আমার
জন্ম ২৫ শে ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে। ওই দিন আমি প্রথম এই পৃথিবীতে আসি, এই পৃথিবীর আলো-বাতাসের
সাথে পরিচিত হই। এর ঠিক সাত বছর পরে ১৯৭১ সালের ২৫ শে
ডিসেম্বর আবার বাড়ি ফিরলাম, নতুন করে নতুন গ্রামে, নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করবো
বলে।
বাড়ি
ফিরে সব হারানোর দৃশ্য দেখে যে আঘাত পেয়েছিলাম, সেটা কাটাতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। আমাদের ঘরটা ভেঙ্গে নিয়েছিল গ্রামেরই এক অবস্থাপন্য লোক। কোন কথা না বলেই সে ঘরটি ফেরত দিল আর কাজের লোকেরা সুত্রধরদের সাথে হাত লাগিয়ে
খুব তাড়াতাড়িই ঘর উঠিয়ে ফেলল। পাশের গ্রাম থেকে এল
রাজমিস্ত্রী নতুন করে ভিত তৈরি করতে। আগে যেখানে সিমেন্টের
ভেতরে কাঠের খুটি পোতা ছিল, এখন তারা ব্যবহার করল লোহার অ্যাঙ্গেল।
এর
মধ্যেই গ্রামের লোকেরাও এক এক করে ফিরে আসতে শুরু করলো। পাগলা, সন্তোষ, পরিমল, মণ্টু, শঙ্কর, বাদল, তাপস, তাঁতি মণ্টু – একে একে সবাই
ফিরে এল। সবাই এল নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে, নতুন নতুন জায়গার
গল্প নিয়ে। ওদের কেউ ছিল কলতা, কেউ তিল্লী, আবার কেউবা সীমান্ত
পেরিয়ে চলে গিয়েছিল ভারতে। প্রবাসে সবার ছিল নিজের
নিজের দুঃখ, নিজের নিজের কষ্ট আবার নিজের নিজের ভালবাসার মত, ভাললাগার মত স্মৃতি। তবে সবাই আবার নিজের গায়ে ফিরতে পেরে, পুরানো বন্ধুদের
কাছে পেয়ে যার পর নাই ছিল খুশী ও সুখী। শুধু পইর্যা মানে পরিমল
এই আনন্দ থেকে কিছুটা হলেও বঞ্চিত ছিল। যুদ্ধের শুরুতেই ওর বাবা
পরেশ সাহাকে মেরে ফেলে হানাদার বাহিনী। ওই ছিল বাড়ির বড় ছেলে। আমাদের চেয়ে বছর দু’তিনের বড়। ওর ছিল কল্পনা আর আলপনা নামে দুই বোন আর একেবারে ছোট এক
ভাই। তাই ওর আর পড়াশুনা হয়ে ওঠে না। ওই বয়সেই ও একটা দোকান
দেয়, বিক্রি করতে শুরু করে বিস্কুট, চানাচুর এই সব। আমার মনে আছে, আমি ওর কাছ থেকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু কিনতাম আর কখনই
দরকষাকষি করতাম না। কেন যেন ওর বাবা নেই বলে দরাদরি করতে
পারতাম না। এতদিন পরে গ্রীষ্মে সেভা যখন আমার সাথে দুবনায় সময়
কাটায়, আমি মাঝেমধ্যে বুড়ীদের কাছ থেকে ওর জন্য শশা, টম্যাটো, গাজর, মুলা এসব কিনি। বুড়ীদের কাছে এগুলোর দাম দোকান থেকে দু-তিন গুন বেশি। কিন্তু আমি একটু দরাদরি করার চেষ্টা করলেই সেভা রেগে
যায়, বলে “বাবুশকা (দিদিমা, বুড়ীদের এখানে এভাবেই ডাকে) এত কষ্ট করে এসব ফলিয়েছে,
আর তুমি দরাদরি করছো?” ভাবখানা নেই আমি যেন কষ্ট করে টাকাটা উপার্জন করিনি। তবে ওর এই জেদটা আমার ভালই লাগে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা, ২০০৮ বা ২০০৯ সাল হবে। নববর্ষের আগে মনিকা বলল, ওর গিফটের দরকার নেই, আমি যেন ওকে কিছু টাকা দেই। টাকাটা দিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, কি কিনল ও। বললো, “পাপা, তুমি কিছু মনে করো না। আমার বান্ধবী নাস্তিয়ার মা মারা গেছে কিছু দিন আগে, আমি
ওই টাকাটা ওকে দিয়েছি কিছু কিনতে।“ না, আমি কিছু মাইন্ড
করিনি, উলটো বরং খুব খুশী হয়েছি। পরিমলরা সত্তরের দশকেই
ভাগ্যের সন্ধানে চলে যায় ইন্ডিয়া। ওখানে, মধ্যমগ্রামে ওর জ্যাঠা থাকতো, পরে ওর
ছোটকাকা - উমেশ কাকাও ওখানে গিয়ে কাজ শুরু করে আর পরিমলকে নিয়ে যায়। এখন ও ওখানেই
আছে, ভালই আছে। গত ২০১৪ সালে ইন্ডিয়া যখন গিয়েছিলাম কর্মসূত্রে, মধ্যমগ্রাম গিয়েছিলাম
ঘণ্টা খানেকের জন্য। উমেশ কাকার সাথে দেখা হলেও পরিমলের সাথে হয় নি, ও তখন দোকানে
ছিল না। তবে ওরা ভাল আছে জেনে খুব খুশি হয়েছিলাম।
বন্ধুদের
বাড়িতে অনেক কাজ করতে হত। আমার সে কাজ ছিল না, বাড়ির রাখাল-চাকররা আমাদের আমাদের
সব কাজ করে দিত। তাই বরাবরের মতই আমার অনেক সময় ছিল
খেলাধুলা করার, যদিও সব সময় খেলার সাথী পেতাম না। তবে বৈলতলা থেকে বাড়ি
ফিরেই দেখি আমাদের বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। ওরা থাকতো আমাদের কাচারী ঘরে। আমাদের ছোট বেলায় এ সব
ঘরে থাকতো দুলাল মামা, গনেশদা অর্থাৎ ওই সময় যারা আমাদের বাড়িতে থেকে মানিকগঞ্জ
দেবেন্দ্র কলেজে পড়াশুনা করতো, তারা। পরে অবশ্য শ্যামলদা,
তপনদা, রঞ্জিতদা – ওরা এসব ঘরে চলে আসে, আর সকালে সুধীরদা ওখানে প্রাইভেট পড়াতে
শুরু করে। আমরা যখন বাড়ি ফিরি, ওখানে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা
থাকতো। শেষ পর্যন্ত ছিল মাত্র একজন, ওদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আর
সবচেয়ে হাল্কা-পাতলা। নাম ছিল ওর পোকা। ওর ভাল নামটি কন দিনই জানা হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিন সকালে ওর সাথে আমরা পাড়ার
ছেলেরা সবুজ-লালা-হলদে বাংলাদেশের পতাকা তুলতাম আর “আমার সোনার বাংলা” গাইতাম। তখন নিজেকেও মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে হতো। হ্যা, ঐ সময় আমাদের পতাকা ছিল তিনরঙা। বিস্তীর্ণ সবুজ
মাঠে ছিল স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্য আর ঐ সূর্যের মাঝখানে হলুদ রঙের সোনার বাংলা।
পোকা সারাদিন ঘরেই বসে থাকতো। আমাদের ভেতর বাড়ি থেকেই ওর
জন্য খাবার আসতো। কখনো কখনো ও আমাদের সাড়ে সাত কেজি ওজনের
রাইফেলটা হাতে নিয়ে দেখতে দিতো, কখনো-বা দিতো ভিটামিন সি। এখন মনে পরে, ওই
দিনগুলোতে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে গেলেই আমার চোখের সামনে একের পর এক ভেসে উঠতো আমার
গ্রামের সর্ষে ক্ষেত, সবুজ ধানের মাঠ, নদীর তীর, বটগাছ – যেন আমার গ্রামের জন্যেই
লেখা এই গান। তারপর একদিন এই ক্যাম্প উঠে যায়,
পোকা চলে যায়। অনেক দিন পরে শুনেছি পোকা আর কারা
যেন শ্যামলদাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল নদীর চরে, পরে গ্রামের লোকজন দেখে ওকে উদ্ধার করে। আরও পরে ১৯৭৪ বা ১৯৭৫ এর শুরুতে মনে হয় শুনেছি পুলিশের
সাথে না কার সাথে গোলাগুলিতে পোকা মারা গেছে। পরে অবশ্য এটাও শোনা গেছে
যে একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে যেসব যুবকেরা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলে আমাদের
খোঁজে বৈলতলা গিয়েছিল, আমাদের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ওদের কেউ কেউ ছিল।
আগেই
বলেছি, যুদ্ধের দিনগুলোতে গ্রামের হিন্দুপাড়া এক চেটীয়া লুটের শিকার হয়। মানুষের ঘরবাড়ি, বাসনকোসন, আসবাবপত্র সব কিছু নিয়ে যায়
গ্রামের মুসলমানরা। সবাই না করলেও গ্রামের অধিকাংশ লোকই
এই লুটপাটের সাথে জড়িত ছিল বলে ধারনা করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের শেষে হিন্দুরা যখন বাড়ি ফিরতে শুরু করে, ধীরে ধীরে শুরু হয়
লুটের মাল ফেরত দেবার প্রক্রিয়া। আমাদের বাড়িতে জমা হতে
থাকে বাসনকোসনের পাহাড়। আর সেই পাহাড় পরিমান বাসনকোসন থেকে
খুঁজে বের করতে হয় কোনটা কার। ওই সময় গ্রামের হিন্দুরা কাঁসার থালাবাটি ব্যাবহার করতো
আর প্রায় সবাই কাঁসার জিনিষ কেনার সাথে সাথেই ওর গায়ে নাম খোদাই করে করে নিত। তাই মালিক খুঁজে বের করা খুব বেশি কষ্টের হত না। এ ছাড়া কিছু কিছু বাসন, যেগুলো নিত্য প্রয়োজনে লাগে না,
যেমন পুজার জন্য বা বড় অনুষ্ঠানের জন্য কাঁসা বা পিতলের বিরাট থালা, কোশ ইত্যাদি
গ্রামে খুব কম বাড়িতেই ছিল। তাই ওগুলোর মালিক পাওয়াও
তেমন কষ্টের ছিল না। তার পরেও প্রক্রিয়া যে খুব সোজা ছিল,
সেটা কিন্তু নয়। স্বাভাবিক ভাবেই লুটের মাল ফেরত দিতে আসতো খুব সকালে বা
রাতে। সামসু চাচা, নোয়াই চাচাসহ গ্রামের কিছু সম্মানিত লোক সেগুলো নিত। সাথে থাকতো
আমাদের বাড়ির লোকজন। এটা ছিল এক ধরনের লজ্জাকর পরিস্থিতি। তাই চেষ্টা করা হতো এই
দেয়া নেয়ার কাজটা আলাদাভাবে করতে যাতে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্রেক না হয়।
তারপরেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটতো। যখন কেউ লুটের মাল দিতে আসতো, হিন্দুরা তাদের দিকে
অবিশ্বাস আর ঘৃণা ভরে তাকিয়ে থাকতো। আবার একই ধরনের ঘৃণা
দেখা যেত মুসলমানদের চোখেও। কখনো কখনো কেউ তিরস্কার
করত, শুরু হতো কথা কাটাকাটি।
বিশ্বাস
যতই গাঢ় ততই নিখাদ, আর যতই নিখাদ ততই ভঙ্গুর। তাই একবারে বিশ্বাসে ভাঙ্গন দেখা
দিলে সেটা খুব সহজে জোড়া দেয়া যায় না।
মস্কো,
২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

খুব ভালো লাগলো,দু-তিন বার পড়লাম,ধন্যবাদ
ReplyDeleteএকটা দু তিনবার না পড়ে সবগুলো পড় আর পড়ে জানিও। তাতে আমার লিখতে সুবিধা হবে।
ReplyDelete