পাকিস্তানের ভারত আক্রমন
বা ভারতের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়িতে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার
সৃষ্টি করলো। আমাদের ছোটদের মধ্যে অবশ্য দ্বিধার অবকাশ ছিল না। আগে আমাদের যুদ্ধ
যুদ্ধ খেলায় শুধু দুটো পক্ষ ছিল, মুক্তিবাহিনী আর পাক বাহিনী। রাজাকারদের আমরা ঐ
হানাদারদের দলেই ঢুকিয়ে দিতাম। যুদ্ধ হতো রক্তক্ষয়ী আর আপোষহীন। কখনো কখনো
মুক্তিবাহিনী কোণঠাসা হলেও শেষ পর্যন্ত ওরাই জিততো এই যুদ্ধে। এখন ভারতীয় সৈন্য
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে নামার ফলে আমাদের খেলাতেও যৌথবাহিনীর
আবির্ভাব হোল, আর এখন থেকে এই বাহিনী অনায়াসে পাকসেনা আর তাদের দেশীয় দোসরদের
হারিয়ে দিতে লাগলো। শুধু তাই নয়, ঐ সময়ে আকা আমার ছবিগুলোতে ট্যাঙ্ক আর ফাইটার
বিমানের আনাগোনা শুরু হোল। আমরা ছোটরা খুব পজিটিভলি নিলাম ভারতীয় সেনার আগমন।
বাড়ির মহিলামহলেও খুব আগ্রহের সাথে গৃহীত হোল এই ব্যাপারটা। তবে ঐ সময় বাবা, কাকা,
জ্যাঠামশাই আর মাখন কাকার কথায় মনে হোল ওনারা এই ব্যাপারটাতে খুশি হলেও একটু
দুশ্চিন্তাগ্রস্থ।
ঐ সময়ে এতসব বোঝার ক্ষমতা
ছিল না, তবে পরবর্তী কালে বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাপারটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে আমার
কাছে। সত্যি বলতে কি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এক স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের
জন্যে হলেও বাংলার হিন্দু আর মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য এটা ছিল দুটো ভিন্ন যুদ্ধ। গত
শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে যখন পাকিস্তানের দাবীটা খুব জোরেশোরে উঠলো আর এই
লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের
মত আছড়ে পড়তে লাগলো সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা বাংলার কুলে, তখন থেকেই পূর্ববাংলার
হিন্দুরা হারাতে লাগলো সাত পুরুষের ভিটে আর পায়ের নীচের মাটি। আর এরপর থেকেই বাঙ্গালী
মুসলমানের যে কোন আন্দলনে, তা হোক সে পাকিস্তানের আন্দোলন, সায়ত্ব শাসনের আন্দোলন
বা স্বাধীনতার লড়াই – সব সময়ই এ অঞ্চলের হিন্দুরা ছিল রিসিভিং এন্ডে। ফিজিক্সে এনট্রপি বলে একটা কথা আছে,
যেটাকে বলা যায় বিশৃঙ্খলতার মাত্রা, যেটা সব সময়ই বৃদ্ধি পায়। সেদিক থেকে দেখতে
গেলে হিন্দুদের পূর্ব বাংলা বা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ত্যাগ আর দেশে থাকার ভবিষ্যৎ
নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটা এনট্রপির মতই, সময়ের সাথে যা শুধু বেড়েই যাচ্ছে। মনে হয়
জীবনের অভিজ্ঞতাই বাবাদের শিখিয়েছিল সংশয়বাদী হতে, তাই ভারতীয় সৈন্যের যুদ্ধে
সরাসরি অংশগ্রহণে মনে মনে খুশি হলেও একটা দুশ্চিন্তাও তাদেরকে ঘিরে রেখেছিল।
পাকিস্তান সৃষ্টি হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। অবিভক্ত ভারতে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ চললে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের
জন্য এটা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়া উচ্চবর্গের মুসলিমদের জন্যও ছিল খুবি
কঠিন, কেননা ব্রিটিশরা এই মুসলিম রাজন্যবর্গের হাত থেকেই ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা
দখল করে। চল্লিশের দশক থেকে জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন নতুন গতি পায়, আর
নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যার
একটাই উদ্দেশ্য ছিল – ব্রিটিশ রাজের কাছে প্রমান করা, যে অবিভক্ত ভারতে হিন্দু আর
মুসলমান এক সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে অক্ষম। শুধু সেটাই না, জিন্নাহ বলতেন
(হয়ত-বা বিশ্বাসও করতেন) যদি ভারত আর পাকিস্তান নামের দুটো আলাদা রাষ্ট্র হয়, তবে
হিন্দু-মুসলমান বিরোধিতা আর থাকবে না, ভারত আর পাকিস্তান হবে বন্ধুত্বপূর্ণ দুটো
রাষ্ট্র যারা সব সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান সৃষ্টির পর
জিন্নাহ ঘোষণা করেন হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, সবাই হবে পাকিস্তানের নাগরিক, সবাই
সমান অধিকার ভোগ করবে এই নতুন দেশে। কিন্তু সত্যটা ছিল ঠিক বিপরীত। ভারত আর
পাকিস্তান কোন দিনই বন্ধু রাষ্ট্রে পরিনত হয়নি। এতদিন মানে পার্টিশনের আগ পর্যন্ত
দ্বন্দ্বটা ছিল দুই সম্প্রদায়ের। তার উপরে ছিল রাষ্ট্র। চাক আর নাই চাক, রাষ্ট্রকে
এই দুই সম্প্রদায়ের লড়াইতে হস্তক্ষেপ করতে হতো, পালন করতে হতো নিরপেক্ষ ভুমিকা।
পার্টিশনের ফলে ভারত ভেঙ্গে দুটো দেশ হোল। মানুষগুলো রয়ে গেলো আগের মতই তাদের সব
বিশ্বাস আর ঘৃণা বুকে নিয়ে। এই ঘৃণা তো কমলোই না, বরং এতে যোগ হোল নতুন উপাদান।
হিন্দু আর মুসলমান পরস্পরকে ঘৃণা করার সাথে সাথে ঘৃণা করতে শুরু করল যথাক্রমে
পাকিস্তান আর ভারতকে। সম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিনত হোল দুই রাষ্ট্রের লড়াইয়ে।
বিগত দুই দশকের বেশি সময়ে
ভারতের হিন্দু যেমন মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে সাথে পাকিস্তানকে শত্রু ভাবতে শিখে,
ঠিক তেমন করেই পাকিস্তানের মুসলমান হিন্দুদের পাশাপাশি ভারতকেও শত্রু ভাবার তালিম
পায়। এখনও মনে পড়ে ১৯৬৯ সালে কলকাতা যাবার কথা। ঐ প্রথম দেখি কোন পাঞ্জাবী
অফিসারকে। আমি আর আমার বড় ভাই রতন যাচ্ছিলাম মার সাথে পশ্চিম বঙ্গে মামাবাড়ি। ছোট
কাকা গেছিল আমাদের বেনাপোল বর্ডার পর্যন্ত এগিয়ে দিতে। ঐ অফিসার মাকে সমস্ত গয়না,
মানে কানের দুল, মালা, আংটি এসব কাকার মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করে। এর পর চেকিং
তো ছিলই। চেকিং ছিল বর্ডারের ওপারেও। শুধুমাত্র পরস্পরের মধ্যে তীব্র ঘৃণা আর
সন্দেহই এমন পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তাই ভারতীয় সৈন্য যখন সরাসরি যুদ্ধে নামলো,
বাবাদের মনে প্রশ্ন জাগলো এতদিন এলাকার যে সব মুসলমান আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন,
তারা এই নতুন বাস্তবতায় কি করবেন? তারা কি এখন ভারতীয় বাহিনীকে হানাদার বাহিনী বলে
গন্য করে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? আর এই বিরধীতার প্রথম শিকার কি আমরা হব? তবে সব
কিছুর পরেও ঐ সময় দুই বাংলার জনগন অভূতপূর্ব ঐক্য দেখায়। এ প্রসঙ্গে খ্যাতিমান
নাট্যকর্মী নাসিরুদ্দিন ইউসুফ মস্কোতে এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, “একাত্তরে দুই বাংলার
মানুষ যতটা আত্মীয়তা, যতটা একাত্মতা দেখিয়েছে, সেটা একাত্তরের পূর্বে বা পরে কোন
দিনই এই ভূখণ্ডে দেখা যায়নি।“
আজ যখন সাতচল্লিশের সেই
দিনগুলির ইতিহাস পড়ি বা সিনেমা দেখি, ভাবতে অবাক লাগে কিভাবে দুই বাংলার মানুষ
কাঁধে কাঁধ রেখে একাত্তরে লড়াই করতে পেড়েছে, বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের মানুষগুলো।
মাত্র দু যুগ আগে এরাই নিজেদের বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটামাটি ত্যাগ করে
দেশান্তরী হয়েছিল, আর মানব সন্তানদের এই ঐতিহাসিক স্থানান্তরে পারস্পারিক হামলায়,
অনাহারে আর রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল লাখ লাখ মানুষ। আর ঐ দিন যাদের
কারনে তারা হয়েছিল দেশহারা, আজ তারাই দলে দলে আশ্রয় চাচ্ছে তাদের কাছে। আজ সেই
মানুষগুলো তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, প্রতিশোধ নিতে চায়নি, বরং বাড়িয়ে দিয়েছে
সাহায্যের হাত, আশ্রয় দিয়েছে নিজের ঘরে। আর যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বতভাবে
সাহায্য করেছে আমাদের বিজয়কে এগিয়ে আনার জন্য। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বা ভারত সরকারের
কাছে এটা রাজনীতির প্রশ্ন হলেও সাধারন মানুষ তার ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য ছিল না।
তারা এটা করেছে প্রানের টানে, মাটির ডাকে। আজও পশ্চিম বঙ্গে বেড়াতে গেলে কেউ যখন শোনে
আমি বাংলাদেশ থেকে, প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে দেশের কথা, বলে নিজেদের রেখে
আসা বাড়িঘর আর প্রতিবেশীদের কথা। “কেমন যে এ ভালোবাসা, কেমন যে এ মাটির টান – যারা
এ মাটি হারিয়েছে, শুধু তারাই বোঝে।“
মস্কো, ১৫ জানুয়ারী ২০১৭

No comments:
Post a Comment