মনে পড়ে স্কুলে বা পরে ইউনিভার্সিটিতে যখন পদার্থবিদ্যা বা অন্য কোন বিষয়ের
সমস্যা সমাধান করতাম, তখন কিছু কিছু জিনিষের মান দেয়া থাকতো। সেই সব প্রদত্ত মানের
সাপেক্ষে আমরা অন্য কোন কিছুর মান নির্ণয় করতাম। ঐ প্রদত্ত জিনিষগুলর মান নিয়ে কোন
প্রশ্ন করতাম না। পরে যখন গবেষনা শুরু করি, অনেক সময়ই প্রশ্ন করতে হয় কেন ঠিক ঐ মানগুলোই
দেয়া আছে, এর পিছনে যুক্তি কি? আর এই প্রশ্নের
উত্তর খুজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে নতুন নতুন প্রশ্ন, নতুন নতুন উত্তর আর নতুন গবেষণার বিষয়।
এ ব্যাপারে উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে ১৯৯৮ সালে আবিষ্কৃত মহাবিশ্বের ক্রমবর্ধমান
স্ফীতির গতির কথা। আগে ধারনা করা হতো যে সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্বের স্ফীতির গতি ক্রমশ
হ্রাস পায়। এই নতুন আবিষ্কার ছিল প্রথাগত আইনস্টাইনের তত্ত্বের বিপরীতে। তাই শুরু হল
তাত্ত্বিকভাবে এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেবার গবেষণা। দেখা গেল আইনস্টাইনের উদ্ভাবিত কসমোলজিক্যাল
কন্সট্যান্ট দিয়েই সেটা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা নতুন প্রশ্ন করল, যদি
এটাই হবে উত্তর, তবে কসমোলজিক্যাল কন্সট্যান্ট কেন ঠিক এই মানটাই গ্রহন করবে? শুরু
হল নতুন করে খোঁজা আর বিজ্ঞানীরা একের পর এক বিভিন্ন মডেল দিতে শুরু করলো। জীবনেও ঠিক
তাই। অনেক জিনিষ আমরা প্রদত্ত বলেই ধরে নেই, যা নিয়ে কোন প্রশ্ন করি না। উদাহরণ স্বরূপ
বলা যেতে পারে ঈশ্বরে বিশ্বাস। ঈশ্বর আছে এটাও যেমন একটা বিশ্বাস, ঈশ্বর নেই এটাই ঠিক
তেমনি একটা বিশ্বাস। যতক্ষন না কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন করছে কোন ঝামেলা নেই। কেন না ওটা
সেই অংকের প্রদত্ত মানের মতই। কারো জন্য সেটা শুন্য, কারো জন্য অসীম। ব্যাপারটা হলো
আমরা ইশ্বরের অস্তিত্বে বা অস্তিত্বহীনতায় শুধু বিশ্বাসই করতে পারি, প্রমান করতে পারি
না। কারন অন্য পক্ষ তার বিশ্বাসের কারনে সেই প্রমান মানবে না। তাছাড়া নিজেদের পক্ষ
সমর্থনের জন্য যেসব যুক্তি টানবো সেই যুক্তিকে খণ্ডনের জন্য বিপরীত পক্ষের অস্তিত্বই
যথেষ্ট। তারপরেও জীবনকে জানতে হলে, বুঝতে হলে প্রশ্ন করাটাই যুক্তিযুক্ত।
এই লেখা যখন শুরু করি, তখন তরার কথা কিছু কিছু ছিল। এর পরেই ঘটনাচক্র প্রবাহিত
হয়েছে অন্য এলাকা ঘিরে। তার মানে এই নয় যে তরার ঘটনা জানার ইচ্ছে আমার নেই বা ছিল না।
সত্যি বলতে কি ১৯৮৩ সালে রাশিয়া আসার আগ পর্যন্ত যুদ্ধের কয়েকমাস বাদ দিলে আমার জীবন
কেটেছে তরা গ্রামে। এমনকি যখন বুয়েট-এ পড়তাম, তখনও হোস্টেলে না থেকে প্রায়ই যেতাম বাড়ি
ফিরে। এমনি ছিল তরার প্রতি আমার টান। এখনও যখন দেশের কথা ভাবি আমার চোখের সামনে ভেসে
উঠে সেই বাঁশঝাড়, কালিগঙ্গার তীর আর দখিন চক। আমার বাংলাদেশ তরা গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ,
অন্তত কল্পনায়। তাই তো দুবনায় ভল্গার তীরে
হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই কালিগঙ্গার পাড়ে। যদিও কালিগঙ্গা বেশ বড় নদী, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে
ইছামতী বা ধলেশ্বরীর কথা যত এসেছে, কালিগঙ্গার কথা সেভাবে আসেনি। হতে পারে একেবারেই
আসেনি। যাহোক লেখা যতই এগুচ্ছে আমার মন তখনকার তরার কথা জানতে আরও বেশী উদ্গ্রীব হয়েছে।
কিন্তু জানার উপায় কি? আর কারো কাছে শুনলেও সেটা হবে অন্যের চোখে দেখা, অন্যের কাছে
শোনা গল্প। তবে এটাও তো ঠিক, তখন দেশের অবস্থা, মানুষের মানসিক অবস্থা গড়পড়তা একই রকম
ছিল। তাই যদি কারো কাছে শুনে সেটাকে যদি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা যায়, তাহলে কিছু
একটা আভাষ তো পাওয়া যাবে তখনকার তরার।
কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করবো? একাত্তর থেকে তিরাশি – দীর্ঘ বার বছর দেশে কাটালাম,
তখন কেন জিজ্ঞেস করা হল না কাউকে? দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া বেশ কঠিন। হতে পারে
তখন বয়েস কম ছিল। তবে মনে হয় ঐ সময় পারস্পারিক অবিশ্বাসটা খুব বেশী ছিল, ছিল ভয়। তাই
ও নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করা হয়নি পুরানো ক্ষত যাতে জেগে না উঠে। যুদ্ধের পর থেকেই মুসলিম
সম্প্রদায়ের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস গড়ে উঠে, ভয় গড়ে উঠে আমার মনে, যেটা আগে ছিল না।
তবে এটা শুধু আমাদের গ্রামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেননা, আগেই বলেছি আমাদের মুসলিম
পাইকাররাই এত দিন আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। যুদ্ধের আগে যদিও বেশ কয়েকবার পাক-ভারত যুদ্ধ
হয় আর হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আমি ওসব দেখিনি। এতদিন পর্যন্ত মনে হতো বাবার যেহেতু
অনেক টাকা-পায়সা আর সহায় সম্পদ আছে, যখন থানার দারোগা পুলিশ এলাকায় এলে আমাদের বাড়ি
না এসে যায় না, যখন এলাকার কোন কাজকর্ম আমাদের বাড়ির সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া হয়না, তখন
আর ভয় কিসের। কিন্তু একাত্তর দেখিয়ে দিল এই টাকা-পয়সা, এই জমি-জমা, এই মান-সম্মান কত
ভঙ্গুর। কত অনায়াসেই গ্রামের লকেরা আমাদের ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে।
মনে হয় এ কারনেই কাউকে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই একাত্তরের সেই
বিবাদ ভুলে আমরা আবার এক সাথে খেলেছি, এক সাথে বিভিন্ন সামাজিক কাজে হাত দিয়েছি।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দেখি আরও কঠিন। এবার যখন দেশে যাই ভেবেছিলাম কিছু
লোকের সাথে দেখা করব, কথা বলব। স্বাভাবিক ভাবেই এরা ছিল শিক্ষিত আর আমাদের দাদাদের
বন্ধুবান্ধবদের মধ্য থেকে, যাদের সাথে এখনো নিয়মিত যোগাযোগ হয়। কিন্তু সময়াভাবে দেখা
আর করা হয়নি। ফিরে আসার পরে ভাইদের মাধ্যমে প্রশ্নগুলো করেছি। এখনো উত্তর মেলেনি। কেউ
এড়িয়ে গেছে, কেউবা সময় নিচ্ছে। কেন না এতদিন পরে সেই সব দুঃসহ স্মৃতি আর কেউ মনে করতে
চায় না। তখন মনে হল যাদের কোলেপিঠে আমি, আমরা বড় হয়েছি, আমি তো সেই বদু ভাই, নবু ভাইদের
জিজ্ঞেস করতে পারতাম একাত্তরের দিনগুলির কথা। এরা শিক্ষিত নয়, তবে বিশ্বস্ত, আর সবচেয়ে
বড় কথা তারা জানে আমি ঐ কথাগুলো জেনে তাদের তো নয়ই, অন্য কারো কোন ক্ষতি করবো না। তবে
যেহেতু দেশে থাকাকালীন ব্যাপারটা মাথায় আসেনি, আর কবে আবার যাবো, আবার দেখা হবে কি
না, সেই আশাতে বসে থাকার সময় নেই, তাই জিজ্ঞেস করলাম পাশের গ্রামের এক বন্ধুকে। কথা
হল টেলিফোনে। আমরা একই স্কুলে পড়তাম, ও আমার থেকে দু ক্লাস উপরে পড়তো, তাই যুদ্ধের
সময় ছিল ক্লাস ফোরের ছাত্র। তার কাছ থেকে শোনা ঘটনা হবে আমার কথার মতই, কিছু কিছু ঘটনা,
যা মনে দাগ কেটে গেছে। বললও তাই। তবে আমার দরকার ছিল এলাকার পরিবেশ জানা। তাই সেই কথার
ভিত্তিতে কিছু একটা আইডিয়া দেবার চেষ্টা করব।
আগেই বলেছি যুদ্ধের শুরুতে আমাদের এলাকা থেকে শুধু হিন্দুরাই পালিয়ে গিয়েছিলো।
হতে পারে এর আগে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে এলাকার লোকজনের
এ অভিজ্ঞতাই হয়েছিলো যে স্থানীয় মুসলিমদের কোন ক্ষতি হবে না। প্রথম দিকে সেই সুযোগ
নিয়ে অনেকেই লুটপাটে জড়িত হয়। এর পরে প্রশ্ন
আসে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করার, তাদের দোসর হবার, রাজাকার আল-বদরদের খাতায় নাম লেখানোর। যদিও প্রথম
কয়েকদিনেই গ্রামের কিছু অতি উৎসাহী লোক কয়েকজনকে খুন করে, পরে আর সেটা ঘটেনি, অন্তত
গ্রামের লোকজনদের সাথে। ঐ সময় আমাদের গ্রামে হারুন ড্রাইভার নামে এক লোক থাকতো, কাজ
করত ইপিয়ারতিসিতে। বাড়ি ছিল পাবনা জেলায়। কালো, উচালম্বা। যুদ্ধের আগে যখন তাকে দেখতাম
বড় খাল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ভয়ই লাগতো। এই লোকটাই পরবর্তীতে পাক হানাদারদের সহায়তা করে।
আমার মনে হয়, হারুন ড্রাইভার যে এটা করবে এ নিয়ে কারো মনে কখনও কোন প্রশ্ন জাগে নি।
শুনেছি তার হাতে অসংখ্য লোকের মৃত্যুর কথা। তবে দেশ স্বাধীন হবার পর তাকে আর কেউ আমাদের
এলাকায় দেখেনি।
যুদ্ধের পরে দেখে বা শুনে মনে হয় গ্রামের লোকেরা বিরোধিতা না করলেও পাকবাহিনীকে
খুব একটা সহায়তা করে নি। যেটুকু আনুগত্য না দেখালেই নয়, সেটুকু দেখিয়েই নিজেদের দিন
কাটিয়েছে। খুব বেশী প্রয়োজন না হলে কেউ খুব একটা বাইরেও যেতো না। সারা দেশেই পরস্পরের
প্রতি যে ভয়, যে অবিশ্বাস তখন বিরাজ করছিল, সেটা আমাদের গ্রামে বা আমাদের এলাকায়ও ছিল।
ঐ সময় ভ্যানেল কোম্পানি সবে কাজ শুরু করেছে। নদীর ওপারে ছিল ওদের বড় একটা অফিস। ওটাই
ছিলো পাকবাহিনীর অফিস। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন ধরে এনে ওখানেই জিজ্ঞাসাবাদ আর নির্যাতন
করা হতো। তরার সেই বধ্যভূমিতে ঐ সময় অসংখ্য লোক হত্যা করা হয়। ভ্যানেল কোম্পানি তরা
ব্রীজের জন্য যে পিলার তখন পুঁতছিল, সেই লোহার বেষ্টনী দেয়া নদীর গহ্বরে তখন কত লোক
যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, তার খবর কে জানে। গ্রামের বা আশেপাশের লোকজন তখন তরা
ঘাট হয়ে মানিকগঞ্জ যেতো না, যেতো বেউথা ঘাট হয়ে। ফিরত নৌকা করে গিলণ্ড হয়ে। শুনেছি
নৌকায় আসার পথে করচা ক্ষেতে অনেকেই দেখেছে ভেসে থাকা লাশের পর লাশ। তাদের হাত-পা ছিল
পেরেক দিয়ে আটা বা দড়ি দিয়ে বাঁধা। ঐভাবে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে গুলি করে মারা হতো
এদের। তবে তারা যে কারা, কোত্থেকে ধরে আনা সেটা জানা যায়নি।
যুদ্ধ শেষ হবার অনেক আগেই অক্টোবরের দিকে কিছু কিছু হিন্দু পরিবার গ্রামে ফিরে
আসতে শুরু করে। এরা ছিল খুবই গরীব। যাদের বাঁচার কোন উপায় ছিল না। তাই তারা জীবন বাজী
রেখে ফিরে আসে গ্রামে, খাদ্যের সন্ধানে। দিনের বেলায় হাটে বাজারে টুকটাক বেচাকেনা করতো
আর তাই দিয়েই চালাতো দিন। যেহেতু ঘরবাড়ি সব লুট হয়ে গিয়েছিল, এরা থাকতো নিজেদের জায়গায়
ছাপরা উঠিয়ে। অনেক সময় আবার রাত কাটাতো খোলা মাঠে, যদি দেখত গ্রামে মিলিটারি আসার সম্ভাবনা
আছে। তবে ঐ সময় গ্রামের মুসলমানরা তাদের উপর আর বিরুপ ছিল না। হয়তো বা তাদের কাছ থেকে
নেবার আর কিছুই ছিলো না, অথবা পাকবাহিনী আর রাজাকারদের অত্যাচার দেখে পাকিস্তানের প্রতি
শেষ মোহটুকুও কেটে গিয়েছিল। বরং তাদের প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষ সহযোগিতায়ই এই সর্বহারা
লোকগুলো দেশ স্বাধীন হবার আগেই বাড়ি ফিরতে পেরেছিল।
এই হল তরার মোটামুটি একটা চিত্র। তবে আশা করি এ ব্যাপারে আরও তথ্য পাবো অদুর
ভবিষ্যতে আর তখন এ নিয়ে আবার কিছু লিখবো।
দুবনা, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

No comments:
Post a Comment