খুব সকালে বাইরের হৈচৈ এ সেদিন ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি অবশ্য দেশে বরাবরই সকালে উঠি, অন্তত চোখ খুলি, যদিও এখন রাশিয়ায় ঘুম থেকে উঠতে উঠতে একু দেরী হয়ে যায়। ছোট বেলায়, মানে স্কুলে যখন পরতাম, তখন তো ভোর চারটের সময় উঠে ফুটবল খেলতে যেতাম পাড়ার ছেলেদের সাথে যাতে সাতটায় বাড়ী ফিরে পড়তে বসতে পারি আর সময় মত স্কুলে যেতে পারি। বাবা সব সময় খুব সকালে উঠত, উঠেই প্রাত ভ্রমনে বেরুত, অনেকসময় মালাটা ওই সময়েই জপে নিত। এর পর পড়ত গীতা বা চন্ডী। তাই কখনো কখনো বাবার ওঠার শব্দেই ঘুম ভাঙ্গত |
তবে ওসব দিনে সকালে মূলত ঘুম ভাঙ্গত আজানের শব্দে বা প্রভাত কীর্তনে। গ্রামের একমাত্র মসজিদ থেকে ভেসে আসত আজানের সুর
আল্লাহ আকবর …...............
তখনও মাইক ব্যবহার হত না, তবে ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে আজানের সেই মিষ্টি সুর আমাদের কানে এসে পৌছুত, অনেকটা এলার্মের মত কাজ করত।
কোন কোন দিন তারও আগে চলে আসত বৈরাগীরা - স্থানীয় বা দূর-দুরান্তের। কত গানই না গাইত
ওরা। এখনো কানে আসে সেই
ভর সময় কালে কোকিলা ডাকে ডালে
ভ্রমরা হরি গুন গায়রে …...................
অথবা
প্রভাতে গোবিন্দ নাম
সিদ্ধ হবে মনষ্কাম
আনতে হবে বৈকুন্ঠ নিবাসী
জাগিয়া লহ কৃষ্ণ নাম
হে নগর বাসী ….....
স্থানীয় ছিল ফটিক সাধু, পাশের বাড়ীর লোক, রাজবংশী - যদিও দিন কাটাত গান গেয়ে আর রমন বৈরাগীর সেবায়। সকালে একতারা বাজিয়ে বাড়ী বাড়ী গান গাইত আর দুপুরে মাঝে মধ্যে আসত সিধা নিতে। ভিক্ষুকরা ভিক্ষা নিত, আর বৈরাগীরা নিত সিধা। নামগত পার্থক্য থাকলেও এ দুটোর গুনগত পার্থক্য আমি জানি না,
কেউ জানে কিনা তাও জানি না | তাছাড়া সিধা শব্দটা আঞ্চলিক হলেও অবাক হব না।
এছাড়া একটু দুরের গ্রাম থেকে আসত বৈরাগী –
বৈরাগিনী। ওদের হাতে থাকত সারেঙ্গী - বেহালার মত এক বাদ্য যন্ত্র। তবে যে সাধুটা আমাদের বাচ্চাদের মনে সবচেয়ে বেশী কৌতুহলের উদ্রেক করত সে আসত বর্ষা কালে, নৌকা করে। আমাদের ঘাটে দিনের পর দিন ভেড়ানো থাকত তার নৌকা। বৃষ্টি নেই বাদল নেই - বর্ষার ঐ কয় মাস তার নৌকা থাকত আমাদের ঘটে, আর ভোর হলেই তার দোতারার সুর আর প্রভাত কীর্তনে মুখরিত হত গ্রাম। ওই ছোট্ট এক মালিয়া নৌকাতেই সে রান্না করত। আর ওই নৌকা থেকে বেরুত চন্দনের বা ওই জাতীয় কিছু একটা ঘ্রাণ। আমরা বাচ্চারা সাতার কাটতাম ওই নৌকার আশে পাশে আর বোঝার চেষ্টা করতাম, কিভাবে দিনের পর দিন নৌকায় কাটায় গেরুয়া পরা আর লম্বা
সাদা চুল দাড়িওয়ালা এই মানুষটা। সব সময় আমরা যে ভদ্রস্থ ভাবে সেটা করতাম তা নয়, তাই কখনো সখনো সাধু রেগে গিয়ে আমাদের তাড়া করত। তবে কোনো দিনই সেটা সীমা অতিক্রম করে নি কোনো দিক থেকেই। মনে পরে একবার ভরা বর্ষাতেও যখন ওই সাধুর দেখা মিললো না, আমাদের কত জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলল সাধু অসুস্থ, কেউ বলল মরে গেছে। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সেবারও সাধু ঠিকই এসেছিল। এরপর আমরা নিজেরাই বড় হয়ে গেছিলাম, ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম নিজেদের জীবন নিয়ে। কোন সাধু গেল আর কোন সাধু এলো সেটার হিসেব রাখার সময় আর ছিলনা।
এখন আমাদের গ্রামে অবশ্য একটা দুটো নয়, অনেকগুলো মসজিদ। প্রতিদিন সকালে চারিদিক থেকে আসে আজানের শব্দ আর তাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। চারিদিক থেকে আসার কারণেই কিনা কে জানে, এই আজানের ধ্বনি আগের মত ঠিক সব সময় মধুর মনে হয় না, কখনো কখনো
আগ্রাসী মনে হয়। তখন আমার মনে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ওয়ারশ জোট পতনের পর ন্যাটোর ক্রমশ রুশ সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাবার কথা। সমাজতান্ত্রিক জোট পতনের পর যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাশিয়াকে সাথে নিয়ে ইউরোপে শান্তি বিরাজের কথা ছিল, ন্যাটোর সম্প্রসারণে তা বরং আগ্রাসী আকার ধারণ করেছে, বেড়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস আর অশান্তি নেমে এসেছে সারা ইউরোপ জুড়ে। যদিও মসজিদের সাথে সাথে গ্রামে এখন মন্দিরের সংখ্যাও বেড়েছে, আগের সেই প্রশান্ত পরিবেশ আর নেই। আচ্ছা এই যে এত উন্নতি, এত রাস্তা ঘাট,
ডিজিটাল জীবন - তার পরেও কেন হারিয়ে যায় শৈশবের সেই সুমধুর আজানের ধ্বনি বা বৈরাগীর গান?
এবার দেশে গিয়ে একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম। ২০১৪ তেও বাসে
কন্ডাক্টর “ভাই ভাড়া দেন, মামু টাকাটা দেখি বা চাচা একটু চাপুন তো” বলে সম্বোধন
করত। এবার শে জায়গা নিয়েছে দাদা আর কাকা। একদিন এক কন্ডাক্টর যখন দাড়িওয়ালা আর
টুপি পরা এক ভদ্রলোককে “দাদা, ভারাটা দেখি” বলল, আমি অল্পের জন্য হেসে ফেলিনি। আবার
কয়েক দিন আগে দেখি এক বন্ধু ছবি দিয়েছে, যেখানে তাদেরকে ধান্দুরবা দিয়ে বরন করে
নিচ্ছে। গায়ে হলুদের কথা নাই বললাম। আজকাল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান বিয়ের থেকেও বেশী
আড়ম্বরপূর্ণ। এসব লিখছি এই জন্যে এক সময় এ সবই হিন্দু সংস্কৃতি বলে বর্জন করা হতো।
আমার কিন্তু মনে হয় এসবই একান্ত বাঙ্গালী সংস্কৃতি। আমেরিকার ইংলিশরা যেমন
ব্রিটেনের ইংলিশদের থেকে আলাদা দেখান জন্য ভাষাটা একটু অন্যভাবে বলত, বাঙ্গালী
মুসলমানও হিন্দুদের থেকে নিজেকে আলাদা করার জন্য অনেক বাঙ্গালী প্রথা বর্জন
করেছিল। এখন পহেলা বৈশাখ, গায়ে হলুদ এসব বাঙ্গালীর এই প্রধান দুই গোষ্ঠীর মানুষকে
সাংস্কৃতিক ভাবে কাছে নিয়ে আসছে। আগের মতই এখনও ঈদে বা পুজায় এক সম্প্রদায়ের
লোকেরা অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের নিমন্ত্রন করে। যদি আগে দু সম্প্রদায়ের লোকদের
জন্য আলাদা বসার ব্যাবস্থা ছিল, এখন তারা পাশাপাশি বসে খায়। এত সব কিছুর পরেও যখন
দেখি আজ এই দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ছে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, বাড়ছে
অসহিস্নুতা – মনে হয় প্যারাডক্স এটাই আমাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য।
যাকগে ফিরে আসা যাক সেই সকালে। যদিও যুদ্ধের সময় বাড়ীতে সবাই খুব সতর্র্ক থাকত আর যথা সম্ভব সকালে উঠত, এদিন সবাই যেন একটু আগেই উঠে বসেছিল। ঘর থেকে বাইরে এসে দেখি বড়রা সবাই দাড়িয়ে আছে আর পূব আকাশে জ্বল জ্বল করছে কি এক লেজুড়ে জিনিষ, যেন দেব দূতরা নেমে আসছে আকাশ থেকে। একটার পর একটা। এক ধরনের আতংক ও বিস্ময় সবার চোখে মুখে। শেষ পর্যন্ত কে যেন বলল, এগুলো প্যারাসুট। ভারতীয় সৈন্য নামছে মানিকগঞ্জের জাগিরে প্যারাসুটে করে। জীবনে ওই প্রথম প্যারাসুট দেখা। অনেক দিন পরে সত্তর দশকের শেষের দিকে যখন গ্রামের সমিতির ঘর থেকে যাত্রা দেখে ভোর রাতে বাড়ী ফিরতাম, একটা বিশাল লেজ যুক্ত ধুমকেতু দাড়িয়ে থাকত পূব আকাশে। ওটাকে দেখে আমার মনে হত ওই প্যারাস্যুট গুলোর কথা। হয়তো বা ভোরের আকাশে সূর্যের আলো পড়ায় প্যারাসুট গুলো ধুমকেতুর মত লাগছিল, হয়ত বা একেবারেই ধুমকেতুর মত ছিল না, কিন্তু আমার শিশু মনে ঐযে চিত্রটা গেথে গেছিল সারা জীবনের জন্য, তা এখনো যেন ভাসছে চোখের সামনে।
তরা, মস্কো – ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ – ৩ জানুয়ারী ২০১৭

No comments:
Post a Comment