যুদ্ধ শেষ। বিজয়ের সূর্য উঠলো বইরাগীর চকে, ঠিক যেমন করে উঠতো যুদ্ধের এই
মাসগুলোতে। স্বস্তি, এক অস্বস্তিকর স্বস্তি চারিদিকে। চারিদিক শান্ত। এক থমথমে
পরিবেশ অজগরের মত পিষছে সবাইকে। কিন্তু কিসের এই থমথমে ভাব – ঝড়ের আগের নাকি ঝড়ের
পরের?
এবার বাড়ি ফেরার পালা। কিন্তু চাইলেই কি আর বাড়ি ফেরা যায়? যুদ্ধ শেষ হয়েছে,
পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু দেশ তো তাই বলে শত্রুমুক্ত হয়নি।
রাজাকার আল-বদররা আত্মসমর্পণ করেনি। এখন তারা ঘুরে বেরাচ্ছে গ্রামে গঞ্জে। কেউবা
শেষ বেলায় মুক্তিবাহিনীর পশাক পরেছে। তাই অপেক্ষা করতে হবে, দেখতে হবে এলাকার
পরিবেশ, শুনতে হবে কি বলছে এলাকার শুভানুধ্যায়ীরা। নয়াই চাচা, সামসু চাচা – এদের
সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাছাড়া হুট করে চলে গেলেই তো চলবে না। সবাই মিলে যাবার
আগে বাড়িঘর গোছগাছ করার ব্যাপার আছে না?
১৮ ই ডিসেম্বর তপনদা ওর বন্ধু ভম্বলকে নিয়ে মানিকগঞ্জ গেল সাইকেলে করে। ভম্বল
মানে লক্ষ্মীনারায়ণ বসাক শশী বসাকের ছেলে। আমরা বৈলতলা আসার কিছুদিন পরে ওরা ওখানে
আসে। থাকতো আমাদের থেকে একটু দূরে, অন্য এক পাড়ায়। ওখানে মদন মামাও থাকতো। আমি
প্রায়ই দউরে চলে যেটা ওদের ওখানে খেলতে। আবার কখনো কখনো তপনদা বা শ্যামলদা আমাকে
বলতো ভম্বলকে দেকে দিতে, আমি মাখন কাকার বাড়ির কনায় দারিয়ে চিৎকার করে ডাকতাম
ভম্বল, ভম্বল বলে। এ জন্যে বারিতে বকাও খেতে হত। এই ভম্বলের মামাই একদিন রাজাকার
নিয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে যে বিষয়ে আগে লিখেছি।
তপনদা গিয়েছিল বেতিলা আর মিতরা। উদ্দেশ্য ছিল পরিচিত এক লোকের সাথে দেখা করা।
২৫ শে মারচ রাতে বাবা নারায়ণগঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটে ফেরার ফেরার আগে তার কাছে অনেক
টাকা রেখে আসে। তপনদা গিয়েছিল ওই তাকার খোজে, কিন্তু গিয়ে শুনে ওই লোককে মেরে
ফেলেছে মিলিটারিরা। পরে ওরা মানিকগঞ্জ হয়ে তরা যায়। তপনদার মুখে শুনেছি, ওই দিন
দেবেদ্র কলেজের মাঠে আ স ম রব বক্তৃতা করে। ওরা দুজনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রবের
বক্তব্য শুনে।
ওখান থেকে দুজনে যায় তরা, বাড়ির অবস্থা দেখতে। গিয়ে দেখে বাড়িঘর আগাছায় ভর্তি।
ওই সময় বর জেঠিমার সাথে দেখা হয় ওদের। সালাম ভাইকে বাড়িঘর পরিষ্কার করার কথা বলে
ওরা ফিরে আসে বৈলতলায়।
উপরের এই কথাগুলো মানে ১৮ ই ডিসেম্বর তপনদার বেতিলা, মিতরা, মানিকগঞ্জ আর তরা
যাবার কথা আমার তপনদার কাছে শোনা। যাই হোক, এর পর থেকেই বাড়ি ফেরার আয়োজন চলতে
লাগলো পুরাদমে। ঠিক হল সবাই এক সঙ্গে না গিয়ে আগে একদল যাবে বাড়িঘর ঠিক করতে, আর
আমরা পরে আসবো, যখন বাড়িঘর বাসের উপযুক্ত হয়। যত দূর মনে পরে প্রথম দলে এসেছিলো
ছোটকাকা, খুড়িমা আর রতন। তাও মনে হয় ডিসেম্বরের ২০-২১ তারিখের দিকে। ব্যবসা তখন
ছিল না। আর জমিজমা ও স্থাবর সম্পত্তির দেখাশুনা করত মুলত ছোটকাকা। মনে হয় এজন্যেই
ছোটকাকা চলে আসে প্রথম।
১৬ থেকে ২৫ শে ডিসেম্বর সে এক অন্তহীন সময়। যারা একটু বয়সে বড় প্রায়ই যাচ্ছে এদিক সেদিক, খবর নিয়ে আসছে এলাকার। আর
আমি? সময় পেলে ছুটে যাচ্ছি বইরাগীর চকে বা হিজলতলায়। ঘুরছি কুমের আশপাশ দিয়ে। তখন
কত যে গান শিখেছিলাম!
শোন একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে উঠে রনি
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ
বিশ্বকবির সোনার বাংলা নজরুলের বাংলাদেশ
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে তার নাই কো শেষ।
আর ছিল
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি ......
আমার মনে হয় ওই দিনগুলো থেকেই আমার গুনগুন করে গান গাইবার অভ্যেস গড়ে উঠে। মনে
আছে, পরে যখন স্কুলে পড়তাম, গান গাইতে গাইতে যেতাম স্কুলে আর প্রতিদিনই দেরী হয়ে যেতো
সময় মত পৌঁছুতে। পণ্ডিত স্যার বাংলা পড়াতেন প্রথম পেরিওডে। বলতেন, জানালা দিয়ে তোমাকে
আসতে দেখে আর গান শুনে প্রেজেন্ট করে দিয়েছি। এখন বাথরুমে, রাস্তায় চলতে চলতে অথবা
কাজের ফাকে নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠি গান। কখনো রুশ, কখনো ইংলিশ তবে বাংলা গানই
বেশি, বিশেষ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত। জানি না কেন যেন সকালে ঘুম থেকে উঠতেই কোন একটা সুর
বেজে উঠে মনে আর ভাঙ্গা রেকর্ডের মত আমি সারাদিন গুনগুন করে ওই সুর ভাজি, কখনো কথা
দিয়ে কখনো সুর করে গাই এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ এগার বার তের
চোদ্দ...... মানে অংক আর কি। ওটা আমার ভালো আসে। আবার কখনো বা যা মনে আসে তাই গাই,
কখনো চোখের সামনে যা দেখি। কথাটা আসল কথা নয়, সুরটাই আসল। আর তাই ছেলে মেয়েরা আমার
সাথে পথ চলতে প্রায়ই বিরক্ত হয়। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, প্রতিবেশীদের বলতে শুনেছি
পাঁচ তলায় আমার গাওয়া ঘুমপাড়ানি গান নাকি একতলার বাচ্চাদেরও জাগিয়ে তোলে, বিশেষ
করে আমি যখন ওদের তাড়কা রাক্ষসীর গল্প বলে হাউ মাউ খাউ বলে গান ধরতাম।
এক বুক আশা নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরলাম ২৫ শে ডিসেম্বর। এর আগে অবশ্য ছোট কাকা, রতন
ওরা বাড়ি এসেছিল সব কিছু ঠিকঠাক করতে। বাড়ি এসে দেখি আমাদের ঘরটা নেই, শুধুই ভিটে পড়ে আছে। আমাদের ঘরগুলো ছিল পোক্ত
করা মানে সিমেন্টের মেঝের উপরে টিনের তৈরি ঘর। চাল, বেড়া সব নিয়ে গেছে,
পড়ে আছে শুধু ভিটেটা। ওখানে জমে আছে বৃষ্টির জল বা ঐ জাতীয় কিছু। তার উপর ভাসছে নোংরা। হঠাৎ যেন বমির ভাব চলে
এলো, গুলিয়ে উঠলো শরীর। ইচ্ছে হলো দৌড়ে চলে যাই বৈলতলায়। মনে হোল এই বাড়ি আমার নয়,
এই গ্রাম আমার নয়। অনেক পর ১৯৮৭ সালে, আমি যখন মস্কো ছিলাম, আমার জ্যাঠামশাই
মারা যায়। অনেক দিন থেকেই ঘরে পড়া ছিল। নিজে ছিল নাম করা কবিরাজ,
অনেক মানুষ বাঁচিয়েছে এই জীবনে, এমন কি ডাক্তাররা যাদের আশা ছেঁড়ে দিয়েছে, তাদের
অনেককেই ফিরিয়ে এনেছে মৃত্যুর থাবা থেকে। তাই নিজে যখন অসুস্থ হয়, ওষুধ
খেতে অস্বীকার করে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকে জ্যাঠামশাই নাকি বলত, আমাকে
কোথায় নিয়ে এলে। এ তো আমার বাড়ি নয়, আমার বাড়িতে কত ফুল। আমার বাবা মারা যায় ১৯৯১
সালের ৩১ শে মার্চ। ঐ দিন সকালেই হাসপাতাল থেকে বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসে
ডাক্তারদের কথায়, যেহেতু তারা বাবার বাঁচার কোন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলো না। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। রাশিয়ায় রুগীদের শেষ
পর্যন্ত হাসপাতালে রাখে ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে, আর দেশে ডাক্তাররা রুগীদের বাড়ি
পাঠিয়ে দেয়। আমি ঐ সময় মস্কো ছিলাম। শুনেছি, বাবাও নাকি তাকে
বাড়ি নিয়ে আসার পর বলেছে, আমাকে তোমরা কোথায় নিয়ে এলে। এ তো আমার বাড়ি নয়। আমার বাড়িতে কত ফুল। একাত্তরের ডিসেম্বরে আমারও
ঠিক তেমনটাই মনে হয়েছিল। আমাদের ঘরের পেছনেই ছিল ফুলের বাগান। ওখানে ছিল স্বপনদার নিজের
হাতে লাগান কয়েকটা গাছ, অন্তত আমাকে তাই বলা হতো। আমার বয়স যখন ছয় মাস, তখন
স্বপনদা কলকাতা চলে যায়। ওর হাতে বোনা গাছ দেখিয়েই ওর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিত মা। ওখানে ছিল পাতাবাহার,
গোলাপ, টগর, গন্ধরাজ, অপরাজিতা সহ হরেক রকমের গাছ। আর ছিল সন্ধ্যামালতী যা
দিয়ে মা বিনে সুতার মালা গাঁথতো ঠাকুর-দেবতাদের জন্য। কিন্তু একাত্তরের পর গ্রামে
কোন ফুল ছিল না। ফুলের গাছ ছিল মূলত হিন্দু বাড়িতে। তুলসী গাছ, ফুল গাছ এসব
দেখেই বোঝা যেতো বাড়ির মালিক কে। আমার যতদুর মনে পড়ে ঐ সময় আমাদের গ্রামে জলিল চাচার বাড়ি
ছাড়া আর কোন মুসলমান বাড়িতে ফুলের বাগান ছিল না, অন্তত আমি দেখিনি। তাই একাত্তরের ডিসেম্বরে যখন বাড়ি ফিরে এলাম আর চারিদিকে দেখলাম একের পর
একে হিন্দু বাড়িগুলোর ঘরবিহীন, ফুলবিহীন ভিটে – আমার মনও চিৎকার করে বলল – এ গ্রাম
আমার নয়, এ বাড়ি আমার নয়, আমাকে আমার বাড়ি ফিরিয়ে দাও, আমাকে আমার বাড়ি নিয়ে চল। বিজয়ের আনন্দ, বাড়ি ফেরার
আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো সব হারানোর দুঃখের সাথে। প্রায় কুড়ি বছর পড়ে ১৯৯১
সালের বসন্তে আমি যখন মস্কো থেকে বাড়ি ফিরি মৃত্যু শয্যায় শায়িত বাবার সাথে দেখা
করতে আর এসে শুনি বাবা কয়েক দিন আগে মারা গেছে। তখনও বাড়ি ফেরার আনন্দ, মা,
ভাইবোনদের সাথে দেখা হবার আনন্দ এ সবই ম্লান হয়ে গিয়েছিল বাবাকে হারানোর ব্যথায়।

No comments:
Post a Comment