ষড়ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। অন্যান্য দেশে যখন ঋতুগুলো প্রসস্থ পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় আমাদের
দেশে ষড়ঋতু মানুষের মতই একে অন্যকে ঠেলে ধাক্কিয়ে কোন রকমে পথ করে নেয়। ভিনদেশীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে গ্রীষ্ম, শরত, শীত ও বসন্ত
নিয়ে কোন সমস্যা হয় না। বর্ষাকালকেও অতি সহজেই
ওদের বোধগম্য করা যায়। কিন্তু যত সমস্যা হয় ঋতুর
এই লাইনে শরত আর শীতের মাঝে ঢুকে পড়া হেমন্তকে নিয়ে। এটা ঠিক সোনালী
শরত নয়। তারপরেও হেমন্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ এক ঋতু। এ ঋতুতেই হয় নবান্ন উৎসব। গ্রীষ্ম, বর্ষা,
শরত জুড়ে ধান আর পাট চাষের পরে কৃষক জমি তৈরি করে রবি শস্যের জন্য। ঐ সময় মাঠ ভরে যায় সর্ষে আর কলাইএ। সেই সাথে পিয়াজ,
মরীচ, মূলা, কপিসহ হরেক রকম সবজি। আমাদের গ্রামে
সবজি লাগাতো বাড়ির সাথের জমিতে, যাকে আমরা বলতাম পালান। বলতো চকে সবজি
লাগালে সেটা আর বাড়িতে আসবে না, লোকে নিয়ে যাবে। ধান পাটের ক্ষেত্রে
সেই সম্ভাবনা ছিল কম, যদিও বর্ষার জল নেমে গেলে আমন ধান যখন পাকতো, তখন কেউ কেউ টুপড়ি বা ধামা হাতে ঘুরে বেড়াতো জমির
পাশে আর সুযোগ পেলে শামুক দিয়ে পাকা ধানের শীষ কেটে নিতো। সাথে রাখতো একটু
গোবর, যেন সে ধানের শীষ নয়, গোবর কুরাতে বেরিয়েছে। আমাদের বাড়িতেও সবজি লাগাতো রঙ খোলার
নিচের জমিটায় অথবা নয়াবাড়ির পাশের জমিতে। লাগাত মূলা, মরীচ
আর বাঁধা কপি। আমরা নিজেরাই মাঝে মধ্যে
তুলতাম মরীচ আর মূলা মুড়ি দিয়ে খাবার জন্য। আর যখন মাখন কাকু
বেড়াতে আসতো মানিকগঞ্জ থেকে, আমাদের বলতো মরীচ আনতে, পনের থেকে কুড়িটা মরীচ ভাতের সাথে
খেয়ে ফেলতো। আমি আর কাউকে দেখিনি এক সাথে এত মরীচ খেতে। ঐ কাকু ড্রিঙ্ক করতে পছন্দ করতো, আমরা ভাবতাম ড্রিঙ্ক করে
বলেই এত মরীচ খেতে পারে। তাছাড়াও হেমন্তে আমরা অপেক্ষা
করতাম খেজুরের রসের। প্রায় প্রতিদিন সকালেই
বাড়িতে রস দিয়ে যেত। কখনো কখনো সাইঝ্যা রসের,
মানের সাঝের বা সন্ধ্যা বেলার রসের বায়না ধরতাম। বদু ভাই বা নালু
ভাই ঠিক কোত্থেকে যেন এনে দিত। এছাড়াও হেমন্তে
আমরা অপেক্ষা করতাম কলাইএর জন্যও। কলাই হত শীতে,
তবে বুনতো তো তা হেমন্তে। কি যুদ্ধের আগে, কি যুদ্ধের
পরে সবাই পছন্দ করতাম শিম তুলতে। স্কুলে যাবার পথে
আমাদের আর চুনী বসাকের জমিতে হুমড়ি খেয়ে পরতাম মটরশুটি তুলতে। সেটা না পেলে তুলতাম
খেসারির শিম। আর ভয় হত ভুলে শিয়ালমুতি
না খেয়ে বসি। বলতো শিয়াল কামড় দিলে যেমন
শিয়ালমুতি খেলেও মানুষ তেমনি পাগল হয়ে যায়। আর শীতে যখন কলাই
পাকতো তখন ছিল নতুন খেলা। কলাই পুড়া খাওয়া। এ জন্যে স্কুলে যেতাম পকেটে দিয়াশলাই নিয়ে। সবাই মিলে শুকনা কলাই জড় করে তার চারদিকে বসতাম, তারপর তাতে
আগুন লাগিয়ে দিতাম। সাবধানে থাকতে হতো যাতে
আগুন ছড়িয়ে না পড়ে। তারপর সবাই মিলে আগুনের
নিচে খুজতাম কলাই আর কি মজা করেই না খেতাম। বাড়ি ফেরার পর
মা যখন বলতো, তোর মুখে এত কালি কোত্থেকে, তখন আর কলাই পড়ানোর কথা অস্বীকার করার কোন
উপায় থাকতো না। এই সেই হেমন্ত। কত স্মৃতি ঘেরা হেমন্ত। শুধু স্মৃতি নয়,
কুয়াশা ঢাকা এ হেমন্ত। শীতকালে সাধারনত দূর্বার উপরে শিশির পড়ে থাকতো, আর আমরা সেই
শিশির ঠোঁটে মাখতাম যাতে ফেটে না যায়। আর হেমন্তে শুধু কুয়াশা, কখনও কখনও এত ঘন যে
সামনে কিছুই দেখা যেতো না। মনে হয় এজন্যেই হেমন্ত এত রহস্যময়।
একাত্তরে বৈলতলায় আমাদের
শেষ দিনগুলো ছিল হেমন্তের শেষ দিনগুলোই। সুযোগ পেলেই দৌড়ে
চলে যেতাম বইরাগীর চকে, দেখতাম কিভাবে একটু একটু করে বাড়ছে সর্ষে আর কলাই, আলু আর পিয়াজ। মনে পড়ে ঐ সময়ই প্রথম ইরি আর বোরো ধানের নাম শুনি আমি। আমাদের বাড়িতে অনেক জমিজমা ছিল, সারা বছরই একটার পর একটা
ফসল আসতো জমি থেকে। বর্ষা আর শরতে ছিল আউশ
আর আমন ধান। আর ছিল পাট। তখন শুধু আউশ আর
আমন ধানই হতো। আর হেমন্ত, শীত আর বসন্তে ঘরে আসতো বিভিন্ন রকমের কলাই
আর সর্ষে, আর আসতো হরেক রকমের শাকসবজি। এখন অবশ্য ইরি
ধানের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে কলাই থেকে শুরু করে অনেক শস্যই বিদায় নিয়েছে আমাদের
জমি থেকে।
যদিও যুদ্ধের প্রকটতা বাড়ছিলো,
তার পরেও ভালোলাগতো চকে গিয়ে ঘুরতে। চকে ঘুরা, মানে
স্বাধীনতা পাওয়া, আকাশের সাথে কথা বলা, খোলা বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া, পাখির ডাক
শোনা। জীবন সব সময়ই স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, স্বাধীন ভাবে চলতে ফিরতে
ভালবাসে। তাইতো কি যুদ্ধ, কি শান্তি – সময় পেলেই সে দৌড়ে চলে যায় খোলা
আকাশের নিচে, উড়ে বেড়ায় মেঘের পাখায় ভর করে। মানুষকে যদি আকাশ
দেখতে দেয়া না হয়, তাকে যদি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে দেয়া না হয়, তাকে যদি প্রকৃতির সাথে কথা বলা থেকে বঞ্চিত করা হয় –
তাহলে সে জীবন্মৃত হয়ে কোন রকমে বেঁচে থাকে। হয়তো বা এ কারনেই
অপরাধীদের কারাগারে রাখা হয়, যাতে তারা প্রকৃতির সংস্পর্শে আসতে না পারে, না মরেও যেন
মরে যায়।
একাত্তরের সেই হেমন্তের শেষ দিনগুলোয় প্রায়ই নিস্তব্ধতার বুক চিড়ে ভেসে আসতো
গুলির শব্দ। হতে পারে অন্য কোন শব্দ, তবে ঐ সময় যেকোনো শব্দকেই গুলির শব্দ বলে মনে
হতো। এরকমটা হয়েছে আবার যুদ্ধের পরে, বিশেষ করে তিহাত্তর চুয়াত্তরে, যখন ভয় আর সন্ত্রাসে
ছেয়ে গিয়েছিল দেশ। যাহোক ফিরে আসি একাত্তরে। তখন প্রায়ই শুনতাম এখানে সেখানে মুক্তিবাহিনীর
সফল অপারেশনের কথা। তখনই জানলাম হালিম ক্যাপ্টেন, ঝন্টু বেয়াইমশাই, মন্সুর ভাই এদের
যুদ্ধের কাহিনী। ঝন্টু বেয়াইমশাই মানে গিরীজা রঞ্জন সাহা আমাদের বড় বৌদির বড়দা, তাই
আগে থেকেই চেনা। তাদের বীরত্বের গল্প শুনে মনোবল বাড়তো, দেশ যে শীঘ্রই স্বাধীন হচ্ছে
এই বিশ্বাস আরও পোক্ত হতো। এরই মাঝে একদিন, সময়টা ঠিক খেয়াল নেই, প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে
উঠলো মাটি। আর পুব আকাশে দেখা গেল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। সবাই বললো, মনে হয় জাগীর ব্রীজ উড়িয়ে
দিল।
জাগীর আমাদের বাড়ি থেকে মাইল চারেক দূরে। তখনও তরা ব্রীজ, যা কিনা কালিগঙ্গা
সড়ক সেতু নামে পরিচিত আর অনেক দিন পর্যন্ত দেশের দীর্ঘতম সড়ক সেতু ছিল, হয়নি। কাজ সবে
শুরু হয়েছিলো। তাই আমাদের কাছে জাগীর ব্রীজ ছিল আকর্ষণীয়। যুদ্ধের আগে ও পরে অনেক বার
গেছি সেখানে। বড়দার যাত্রার দল, অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান, ওখানে এলেই আমি চলে যেতাম
দু-তিন দিনের জন্য। থাকতাম বড়দার সাথে। রাতে যাত্রা দেখতাম আর সকালে হাঁটতাম ব্রীজের
উপর দিয়ে। তাই যখনই শুনলাম জাগীর ব্রীজ উড়িয়ে দিয়েছে, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
তখন গাড়িঘোড়া এত ছিল না। এখনো মনে পরে কালেভদ্রে এক আধটা গাড়ী চলার কথা। কোন
ট্রাক বা বাস যখন ক্রস ব্রীজের ওখান দিয়ে যেতো, বাড়িতে বসেই তার শব্দ পেতাম। আর ঐ সময়
এটা ছিল দেশের ব্যাস্ততম রাস্তার একটি – ঢাকা-আরিচা রোড। ঢাকার সাথে খুলনা বিভাগ আর
রাজশাহী বিভাগের এক মাত্র সংযোগকারী সড়ক। সব গাড়ীই যেতো আরিচা হয়ে। দক্ষিন বঙ্গের গাড়ীগুলো
ফেরী পার হয়ে যেতো গোয়ালন্দে, আর উত্তর বঙ্গের গাড়ীগুলো নগরবাড়ি। প্রায় সারাদিনই শোনা
যেতো দুই একটা বিচ্ছিন্ন গাড়ীর শব্দ। কিন্তু যখন এক সাথে অনেক গাড়ীর শব্দ পেতাম, বুঝতাম
আরিচার ফেরী এসেছে। আর উত্তর বা দক্ষিন বঙ্গ থেকে মালামাল ভরতি করে ঢাকা যাচ্ছে একের
পর এক ট্রাক। পরে অবশ্য শুনেছি জাগীর ব্রীজে
নয়, বোমা ফেলেছে তরায়, আমাদের গ্রামে, ডুবিয়ে দিয়েছে ফেরী।
কিছু দিন আগেও তরার ফেরীঘাটে ছিল কাঠের ফেরী। দুটো বড় বড় নৌকা জোড়া দিয়ে এগুলো তৈরি করা হতো। আমাদের গ্রামের নালু ভাই একটা ফেরী চালাতো। পার হতে ৫ বা ১০ পয়সা হয়তো লাগতো। তবে নালু ভাইএর ফেরীতে আমরা ফ্রী যেতাম। ঐ সব ফেরীতে তখন শুধুই ট্রাক আর কালেভদ্রে দুয়েকটা প্রাইভেট কার পার হতো। আর যেতো সাধারন মানুষ। আরিচা থেকে বাস আসতো – সবুজ রঙের ইপিআরটিসি-র বাস। বাস থেকে নেমে লোকজন ফেরীতে করে নদী পার হতো, সেখানে আবার ইপিআরটিসি-র বা পাব্লিক বাসে করে কেউ যেতো মানিকগঞ্জ, কেউ-বা আরও দূরে। ভ্যানেল কোম্পানি যখন তরা ব্রীজের কাজ শুরু করল, ওরাই নিয়ে এল প্রথম ষ্টীলের ফেরী। ফেরীটা ছিল নিচু, কিন্তু একই সাথে অনেক গাড়ী পার করতে পারত। কাঠের ফেরীর জন্য যেমন উঁচু ঘাটের দরকার পড়তো, এই ফেরীর জন্য সেটা দরকার পড়তো না। আমরা প্রায়ই লাফিয়ে উঠতাম ঐ ফেরীতে। সে ছিল এক ভিন্ন ধরনের অনুভুতি। ঐ ফেরী ডুবানো হয়েছিল এদিকে আটকে পরে পাক বাহিনীর সাথে ঢাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য।
দুবনা, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

No comments:
Post a Comment