বাঙ্গালায় যদিও আমরা ছিলাম শশী জ্যাঠামশায়ের (শশী মোহন সেন) বাড়ীতে, আর অনেক সময় কাটতো রাম মামার সান্নিধ্যে, ওখানে আমরা এসেছিলাম কুদ্দুস ভাইয়ের হাত ধরে, তার আমন্ত্রণে। তাই ওই গ্রামে কুদ্দুস ভাই ই ছিলেন আমাদের প্রথম ও শেষ আশ্রয়। বেশ উঁচা লম্বা, প্রশান্ত প্রশস্ত মুখমন্ডল, হালকা গোঁফ আর নাকের ওখানে কালো বিশাল এক আঁচিল। মুখে পান আর লালচে দাঁত। এতো বিপদের মধ্যেও তার উপস্থিতি এক ধরণের আস্থার জন্ম দিতো। তাই সময়ে অসময়ে দৌড়ে চলে যেতাম কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে। বাইরের বিশ্বের, মানে আশেপাশের গ্রাম বা মফঃস্বল শহরের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল কুদ্দুস ভাইয়ের মাধ্যমেই। আমাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবাই ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায়, তাই মাঝে মধ্যেই তাদেরকে যেমন নিজেদের অবস্থা জানাতে হতো, তাদের কথাও জানতে হতো। দেশের ওই পরিস্থিতিতে এসব করতে হতো গোপনে, বিভিন্ন মধ্যম ব্যবহার করে। আমাদের হয়ে কুদ্দুস ভাই ই এসব করতেন।
কুদ্দুস ভাইর বাড়ী ছিল গ্রামের ভিতরের দিকে। বাড়ীর পাশেই ছিল ছোট্ট একটা ডোবা বা মাইট্যাল। ওখানে ছিল অনেক বেত। যদিও বাড়িতে বেতের তৈরী ধামা, কাঠা, মোড়া -এ সব ছিল, তবুও তখন বেত বলতে বুঝতাম স্কুলের মাস্টারমশাইদের হাতে ছড়ি, পড়া না পারলে যা দিয়ে তারা মারতেন ছাত্রছাত্রীদের। কুদ্দুস ভাইয়ের ছিল তিন ছেলে, রাশেদ, খালেক। তৃতীয় জনের নাম মনে নেই। খালেক আমার বয়সী। তবে ওরা যে খুব বেশী সময় দিতে পারতো, তা নয়। বাড়ীর কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো ওদের।
ওই সময় প্রায়ই মনে পড়তো দেশের বন্ধুদের কথা। পাগলা (পরিতোষ), সন্তোষ, মনা (মনতোষ) , পানা (প্রাণতোষ), পইড়্যা (পরিমল), মন্টু (মন্তোষ), শঙ্কর, বাদল আরো কত নাম। বাড়িতে যেহেতু আমার কোনো কাজ ছিল না পড়াশুনার বাইরে, দিন কাটতো ওদের সাথে খেলাধুলা করে আর ঘুরে। ওদের অনেক কাজ করতে হতো। স্কুল শেষে খেয়ে যেত ঘাস কাটতে বা গোবর কুড়াতে। ঘাস খাওয়াতো গরু-ভেড়াকে আর গোবর শুকিয়ে ব্যবহার করতো জ্বালানী হিসেবে। আমি যেতাম ওদের সাথে। গরু ছিল অন্যের আর গোবর সরকারি, তাই যে আগে গোবর দেখতো বা গোবরের কাছে যেত, তারই হতো গোবর। আমার যেহেতু ওসবের দরকার ছিল না, আমি ওদের হয়ে গোবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। আর ওরা এভাবে গোবর পেয়ে খুশি হতো। এটা করতাম দুপুরের পর। সকালে ছিল স্কুল। আমাদের গ্রামে তখন শুধু প্রাইমারী স্কুল ছিল। তরা প্রাইমারী স্কুল। ছোট এক টিনের ঘরে তিনটে মাত্র ক্লাস, তাই ক্লাস হতো দুই পর্যায়ে, সকাল ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত বি, ওয়ান আর টু। ১২.৩০ থেকে ৪ টা পর্যন্ত থ্রি, ফোর, ফাইভ। স্কুলে ছিল চার জন শিক্ষক - বড় মাস্টারমশায় (হারান সূত্রধর), ছোট মাস্টারমশায় (অনাথ সূত্রধর), গোবিন্দ স্যার (গোবিন্দ সূত্রধর, বড় মাস্টারমশায়ের ছেলে) আর ঘাড়া স্যার (সরফরাজ স্যার)। বড় মাস্টারমশায় আর গোবিন্দ স্যার আমি প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময়ই ভারতে চলে যায়।
আজ এই যুদ্ধকালীন সময়ে হাতে যখন অফুরন্ত সময়, বন্ধুদের কেউই ছিল না পাশে। এমন কি জানতাম না কে কোথায় আছে? কেমন আছে? বেঁচে আছে কি? প্রায়ই মনে হতো ওদের কথা। আগে যে সব সময় ওদের সাথে শুধু ভালো সম্পর্ক ছিল তা নয়, খেলাধুলা করতে গিয়ে মারামারি হতো প্রায় প্রতিদিন। প্রায়ই হতো ডুয়েল - পাছার ধরা, যাকে বলা যায় ফ্রি স্টাইল লড়াই। কে কাকে নিচে ফেলতে পারবে। সেই অর্থে ঘুষাঘুষি হতো খুবই কম। আর ছিল নাক কাটা, মানে কথা বলা বন্ধ করে দেয়া। যুদ্ধের দিনগুলোতে মনে হতো, যদি একবার দেখা হয়, আর কখনো ঝগড়া করবো না, মারামারি করবো না। তবে কথা রাখা হয়নি। যুদ্ধের পর আবার আমরা একসাথে খেলেছি, মারামারি করেছি। তবে স্বাধীনতার পর সবাই দেশে ফেরেনি, বা ফিরলেও বেশি দিন থাকে নি। রাজেন্দ্ররা চলে গেছিলো কয়েক দিন পরেই। মনা, পানারা কয়েক বছর পর। মন্টু, বদলরা এখনো দেশেই আছে। ভালো আছে সবাই।
কুদ্দুস ভাইয়ের ওখানে যে বেত হতো, তা দিয়ে শুধু বেতই বানানো যেত না, তাতে বেতুল বলে এক ধরণের ফল হতো। অনেকটা পিচ ফলের মতো দেখতে, তবে আরো ছোট আর খেতে টক, এমনকি তেতোও বলা চলে। তবে ওই সময়ে বেতুলও সুস্বাদু মনে হতো। এছাড়াও কুদ্দুস ভাইয়ের বাড়িতে ছিল তাল গাছ, আর সেই গাছে ঝুলতো বাবুই পাখির বাসা। আমাদের এলাকায় তাল গাছ তেমন ছিল না। আমাদের তাল গাছটা ছিল বাড়ী থেকে অনেক দূরে, বানিয়াজুরীর কাছে জমিতে। এ ছাড়া ক্রস ব্রীজ আর মজুমদার (জমিদার) বাড়ীতে ছিল কিছু তাল গাছ। শুনেছি ওই গাছে ভুতেরা বাস করতো, আর প্রতি রাতে উড়ে উড়ে ক্রস ব্রীজ থেকে আমাদের তাল গাছে যেত। তাই খুব কৌতূহল নিয়ে দেখতাম কুদ্দুস ভাইয়ের তাল গাছ আর জিজ্ঞাসা করতাম, ভুত থাকে কিনা তাদের গাছে।
বাঙ্গালায় আমরা ছিলাম একমাস বা দেড় মাস। বাঙ্গালা থেকে কয়েক মাইল দূরে ছিল তেরশ্রী গ্রাম। ওখানকার জমিদার (সাবেক) ছিলেন সিদ্ধেশ্বর বাবু। যতদূর জানি, উনি কোথাও পালান নি। যুদ্ধের সময় ওনার বাড়ীতে আর্মি ক্যাম্প ছিল। এটা অবশ্য ওনার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। মনে আছে, যুদ্ধের আগে আর তার পরেও, কম করে হলেও ১৯৮৩ সল্ পর্যন্ত, যখন আমি রাশিয়া চলে আসি, এলাকায় যখনই কোন পুলিশ বা দারোগা বা থানার কেউ আসতো, আমাদের বাড়ীতেই হতো তাদের খাবার ব্যবস্থা। সেটা আমরা চাই আর না চাই। এলাকায় প্রবাভশালী হবার, সচ্ছল হবার মাশুল এটা। এটা ভালোও নয়, মন্দও নয়, এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা। জুনের মাঝামাঝি এক সময় খবর এলো তেরশ্রীর পরিস্থিতি ভালো নয়, সিদ্ধেশ্বর বাবু বলতে গেলে গৃহবন্দী। তখনই কুদ্দুস ভাই যোগাযোগ করলো আমাদের আরেক খরিদ্দার কালু ব্যাপারীর সাথে। তার বাড়ি ছিল বৈলতলা বলে এক গ্রামে। সেখানে হারান ব্যাপারী আর আজিজ ভাই নামে আমাদের আরো পাইকার ছিল। ওনাদের প্রচেষ্টাতেই আমরা একদিন রওনা হলাম বৈলতলা। বাঙ্গালা আর বৈলতলার মধ্যে বিশাল বইরাগীর (জানিনা কেন "রা" এর উপরে জোর দেয়া হয়, কেন বৈরাগীর বলা হয় না ) চক। সিংজুরীর পাশ দিয়ে হেটে আমরা পৌছুলাম বৈলতলায়। মাখন কাকার বাড়ীতে। ঠিক মনে করতে পারছিনা, বাঙ্গালা থাকতেই অথবা বৈলতলা আসার পরে আমরা খবর পেলাম, তেরশ্রীর সিদ্ধেশ্বর বাবুকে পাক বাহিনী ঘরে বন্ধ করে পুড়িয়ে মেরেছে।
বৈলতলা আসার পরেও অনেক বার গেছি বাঙ্গালা, কুদ্দুস ভাই স্বাধীনতার পরেও অনেক বছর নিয়মিত আসতো আমাদের বাড়ীতে। ১৯৮৭ সালে আমি যখন দেশে বেড়াতে যাই মস্কো থেকে, তখনই মনে হয় কুদ্দুস ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা। উনি আমাকে একটি বাবুই পাখির বাসা উপহার দিয়েছিলেন। আমার হোস্টেলের রুমে ঝুলানো ছিল বাসাটা। হোস্টেল ছাড়ার পরে সাথে করেই নিয়ে এসেছিলাম। ঘরের জিনিষপত্রের মধ্যে খোঁজ করলে মনে হয় বাবুই পাখীর বাসাটা এখনো পাওয়া যাবে।
দুবনা, ২৮ অক্টবর ২০১৬

খুব সুন্দর লিখা বিজন, মনে হচ্ছে সব দেখতে পাচ্ছি।
ReplyDeleteধন্যবাদ শাহীন। আসলে আমরা সবাইতো এর মধ্যে দিয়ে গেছি, তাই এরকম মনে হচ্ছে। এমন সোভিয়েত ইউনিয়নের দিনগুলো নিয়ে কোনো বন্ধুরা লিখলে মনে হয়, এটাতো আমার কথা। কয়েকদিন আগে মুকুল ভাই ফোন করে বললো, তোমার লেখা পড়তে পড়তে আমি আবার সেই ৭১ এ ফায়ার গেলাম, সেই পালানোর ঘটনা, শেয়ালের খুঁড়ে তোলা মানুষের লাশগুলো নতুন করে কবর দেয়া।
Delete