একাত্তরে আমার বয়েস ছিল মাত্র সাত, তাই আমার একাত্তর - এটা এক ধরনের দুঃসাহস। তারপরেও যেহেতু প্রায়ই একাত্তর ফিরে ফিরে আসে আমার স্মৃতিতে, তাই ভাবলাম, মন্দ কি লিখলে। তাছাড়া রাশিয়ান বন্ধুদের বা নিজের ছেলেমেয়েদের "আমি যুদ্ধ দেখেছি" এ কথা বললেই ওরা জিজ্ঞেস করে, “কোন যুদ্ধ?” যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পিতৃভূমির যুদ্ধ ছাড়া কোনো যুদ্ধই হয়নি পৃথিবীতে। তখন সেই সময় আর জীবনের বহু উত্থান-পতনের চাপে ঢেকে যাওয়া সেই স্মৃতিগুলো হাতড়িয়ে বলি ওদের আমার একাত্তরের কথা। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। আবার কিছু কিছু স্মৃতি যার ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। একদিকে ওরা চোখের সামনে ভাসে, অন্য দিকে যদি সত্য হতো, তাহলে পরবর্তী অনেক কিছুই এমনটা হতো না। হয়তো-বা কোনো কোনো ঘটনা আমার মন অন্য রঙে রাঙিয়েছে, শিশুমন নিজের মতো করে কোনো ঘটনাকে ভবিষ্যতের খাতে বইয়ে দিয়েছে, যদিও বাস্তবে সেটা বিবর্তিত হয়েছে একেবারে অন্য পথে। তবে তেমন ঘটনা একটা বা দুটো। বাকি সবই বাস্তব, তবে সে বাস্তব শিশুর কৌতূহলে ভরা, শিশুর ভয় মেশানো। এটা অনেকটা ডায়রির মতো, হারিয়ে যাওয়া ডায়রি - যা হঠাৎ খুঁজে পাওয়া গেছে, তার সময়ের ভারে মুছে যাওয়া শব্দগুলোকে জোড়া দিয়ে একটা রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেখা যাক কী দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত।
দ্বিতীয় যে কারণটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে এ লেখায়, তা হোল বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি। যদিও আদিকাল থেকেই শান্তির পাশাপাশি যুদ্ধও ছিল সদা বিরাজমান,
শুধুমাত্র ১৯৯১ সালে গালফ যুদ্ধের মধ্য নিয়ে সিএনএনসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কল্যানে
যুদ্ধ আমাদের ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে। এরপর এক এক করে আসে যুগস্লাভিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইউক্রাইন। পৃথিবীর মানুষ
অন লাইনে দেখতে পায় পরাশক্তির আধুনিক মারনাস্ত্রের অট্টহাসি, শুনতে পায় নারী, শিশু,
বৃদ্ধের অসহায় কান্না। গনতন্ত্র আর মানবতার নামে এই যুদ্ধে সবার আগে লাঞ্ছিত হয় মানবতা।
সিরিয়া আর ইউক্রাইনের (গৃহ)যুদ্ধে, যেখানে রাশিয়া আর পশ্চিমা বিশ্ব পরস্পরের
মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে, সেই যুদ্ধের পরস্পর বিরোধী সংবাদ সাধারন মানুষকে করছে বিভ্রান্ত। আর এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দনবাছ থেকে যখন বিভিন্ন ফটো-সাইটে
দেখেছি শান্তির ছবি, জীবনের ছবি – মনে পড়েছে একাত্তরের কথা, যখন যুদ্ধে পাগল বাংলাদেশে
আমরাও হেসেছি, কেঁদেছি। আর তখনই আমার মনে হয়েছে, আচ্ছা আমারও তো একটা যুদ্ধ আছে, আছে যুদ্ধের গল্প, যুদ্ধের
সাথে বসবাস। আজ যখন সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
চলছে, যুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা চলছে, চলছে গোষ্ঠী স্বার্থে যুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের মত করে
লেখার বা বলার পায়তারা, আমি অন্তত আমার সত্যটা বলি, আমার সেই সাত বছরের বাল্যকালের
অভিজ্ঞতার কথাটা লিখি। হয়তো-বা এটা কাউকে সাহায্য করবে নিজের একাত্তরকে খুজে পেতে, নিজের সত্যটা অনুভব
করতে।
দুবনা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

No comments:
Post a Comment