স্বনামধন্য
রুশ লেখক লেভ তলস্তয় তার বিখ্যাত উপন্যাস “আন্না কারেনিনা” শুরু করেছেন এই বলে যে
“সব সুখী পরিবার দেখতে একে অন্যের মতো, প্রতিটি দুঃখী পরিবার দুঃখী নিজের নিজের মতো।“ যতদিন পর্যন্ত যুদ্ধের ডামাডোল ছিল, ছিল আশংকা, প্রতিটি
পরিবার, প্রতিটি মানুষ তার নিজের নিজের মতো করে যুদ্ধের মোকাবেলা করেছে, বেঁচে থেকেছে
প্রতিকুল পরিবেশে। কিন্তু যুদ্ধ যতই শেষের দিকে যাচ্ছিল, সবার আনন্দ যেন একই
রকম ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিলো, হঠাৎ সবাই যেন আবার নতুন করে এক পরিবারভুক্ত মনে করছিলো
নিজেদের।
মনে
পড়ে মার্চের সেই দিনগুলোর কথা, যখন ঢাকা থেকে বানের জলের মতো মানুষের ঢল নেমেছিল আমাদের
রাস্তাঘাট দিয়ে। তখন হিন্দু-মুসলমান, ধনী-দরীদ্র নির্বিশেষে এলাকার সব মানুষ
তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। যুদ্ধের প্রথম দিকে সারাদেশ এক হয়ে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা
করেছিলো হানাদারদের বিরুদ্ধে। কিন্তু দিন যতই গড়িয়েছে, সেই ঐক্যে ধরেছে ভাঙ্গন, কিছু মানুষ
যোগ দিয়েছে পাকবাহিনীর সাথে, নাম লেখিয়েছে আল-বদর আর রাজাকারদের দলে। অনেকে মনে মনে মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন করলেও বাহ্যত থেকেছে নিরপেক্ষ। সবাই নিজের নিজের মতো করে যাপন করেছে দুঃখভরা এই দিনগুলো। কিন্তু ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই,
যখন ভারতীয় সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই শুরু করে, সাধারন মানুষ
মুক্তিবাহিনীর বিজয়ে হয়ে উঠে অনেক বেশি আশাবাদী। দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে
তাদের মনোবল হয় অনেক বেশি দৃঢ়। আর তাই তখন তারা আবার সব সুখী পরিবারের মতো একসাথে উপভোগ
করতে প্রস্তুত হয় বিজয়ের আনন্দ। বাড়িতেও তখন একটাই প্রশ্ন “কবে?”
মানুষ
যখন কোন কজে নামে প্রথম কিছুদিন প্রচণ্ড উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করে ফলের। অপেক্ষা যখন দীর্ঘ হয়, আসে হতাশা। তখন তার একটাই লক্ষ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা শেষ করা। আর যখন একদিন গন্তব্যে পৌঁছে যায় – হঠাৎ যেন আকাশ ভেঙ্গে
পরে মাথার উপরে। সে আর নিজেকে খুঁজে পায় না নতুন বাস্তবতায়। অপেক্ষার ক্লান্তি তাকে পেয়ে বসে, লক্ষ্যহীন ভাবে সে নিজের পায়ের নীচে মাটি খুঁজতে থাকে, খুঁজতে থাকে কোন কাজ যা দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়। যারা কিনা কখনো পিএইচডি বা ডিএসসি থিসিস ডিফেণ্ড করেছেন, এই অনুভুতি তাদের খুব
পরিচিত। একাত্তরের শেষ দিনগুলোতেও যখন বিজয় এলো হাতের মুঠোয় আমাদের অবস্থা ছিল অনেকটা সে
রকমই।
যুদ্ধ
শেষ হবার মানে ১৬ ই ডিসেম্বরের কয়েকদিন আগে থেকেই বাতাসে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের গন্ধ ভাসছিলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ ব্যাপারে খবর আসছিলো। তখন সারা দেশ থেকে পাকবাহিনী
ঢাকার দিকে ফিরছিলো। যতদুর মনে পরে ঐ সময় ওদের কিছু দল আমাদের এলাকায় মুক্তিবাহিনীদের
দ্বারা আক্রান্ত হয়, বেধে যায় যুদ্ধ। আসলে একাত্তরের যুদ্ধের শেষ কটা দিন বাদ দিলে এটা কোন রেগুলার
আর্মির সাথে রেগুলার আর্মির লড়াই ছিল না, এটা ছিল সাধারন মানুষের সাথে আর্মির আর তাদের
দেশীয় দোসরদের লড়াই। দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে আর্মির যাবার কোন সম্ভাবনা
ছিল না, সেখানে তারা গেছে আল-বদর আর রাজাকারদের হাত ধরে, আর নির্বিচারে খুন করেছে সংখ্যালঘু
হিন্দু, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের। সারা দেশ জুড়ে এক ত্রাসের রাজ্যত্ব তৈরি করেছে তারা। এই অবস্থায় যখন দেশের বিভিন্ন
জায়গা থেকে মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের খবর আসছিলো, তখন মানুষ ভুলে গিয়েছিল বিপদের কথা। আসন্ন বিজয়ের আনন্দে তারা ছিল মশগুল, নতুন প্রভাতকে, বিজয়ের নতুন সূর্যকে বরন করে
নিতে ব্যস্ত। আর এই সুযোগেই শত্রু আবার ছোবল মারে, বেছে বেছে হত্যা করা
হয় দেশের সবচেয়ে সুযোগ্য সন্তানদের যাদের প্রয়োজন স্বাধীন দেশে ছিল সবচেয়ে বেশি। বিজয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে চিরদিনের মতো
বাংলার আকাশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল এক গুচ্ছ উজ্জ্বল নক্ষত্র। যতদুর মনে আছে বুদ্ধিজীবীদের
নিখোঁজ হয়ে যাবার খবর আমরা পেয়েছিলাম বাড়ি ফেরার পর। তবে অনেকদিন পর্যন্ত বিশ্বাস
হয়নি যে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
শুধু
সুযোগ্য সন্তান কেন, সাধারন মানুষের উপরেও মরন কামড় নেমে আসে ঐ সব দিনেই। যদি ভুল না করি, আমাদের এলাকার কিছু ছেলেও ঐ সময় বৈলতলা এসেছিল আমাদের খোঁজে। পরিচয় দিয়েছিল নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তবে স্থানীয় লোকজন আমরা সে
এলাকা ছেঁড়ে চলে গেছি বলে তাদের অন্য দিকে পাঠিয়ে দেয়। জানি না তারা কতটুকু মুক্তিযোদ্ধা
ছিল আর কতটুকু রাজাকার। সমস্যা হোল, যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে যখন বিজয় মোটামুটি নিশ্চিত
হয়ে গিয়েছিল, তখন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লেখিয়েছিল। আর তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে
বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হয়েছিলো। আসলে গৃহযুদ্ধের এটাই সমস্যা – কে যে কোন দলে বোঝা কঠিন,
বিশেষ করে লোকজন যখন যুদ্ধের গতি দেখে দল বদলায়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, আজও
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধারা বজায় আছে। অনেক লোকজন নির্বাচনের আগে বা পরে দল বদলায় দলের অবস্থা দেখে। এরা সব সময়ই সরকারী দল করে বা অন্যভাবে বললে বিজয়ীর দলে থাকে, যদিও আসল যুদ্ধের
মাঠে এদের খুব কমই দেখা যায়। আজকের বাংলাদেশে কত জামাত-শিবির নেতা-কর্মী যে আওয়ামী লীগের
বিশাল বটগাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করছে
অনুকুল আবহাওয়ার জন্য তার হিসেব কে রাখে?
শেষ
পর্যন্ত ১৬ ই ডিসেম্বর যখন এলো সেকি উত্তেজনা। সবাই রেডিওর চারপাশে বসে অপেক্ষা
করছিল কখন আসবে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর। এটা এখন বুঝি যে এসব ঘটনা
হুট করে ঘটে না, এর জন্যে অনেক খড়কুটা পুড়াতে হয়, আগে থেকেই অনেক বিষয়ে আলচনার মাধ্যমে
সমঝোতায় আসতে হয়। এটা আগে ছিল, যখন যুদ্ধ হতো কোন মাঠে, যুদ্ধের গতি বুঝে কোন
সেনাপতি পালিয়ে যেত বা আত্মসমর্পণ করতো। ঘটতো সেটা ঐ যুদ্ধের ময়দানেই। এখন এমনকি আত্মসমর্পণের মতো
বিষয়েও আগে থেকেই সমঝোতায় আসতে হয় আর জনসমক্ষে যেটা ঘটে সেটা নেহাৎ ফর্মালিটি। যেহেতু এসব ব্যাপারে আমাদের আগে থেকে কিছুই জানা ছিল না, বাড়িতে বিভিন্ন মতামত
দেখা দিল এ নিয়ে। কেউ বললো, এটা একটা ধান্দা, শেষ পর্যন্ত পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে না, শুধু সময় নিচ্ছে।
সব অপেক্ষারই
শেষ থাকে। এই অপেক্ষারও এক সময় শেষ হোল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে লেফটেন্যান্ট-জেনারেল নিয়াজীর
নেতৃত্বে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর এলো ভারতীয় লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার কাছে। সবাই যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। আমরা বাচ্চারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলাম “জয় বাংলা”। যতদুর মনে পরে সবাই ছিল প্রচণ্ড উত্তেজিত। আমাদের বাচ্চাদের হৈচৈ চিৎকার
চেচামিচিতে ভরে উঠলো বাড়ি। মনেই নেই এ উপলক্ষে মিষ্টি খাওয়া হয়েছিল কিনা। মনে হয় না। যুদ্ধের সময় মিষ্টি ছিল সোনার হরিনের মতো। চাওয়া যায়, পাওয়া যায় না। যুদ্ধের আগে মার্চের সেই দিনগুলোতে আমদের বাড়ির সবচেয়ে বড়
আমগাছের উপরে বাঁধা অনেক লম্বা একটা বাশের মাথায় পতপত করে উড়ত কালো পতাকা আওয়ামী লীগের
হাতে ইয়াহিয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর না করার প্রতিবাদে। যদিও যুদ্ধের আগেই বাংলাদেশের
আকাশে লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা উড়েছিল, আমাদের বাড়িতে তখনও কোন পতাকা ছিল না। আমার বিশ্বাস সেটা থাকলে আমরা নিঃসন্দেহে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে এই বিজয়কে
বরন করতাম।
যুদ্ধ
শেষ। তারপরেও কিন্তু ভয় কাটলো না। বড়রা হুট করে বাড়ির দিকে রওনা হোল না। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ঠিকই তাদের দেশীয় দোসররা এখনও সক্রিয়। যুদ্ধ কোন সেনাপতি বা রাষ্ট্রনেতার আদেশে শেষ করা যায়, কিন্তু পারস্পারিক ঘৃণা,
পারস্পারিক অবিশ্বাস কোন নেতার হুকুম মানে না, হঠাৎ করে শেষ হয়ে যায় না। সেই ঘৃণার জের থাকে অনেক দিন। তাই একটু সময় দরকার ছিল, দরকার ছিল নতুন পরিস্থিতিতে মানুষের
মনোভাব দেখা, বাড়ি ফেরা কতটা নিরাপদ সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা। আমরা বাড়ি ছেড়েছিলাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিক দশেক পরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে, এবারে
যুদ্ধ যখন শেষ হোল, আমরা আবার অপেক্ষা করলাম
দিন দশেক। শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের ২৫ – ২৬ তারিখে বাড়ি ফিরে এলাম সবাই। সে গল্প পরে।
মস্কো,
১৮ – ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

No comments:
Post a Comment