প্রতিদিনই
নানা ঘটনা ঘটে। সূর্য ওঠে, ঋতু বদলায়। ছোট শিশু বড় হয়। কিন্তু সব যেন আমাদের চোখের
সামনে ঘটেও চোখের আড়ালেই থেকে যায়। আমরা এসব জিনিষ ধরেই নেই ভবিতব্য, যেখানে
আমাদের কোন হাত নেই, যেগুলো আমার সাথে ঘটলেও ঘটছে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই। এই
যে ভাগ্যের কাছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া – এটা আমাদের নিষ্ক্রিয় না
করলেও অনেক প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখে। যদিও স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই বলেছেন
আমি কে, কেন জন্ম, কিসে
বা কল্যান
এইরূপ প্রশ্ন করি লভ
তত্ত্ব জ্ঞান
সে জ্ঞান লভিলে তব মোহ
কেটে যাবে,
তুমি আমি জীব জগতে
পার্থক্য না রবে।
কিন্তু আমরা কি কখনও তা
করি? আমরা কোন প্রশ্ন না করেই জীবন কাটিয়ে দেই। একাত্তর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমি
আবার সেটা অনুভব করলাম, যদিও জানতাম মাঝে মধ্যে নিজেকে, নিজের জীবনকে প্রশ্ন না
করলে নিজেকেই ঠিক জানা হয়ে ওঠে না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ফটোগ্রাফির কথা। ২০১২ সালে
আমি “ছোটবেলার সন্ধানে” নামে একটা একক ছবি প্রদর্শনী করি। এটা ছিল দুবনায় আমার
তৃতীয় একক প্রদর্শনী। যার ফলে দুবনা বা আশেপাশের দুয়েকটা শহরের ফটোগ্রাফারদের সাথে
আলাপ ছিল। ঐ সময় এক পরিচিতা ফটোগ্রাফার যিনি
তখন বাচ্চাদের নিয়ে “জ্যান্ত টুপি” নামে এক পত্রিকা বের করতেন, আমাদের ক্লাবে আসেন
আমার সাক্ষাৎকার নিতে। কথার এক পর্যায়ে উনি জিজ্ঞেস করেন
- - আচ্ছা বিজন, তুমি কেন
ফটোগ্রাফি কর? এটা তো তোমার পেশা নয়। জানি এটা হবি। তারপরেও, ঠিক কেন তুমি
ফটোগ্রাফিকেই হবি হিসেবে বেছে নিলে?
পদার্থবিদ্যার ছাত্র,
তাই সারা জীবন এই কেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কেটে গেছে আমার। তারপরেও বেশ অপ্রস্তুত
বোধ করলাম নিজেকে। তবে কথা যেহেতু হচ্ছিলো রাশানে, আর রাশিয়ান আমার মাতৃভাষা নয়,
এটাকে আমি ব্যাবহার করলাম একটু সময় নিয়ে ভেবে উত্তর দেবার জন্য। বললাম দেখো
-
- -আমি প্রথন যখন ছবি তোলা
শুরু করি ১৯৮৩ সালে, তখন কারন ছিল একটাই, যখন দেশে ফিরে যাবো, এই দেশের স্মৃতি
সাথে করে নিয়ে যাওয়া, আজকের আমিকে সুদুর ভবিষ্যতে দেখা। তাছাড়া তখন ছবি তুললে তো
অনেক বন্ধুরাই সাথে থাকতো, তাই ওটা ছিল এক ধরনের ডাইরি বা স্মৃতিচারনের উপকরন।
-
-পরে সময়ের সাথে সাথে
দেখলাম, আমি আসলে অন্য ফটোগ্রাফারদের মত ছবি তুলছি না, মানে আবহাওয়া দেখে, জায়গা ঠিক
করে। সব নির্ভর করে আমার মুডের উপর। ছবি তুলতে ইচ্ছে হল, আমি ছবি তুলি। তা সে প্রকৃতি
হতে পারে, মানুষ হতে পারে অথবা স্টিল লাইফ বা বিমূর্ত ছবি। আমার জন্য ফলাফলের থেকেও
ঐ প্রসেসটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলতে পার, আমি ছবি তুলে ভবিষ্যতে আমার মানসিক
অবস্থা বা মুড কি ছিল সেটা দেখার জন্য।
-
-আমি দুবনায় এখন একা
থাকি। আগে যখন ফ্যামিলি নিয়ে থাকতাম, তখনও মাঝে মধ্যে স্বদেশীদের অভাব বোধ করতাম।
যখন খুব একা লাগে, আমি বই পড়ি বা ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ক্যামেরা আমার খুব
ভালো বন্ধু, আমার একাকীত্বের সঙ্গী। বলে পার, আমি ছবি তুলি একাকীত্ব থেকে পালাতে।
-
-ইদানীং মাঝে মধ্যে যাই
বিভিন্ন আড্ডায়, অনুষ্ঠানে। আড্ডা বলছি এ জন্যে আমি মূলত যাই বন্ধুদের সাথে দেখা করতে।
ছাত্র জীবনে আড্ডায় গিয়ে এক কোনে বসে বই পরতাম। আবার যখন হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করত,
চলে যেতাম আরবাত স্ট্রীটের জনারন্যে হারিয়ে যেতে। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য, অথচ
তুমি একা, কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি কাউকে চেন না। এখনও কোন আড্ডায় বা অনুষ্ঠানে
গিয়ে যদি মানুষের ভীরে হাপিয়ে উঠি, হাতে তুলে নেই ক্যামেরা। আমি আবার একা, একান্ত
নিজের। হ্যা, আমি ছবি তুলি নিজের ভেতর হারিয়ে যেতে।
কথাগুলো বলা শেষ হলে
বুঝলাম, এরকম প্রচুর ঘটনাই আমাদের জীবনে ঘটে, যার সম্পর্কে আমরা জানি না, মানে ঠিক
প্রশ্ন করে উত্তরটি আমরা খুঁজিনি। তাই লেখার এক পর্যায়ে যখন দেখলাম, নিজের
অজান্তেই একাত্তর কিভাবে আমার সাথে একাকার হয়ে গেছে, একটু অবাকই লাগলো। তাই শুরু
হল প্রশ্ন করা, শুরু হল উত্তর খোঁজা।
একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধ আর বৈলতলার দিনগুলি আমার পরবর্তী জীবনে এক সুদুর প্রসারী প্রভাব
যে রাখে সে ব্যাপারে আমার মোটেই কোন সন্দেহ নেই। তবে ঐ দিনগুলি আমায় পিছে ফিরে না তাকানো শিখিয়েছিল নাকি শিখিয়েছিল কোন অবস্থাতেই জীবনের
প্রতি বিশ্বাস না হারাতে, যে কোন অবস্থাতেই যতদুর সম্ভব সুখী হতে, সেটা আমি হলপ করে
বলতে পারব না। আগেই বলেছি, জীবনে বার বার আমি
ফেলে আসা জায়গাগুলোতে ফিরে যেতে চেয়েছি, আর প্রতি বারই নতুন কোন জায়গাকে ভালবেসে ফেলেছি,
ঘর গড়েছি নতুন দেশে।
অনেক আগে কখনো সখনো মন খারাপ করতো ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য। এখন আর তেমন হয় না, সব সময় ভালো থাকি, কেন না ভালো থাকার কোন
বিকল্প খুঁজে পাই নি। মন খারাপ থাকলে খারাপটা লাগে শুধু নিজেরই আর কষ্ট পায় খুব কাছের
মানুষগুলো। যখন মন খারাপ করার অনেক কারন
থাকে, আমি নিজেকে বলি, এই যে আজ পৃথিবীতে প্রায় সাত বিলিয়ন লোক বাস করছে, তাদের কয়েক
বিলিয়ন আমার থেকে অনেক খারাপ অবস্থায় আছে, আবার কয়েক বিলিয়ন আছে ভালো। কই, এই বিলিয়ন
বিলিয়ন লোক তো অভিযোগ করছে না, মন খারাপ করছে না? সমস্যা – সে তো সমাধানের জন্য, তার কথা ভেবে মন
খারাপ করবার জন্য নয়। মনে পড়ে সেই একাত্তরের দিনগুলোর কথা। কোন কোন দিন, যখন এলাকায়
পাক সেনা বা রাজাকার আসতে পারে এমন গুঁজব উঠতো, সাবাই খুব সতর্ক থাকতো, যাতে প্রয়োজনে
দ্রুত বাড়ি ছেঁড়ে যাওয়া যায়। কাজের ছলে বা
খেলার ছলে সবাই চারিদিকে দৃষ্টি রাখতো। তখনও বাবাকে বলতে শুনতাম “যা হয়, মঙ্গলের
জন্যই হয়।“ এইযে শত নেগেটিভের মধ্যে পজিটিভ কিছু খুঁজে পাবার চেষ্টা করা, এটা কজনই
বা পারে?
কথায় বলে, বিপদ যখন আসে
চারিদিক থেকেই আসে। আমরা যুদ্ধের কারনে পালিয়ে এসেছিলাম বৈলতলা, কিন্তু আমরা থাকতে
থাকতেই ধলেশ্বরীর ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে কত লোক যে আশ্রয় নিয়েছিলো মাখন কাকাদের
পাড়ায়! ঐ লোকগুলোর প্রত্যেকের ছিল নিজের নিজের যুদ্ধ – প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সত্যি
বলতে কি, বয়সের কারনেই হোক আর আর অবস্থাপন্ন পরিবারে জন্ম নেবার কারনেই হোক,
একাত্তরের আগ পর্যন্ত জীবন সংগ্রাম যে কি সেটা ঠিক বুঝতাম না। ঐ প্রথম খুব কাছ
থেকে এই লড়াই দেখলাম। হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই, নিজের ভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই,
প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই। কোন কোন লড়াই ছিল
একান্ত ব্যাক্তিগত, কোনটা সমষ্টিগত। নানা ধরনের এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই একটু একটু
করে গড়ে উঠছিলো বাংলাদেশ, লাখো লাখো শহীদের পুন্য রক্তে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে পূর্ব
দিগন্তে ধীরে ধীরে আড়মোড়া দিচ্ছিল লাল সূর্য, যার আভাষ আমরা পাচ্ছিলাম ডিসেম্বরের
প্রথম থেকেই।
১৯৭১ থেকে ২০১৭ – দীর্ঘ ৪৬
বছর। কিন্তু চারিদিকে তাকালে মনে হয়, ইতিহাস শুধুই অতীত কাহিনী যা থেকে শিক্ষা
নেবার কিছু নেই, অন্তত শিক্ষা নেবার কোন ইচ্ছাই নেই কারো। আধুনিক যুগে অন্যতম
শিক্ষনীয় ঘটনা ছিল ভারত বিভাগ। যে সমস্যার জন্য এই ভাগাভাগি তার সমাধান আজও হয়নি।
বরং রাজনীতির যাঁতাকলে প্রান দিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু কেউই শিক্ষা নেয় নি।
ভেঙ্গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভেঙ্গেছে যুগোস্লাভিয়া, কত লোক যে হারিয়েছে প্রান, কত
মানুষ হয়েছে দেশান্তরি – তার খবর রাখে কে? যে ভাষার প্রশ্ন যুগে যুগে দেশে দেশে ডেকে
এনেছে যুদ্ধ, জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন দেশ – সেই ভাষা নিয়ে আজও চলছে রাজনীতি। আজও
কোন প্রিবালটিকে লাখো লাখো মানুষ মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না, শিক্ষা পায় না। আজও
কোন ইউক্রাইনে জনগনের চল্লিশ শতাংশ মানুষ তাদের মাতৃভাষার জন্য পাচ্ছে না সরকারী
ভাষার মর্যাদা – জ্বলে উঠেছে দনবাছ, দিনের পর দিন মরছে নিরীহ অসহায় বৃদ্ধ আর শিশু।
যে ভাষার জন্য লড়াই করে একদিন বাংলাদেশের জন্ম, আজ সে ভাষাই অবহেলিত,
সাম্প্রদায়িকতা আর ভোটের রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে এই ভাষার দিকপালদের লেখা আজ পাঠ্যপুস্তক
থেকে বিতারিত। অনেক দিন আগে লন্ডনে বসবাসকারী এক প্রভস্লাভ (অর্থোডক্স) পাদ্রীর
লেকচার শুনছিলাম। উনি বলেছিলেন, ধর্ম পালনে বাঁধা সৃষ্টির মাধ্যামে সোভিয়েত সরকার
ঈশ্বরকে গৃহহীন করেছিল। আমার মনে হয় পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতা এনে আমরা বাংলা
ভাষাকেই নির্বাসনে পাঠাচ্ছি। অথচ কত স্বপ্নই না ছিল একাত্তরের সেই দিনগুলোতে। আমার
যতদুর মনে পড়ে সে সময় আমাদের শুধু একটাই অপশন ছিল – স্বাধীন বাংলাদেশ। আমি কখনই
কাউকে বলতে শুনিনি যুদ্ধ শেষ হবে আবার পাকিস্তানে শান্তি ফিরে আসবে। তাই আজ যখন
ভাষার প্রতি এই অবিচার দেখি, যখন দেখি সেই পাকিস্তানের মতই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে
ভরে গেছে দেশের আকাশ বাতাস তখন মনে হয়, একাত্তর কি সত্যি ছিল, নাকি এটাও আমার
কল্পনা।
দুবনা, ০১ ফেব্রুয়ারী
২০১৭

No comments:
Post a Comment