মানুষ আর মানুষ। ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা - মানুষের ঢল। একের পর এক আসছে -
আবার বানের জলের মতো চলে যাচ্ছে আমাদের পেছনে ফেলে। এর মধ্যেই আমরা কাউকে দিচ্ছি জল, কাউকে দুধ - সারা গ্রাম যেন এক বিশাল শরণার্থী শিবির - যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে ঢাকা থেকে আসা মানুষগুলোকে। সকালে খবর এসেছে ঢাকার উপর হামলা করেছে পাক হায়েনার দল। দুপুর না গড়াতেই আমরা হচ্ছি তার চাক্ষুষ সাক্ষী। আমার এই ছোট্ট জীবনে এতো মানুষ দেখিনি কখনো। এমন কি রথের মেলায়ও নয়। এইতো মাত্র বছর দেড়েক আগে কলকাতা থেকে ঘুরে এলাম। সেখানেও লোকে লোকারণ্য। কিন্তু এতো মানুষ? সবাই পালাচ্ছে - সবার লক্ষ্য এক - ঢাকা থেকে যত দূরে পালানো যায়। ফেরি তো আছেই, এর পরেও গ্রামের লোক যে যেভাবে পারছে, নৌকা দিয়ে পার হতে সাহায্য করছে ঢাকার শহুরে মানুষগুলোকে। বলতে গেলে সবাই খালি হাতে, এক কাপড়ে বেরিয়ে আসা মানুষ। কারো বা কোলে বাচ্চা। আমার নিজের বয়স ছিল তখন সাত, তার পরেও যেন হঠাৎই বড় হয়ে গেছিলাম, আমাদের মতো ছেলেমেয়েরা মিলে বড়রা যে খাবার বা দুধ দিতো, তাই দিয়ে আসতাম পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর হাতে।
কালিগঙ্গা নদীর উপরে কালিগঙ্গা সড়ক সেতু, যা তরা ব্রীজ নামেই পরিচিত, তখনও হয় নি। ভ্যানেল কোম্পানি সবে কাজ শুরু করেছে। সে সময় এমন কি চৈত্র মাসেও নদী যথেষ্ট গভীর আর স্রোতস্বিনী। তাছাড়া ব্রীজের কাজ শুরু হওয়ায় ফেরিঘাট আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই। তাই লোকজনের ঢল যাচ্ছিলো আমাদের রংখোলার উপর দিয়ে। রংখোলা এটা আমাদের পুরানো বাড়ি। আমার জন্মের আগেই নদী ভাঙার কারণে আমরা একটু ভেতরে চলে এসেছিলাম। এখন নদী অবশ্য বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে চলে গেছিলো। রংখোলা নাম হয় এ কারণে যে, এখানে নারায়ণগঞ্জ থেকে সুতা আর রং এনে রং করা হতো আর পরে ওটা তাঁতীদের কাছে বিক্রি করা হতো। ওটা ছিল আমাদের মূল ব্যবসা। সপ্তাহে দু' বার করে বাবা বা কাকা নারায়ণগঞ্জ যেত সুতা আনতে, ফিরতো ৫ টনি ট্রাক ভর্তি রং আর সুতা নিয়ে। গ্রামে তখন গাড়ি আসা বলতে এটাই বুঝাতো যদিও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দিয়ে গাড়ি চলতো অনবরত। ট্রাক থেকে মাল নামানো শেষ হলে আমরা বাচ্চারা ওই ট্রাকে চেপে যেতাম ফেরী ঘাট পর্যন্ত। সোমবার আর বৃহস্পতি বার ছিল নারায়ণগঞ্জ যাবার দিন, যাতে বুধবার আর শনিবার যথাক্রমে ঘিওর হাট ও ঝিটকা হাটে খদ্দেরদের কাছে রঙিন সুতা পৌঁছে দেয়া যায়। ২৫ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার, বাবা গেছেন মোকামে মানে নারায়ণগঞ্জ মাল আনতে। যদিও অনেক দিন ধরেই বাড়ীর সব থেকে লম্বা আমগাছের মাথায় আরো লম্বা এক বাঁশের মাথায় কালো পতাকা উড়ছিলো পতপত করে, গ্রামের বাজার মাঝে মধ্যেই এর মূল জায়গা থেকে রমন সাধুর আখড়ার ওখানে খালে বসছিলো, তবুও পঁচিশে মার্চের কালো রাত যেন হঠাৎ করেই এসেছিলো। অন্ততঃ আমার বাড়িতে যুদ্ধ নিয়ে কোনো আলোচনার কথা মনে পড়ে না। আর ১৯৬৯ সালে ইন্ডিয়া যাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ঘটনাই আমার খুব ভালো ভাবে মনে আছে। তাই বাবা নারায়ণগঞ্জ আটক পড়ায় সবাই চিন্তিত ছিল, তবে বাবা যে ফিরে আসবে এ নিয়ে কারো সন্দেহ ছিল বলে মনে হয় না। প্রশ্নটা ছিল কবে আর কিভাবে। কেননা অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে ২৭ মার্চ থেকেই, বাড়ী থেকে যে পালাতে হবে এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে ওঠে।
দুবনা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

যদিও বলেছিলাম কাল পড়বো কিন্তু পড়লাম আজ রাতেই। তোমার মতো আমাদেরও প্রায় কাছাকাছি স্মৃতিতে ৭১ আছে। একটু ভুল লিখলাম আমাদের মতো অনেকের এরকমের ৭১ এর স্মৃতিকথা রয়েছে। নিজের কথা যখন প্রায় সকলের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে তখন লেখা সার্থকতার পথে পা ফেলে আর আমরা তা পড়তে ভালোবাসি। চমৎকার লিখেছো, চালিয়ে যাও। এটাও সত্য এ প্রজন্মের অনেকে এসব সত্যকথা জানেনা বা তাদের জানানো হয়নি।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো আপনার কমেন্ট পড়ে, আশা জাগানো। আসলে না লিখলে কাউকে তো আর বলা হবে না। বিদেশে থাকার এই একটা সমস্যা, দেশের স্মৃতি ঠিক শেয়ার করা যায় না, বিশেষ করে তা যদি খুব পুরানো হয়। চেষ্টা করবো লিখে যেতে, দেখি কি দাঁড়ায়।
ReplyDeleteসিরিজ টা লিখো। একজন ৭ বছরের ছেলের চোখে মুক্তিযুদ্ধ কে দেখতে পারবো। লেখা পড়ে মনে হচ্ছিলো, হয়তো আমিও আছি '৭১ এ, রংখোলায়, অন্যদের মত আমিও সাহায্য করছি।
ReplyDeleteইচ্ছে আছে, দেখি কতদূর পারি
Delete