এবার যখন দেশে আসি মস্কো বসেই প্ল্যান করেছিলাম একাত্তরে পালিয়ে কাটানো ওই গ্রামগুলো দেখতে যাবো। তাই ২৮ নভেম্বর যখন বাড়ি এলাম, পরের দিনই মানিকগঞ্জ গিয়ে দেখা করলাম বাসেতের সাথে। বাসেত কুদ্দুস ভাইয়ের ছেলে, এখন ওকালতি করে মানিকগঞ্জ। দেখে খুব খুশি হলো। তবে মনে হয় আমরা যতটা না নিজেদের চিনি তার চেয়ে বেশী চিনি আমাদের বাবাদের। আর আমাদের চেনা বা জানা - মানেই বাবাদের কাছে শুনে চেনা। ওরা আমার কাছে যতটা না রাশেদ-বাসেত, তার চেয়েও বেশী কুদ্দুস ভাইয়ের ছেলে, ঠিক তেমনটাই আমিও হয়তো ওর কাছে বৃন্দাবন সাহার ছেলে। তাই হয়তো কথায় কথায় বললো, "বাবা বলতো, আমি জীবনে বৃন্দাবন সাহার বাড়ী ছাড়া কোনো হিন্দু বাড়ী খাই নাই, কিন্তু ওই বাড়ীতে খেতে বসে মনে হয়েছে, যেন নিজের বাড়ীতেই খাচ্ছি। " আসলে এমনটাই হয়, মানুষ যখন একে অন্যকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, তখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ সব দূরে সরে যায়, সব কিছু ছাপিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায় শুধুই ওই মানুষটা - ভালোবাসার বা শ্রদ্ধা করার অথবা ঘৃণা করার। ওর কাছ থেকেই এলাকার কমবেশী খোঁজ খবর নিয়ে ঠিক করলাম, কয়েক দিনের মধ্যেই যাবো বাঙ্গালা আর ওখান থেকে বৈলতলা। ও বার বার বলে দিলো আমরা যেন অবশ্যই ওদের বাড়ী যাই আর যাবার আগে ওর ভাই রাশেদকে টেলিফোন করি, নইলে খুব মাইন্ড করবে।
৫ই ডিসেম্বর বারোটার দিকে বেরুলাম বাঙ্গালার পথে। প্রথমে ভেবেছিলাম ট্রলারে করে প্রথমে বৈলতলা যাবো, ওখান থেকে পরে যাবো বাঙ্গালা। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো জলের অকাল, তাই ট্রলারে গেলে হাটতে হবে অনেকটা পথ, আবার একাত্তরের মতোই মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে ওদিকটায়। তাই ঠিক হলো, প্রথমে বাসে করে করে যাবো ঘিওর, ওখান থেকে হ্যালো বাইকে প্রথমে বাঙ্গালা আর তার পর বৈলতলা। তবে বাস ফেল করায় ঘিওর গেলাম সি এন জিতে সারা রাস্তা ঝাকুনি খেতে খেতে। মাইল্যাগী দিয়ে যাবার সময় মনে করলাম কোথায়, কোন বাড়িতে ছিলাম আমরা।
ঘিওর থেকে হ্যালো বাইকে করে রওনা হলাম বাঙ্গালার দিকে। প্যাসেঞ্জাররাই বলে দিলো ওখান থেকে কিভাবে বৈলতলা যাওয়া যায়। কথায় কথায় জানালাম আমাদের আসার উদ্দেশ্য, জানলাম কি কি পরিবর্তন হয়েছে এলাকায়। ওখানেই ধামসরের একজনকে পাওয়া গেলো। ওনার কাছ থেকে জেনে নিলাম ওই এলাকার খবর। গল্প করতে করতে ঘিওর থেকে আমরা এসে পৌছুলাম বাঙ্গালায়।
হ্যালো বাইক থেকে নেমে দেখি কে যেন একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চিনতে কষ্ট হলো না। কুদ্দুস ভাইকে মনে করিয়ে দিলো। ও রাশেদ, খবর পেয়ে এসেছে আমাদের নিয়ে যেতে। হাটতে হাটতে চললাম ওর পেছন পেছন। নতুন রাস্তা চলে গেছে বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে। ফলে একদা যেখানে ছিল সবুজ মাঠ এখন সেখানে ডোবা আর ডোবা, বলা যেতে পারে খাল, তবে তা জাল দিয়ে ভাগ করা যেমনটা আল দিয়ে ভাগ করা থাকে মানুষের জমি। ডোবাগুলো জলে ভর্তি, এখানে সেখানে ভাসছে পানা আর তার নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে কালো কালো মাছ। এখন আর এখানে ফসল চাষ হচ্ছে না, হচ্ছে মাছের চাষ।
দেখতে দেখতে চলে এলাম শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ীর সামনে। মনে পরে গেলো সেই মাইট্যালটার কথা। ওটা আজ আর আগের মতো নেই, আশেপাশের ডোবাগুলোর সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক চাচা। রাশেদই আলাপ করিয়ে দিলো। উনি এখন এই বাড়ীর মালিক। বললাম, একাত্তরে আমরা এ বাড়িতে ছিলাম। আমাদের ডাকলেন, বেরিয়ে যেতে বললেন। সময় ছিল না। তা ছাড়া বাইরে থেকেই দেখলাম, বাড়ীর শুধু মালিকানায় পরিবর্তন হয় নি, বাড়ীর ঘরগুলোর আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। স্মৃতিতো শুধু মাটি নয়, সেখানকার মানুষ, ঘরদোর আরো কত কিছু। তাই আর ওখানটায় যেতে ইচ্ছে করলো না। চললাম সামনের দিকে। আগে, একাত্তরে শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ীর সামনে ছিল মাঠ আর মাঠ - এখন অনেক নতুন বাড়ীঘর উঠে গেছে। যদিও আমার নিজের গ্রাম তরায় ঘরে ঘরে ভোরে গেছে মাঠ ঘাট, তবুও এই বাঙ্গালায় সেটা দেখে অবাকই লাগলো। অবাক হয়ে দেখলাম জমির ধার দিয়ে চলে যাওয়া সেই রাস্তাটা মাটি চাপা পড়েছে। এখানেও উন্নতির জোয়ার - নতুন রাস্তা নতুন জীবন। তবে পাশে হেটে যেতে যেতে কে যেন বললো, আগের রাস্তাই ভালো ছিল, নিচু, কিনতু সমান। এখন রাস্তা উঁচু করেছে ঠিকই, তবে এখানে গর্ত তো ওখানে উঁচু মাটির ঢিবি। আসলে উন্নয়নের ব্যাপারটাই, খুবই অসমান, বিশেষ করে আমাদের মত দেশে - কেউ কেউ উন্নতির শিখরে বসে থাকলেও অধিকাংশই পরে থাকে কানাগলিতে। জীবন চলার পথে প্রায়ই হোঁচট খায়, যেমনটা এখানকার মানুষ রাত বিরাতে হোঁচট খায় এই উঁচু কিন্তু অসমান পথে।
অবাক হলাম দেখে যে গ্রামের বাজারটা শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ী থেকে মাত্র দুশো মিটার দূরে। ওই সময় মনে হতো বাজারটা যেন দিগন্ত পেরিয়ে। মনে হয় পাগুলো আমার তখন খুব ছোট ছিল আর ছোট ছিল পদক্ষেপগুলো। বাজারটা অনেকটা আগের মতোই আছে, তবে ওই দিন, মানে সোমবার হাট ছিল বলে ধীরে ধীরে লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে।
আরো অনেকটা পথ পেরিয়ে রাশেদ নিয়ে এলো আমাদের ওদের বাড়ীতে। আগে শশী জ্যাঠামশায়ের বাড়ী থেকে মাত্র কয়েকটা বাড়ী পেরুলেই চলে যাওয়া যেত ওদের ওখানে, এখন উঁচু রাস্তা ধরে যেতে যেতে পার হয়ে এলাম প্রায় এক কিলোমিটার পথ। শহরে উন্নয়ন এনেছে যানজট, গ্রামে ঘোরা পথ।
কুদ্দুস ভাইদের পুরানো বাড়ীটা সরে এসেছে নতুন জায়গায়, পাশেই। ওই সময়ের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে আমার প্রিয় সেই তাল গাছ আর গাব গাছ। রশিদের এখনো মনে আছে, ওই আবার মনে করিয়ে দিলো, দেখালো গাছগুলো। তবে বড় বড় সেই আম গাছগুলো আর নেই, যেমনটা নেই বাজারের সেই বট গাছটা। ওই সময় কুদ্দুস ভাইয়ের বাড়ীর পেছনে দাঁড়িয়ে তেরশ্রী পর্যন্ত দেখা যেত, এখন অনেক নতুন বাড়ীঘর আটকে দেয় দৃষ্টিকে।
আমার সব সময়ই খালেক নামটা মনে পড়ছিলো, তবে বাড়ীর কারোই মনে ছিল না। রশিদ আসলো সাহায্যের হাত নিয়ে। খালেক ছিল কামাক্ষার বনধু যে হরহামেশা গান বাঁধতো। রাশেদের ছেলেমেয়েরা কেউই আর গ্রামে থেকে না, ওরা দুজনেই এখন এখানকার বাসিন্দা। আদর করে দই আর মিষ্টি খাওয়ালো - তেরশ্রীর দই মিষ্টি, যা এলাকায় খুবই নাম করা। ও হয়তো ভেবেছে আমরা ওর ওখানে ভাত খাবো না, তাই এই ব্যবস্থা। দিন পাল্টে গেছে, আমরা এখন সব জায়গাতেই খাই।
অনেক গল্প করলো রাশেদ। পুরানো প্রতিবেশীদের গল্প। কামাক্ষা, রাম মামা, বাদল দা আরো কত নাম।
- সেই দিন আর নাই কাকা। সেই মানুষও নাই। আশেপাশের যে সব হিন্দু বাড়ী ছিল, অনেক আগেই চলে গেছে। এসেছে নতুন মানুষ, কিনতু তাতে পরিবেশ ভালো হয় নাই। এখনতো পাহারা ছাড়া ঘুমানোই যায় না। আজ চোর আসে তো কাল ডাকাত। পাহারা দিতে হয় রাত জেগে।
- কেন? এখন তো রাস্তাঘাট কত উন্নত হয়েছে, চাইলেই ঘিওর যেতে পারো ২০ মিনিটে। কারেন্ট, দোকানপাট, মোবাইল ফোন ...
- এগুলোর দরকার আছে ঠিকই, তবে মনে শান্তি দরকার, স্বস্তি দরকার। মানুষ দরকার, যাদের কাছে যাওয়া যায়, যাদের সাথে কথা বলা যায়। ওই মানুষ এখন কোথায় পাবো কাকা?
আমারও তাই মনে হয়, দেশের উন্নতি কেন যেন শুধু অর্থনৈতিক সেক্টরেই আটকে গেছে। অনেকটা নিত্যতার সূত্র ধরে সেই সাথে শিক্ষা (একাডেমিক শিক্ষা নয়) , সংস্কৃতি, নৈতিকতা এসব ব্যাপারে আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি। যে ভাষা আর সংস্কৃতির জন্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, আজ আমরা একটু একটু করে সেই ভাষা আর সংস্কৃতি থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। অবশ্য হতে পারে এটা আমার দেখার ভুল। হয়তো তাই কেউ কেউ মনে করে যে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চমৎকার স্মৃতিচারন বিষয়ক আমার লেখাগুলো অত্যন্ত উপভোগ্য হলেও গল্পের শেষে, কিছু বিমূর্ত বিষয় দাড় করিয়ে আমি নাকি ঢালাও ভাবে নিজের (?) সমাজ-জাতি তথা দেশের ওপর সাম্প্রদায়িকতার তকমা এটে দেই যা কোন বিজ্ঞানের মাঝেই পরেনা।
আমার অবশ্য তেমনটা মনে হয়না। একাত্তরকে নিয়ে লিখতে হলে শুধু যে সেই টাইম-ফ্রেমের মধ্যেই থাকতে হবে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তছাড়া আমি ইতিহাস লিখছি না, লিখছি সেই সময়ে ও আমার পরবর্তী চিন্তা ভাবনায় একাত্তরের প্রভাব, একাত্তরের ঘটনাবলীর প্রভাবের কথা। বিজ্ঞানের বিশেষ করে পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র হবার ফলে আমি ভালো বা মন্দ সব জিনিষকে প্রশ্ন করেই গ্রহণ করি। হতে পারে সব সময় আমার সিদ্ধান্ত সঠিক না, বা অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়, তবে তার পরেও ওই সত্য বা মিথ্যা আমার একান্তই নিজের, নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার বিচারে গৃহীত। যদি আমি সেটা না করে অন্যদের কথায় কোনো কিছুকে সত্য বা মিথ্যা বলে গ্রহণ করতাম, তা হতো তাদের সত্য বা মিথ্যা - যার প্রতি আমার থাকতো শুধুই বিশ্বাস, যুক্তি নয়।
যদিও হাটছিলাম আমি বাঙ্গালার রাস্তায় ২০১৬ সনের ৫ ই ডিসেম্বর, আমি যেন তখন অবস্থান করছিলাম সমান্তরাল বাস্তবতায় - বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম ফেলে আসা সেই একাত্তরে। এই নতুন বাস্তবতা দুহাতে সরিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো একাত্তরের সেই বাঙ্গালা, যেখানে কুদ্দুস ভাই, শশী জ্যাঠামশায়, রাম মামা, কামাক্ষা, আরো অনেক অনেক মুখ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলো।
তরা, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬

This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteপ্রিয় হামিদ ভাই, গুরত্ব ঠিক নয়, তবে প্রশ্নটাকে ধরে নিজের কথা বলার সুযোগ আমি ছাড়ি না কখনো। এটা মনে হয় আমার পেশাগত অভ্যেস। সেখানেও কোন টক দিতে গেলে অনেক প্রশ্ন আসে, আর আমাকে যুক্তি দিয়ে (গাণিতিক ও ফিজিক্যাল) তার উত্তর দিতে হয় আর এই প্রশ্নগুলোকে আমরা সামনে যাবার পথে একটা বড় ধাপ মনে করি। আমার বিভিন্ন লেখা নিয়ে মস্কোয় অনেক কথা হয়, যে কারণে এমনকি রাগ করে অনেকে আমাদের অনুষ্ঠানে আসে না, যদিও এটা আমার একান্ত যক্তিগত মত। দুএকজনতো আমাকে বলেছে সরকারের সমালোচনার জন্য তারা আমাকে জায়গা মত রিপোর্ট করবে। মশা মারতে কামান দাগা আর কি? ব্যক্তিগত আক্রমণ আমি পছন্দ করি না, শত অপছন্দ হলেও কারো প্রতি খারাপ শব্দ ব্যবহার করি না -তবে কেউ যদি করে ওটা তাদের দুর্বলতা বলেই আমি মনে করি আর ওটাকে ব্যবহার করেই আমি আমার কথাগুলো বলি। এটা ঠিক গুরুত্ব দেয়া নয়, রণকৌশল।
Deleteপ্রিয় বিজন, কেউ একজন তোমার লেখায় তেমন স্বআরপিত পূর্বানুমিত নেতিবাচক মন্তব্য করলে সেটাকে এমন গুরুত্ব দেয়ার কী দরকার।
ReplyDeleteজনাব সৌরভের মন্তব্য গঠনমূলক নয়, বরং আক্রমনী তাই এসব এড়িয়ে চলা বাঞ্ছনীয়।
একাত্তরের জায়গাগুলোর বর্ণনায় নিজেও ঘুরে আসলাম মনে মনে।
তোমার মনে কাজ করে সৌহার্দ্যময় গ্রামীণ জীবন কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত সেকারনে এ সাম্প্রতিক বিষয় তোমার লেখায় ফিরে আসে, তা না আসলেই বেমানান হতো। লেখকের বক্তব্য বলে কথা!
ওনাকে আমি চিনলাম না।
December 11, 2016 at 11:25 AM
This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteফিরে দেখার বিষন্নতা আমাদের গ্রাস করে নিত্যই। তোমার ৭১এর স্মৃতি এই ফিরে যাবার কাহিনীগুলো না হলে সম্পূর্ণ হত না। ৪৭এর দেশভাগ হিন্দুদের ভাগ্য নির্ধারিত করে দিয়েছিল, তাকে আর পরিবর্তন করা গেল না। তোমার সাবলীল লেখায় এই কথাটি মূর্ত। লেখাগুলো বই আকারে পাবার ইচ্ছা রাখি। ভাল থেকো। দীপেন ভট্টাচার্য
ReplyDeleteদীপেন দা, যদি ৪৭ বাঙ্গালী হিন্দুদের ভাগ্য নিরধারক হয়, তবে জাতি হিসেবে বাঙ্গালী কি পরাজিত জাতিতে পরিনত হয় না? একাত্তরের বিজয় কি এই পরাজয়ের জন্ন্যই হয়েছিল?
Delete